মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিদেশমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা বিন জ়ায়েদ বিন সুলতান আল নাহয়ান। ছবি: রয়টার্স।
ইরান শান্তিচুক্তি তেহরানকে কতটা সুবিধা পাইয়ে দেবে, তা নিয়ে সন্দিহান পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার বন্ধুরাষ্ট্রগুলি। হরমুজ় থেকে ইরান টোল আদায়ের সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশায় রয়েছে তারা। ৩০ হাজার কোটি ডলারের প্রস্তাবিত তহবিলও তেহরানের প্রতি ‘বাড়তি উদারতা’ বলে মনে করছে তারা। এ অবস্থায় বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে পশ্চিম এশিয়ায় সফর শুরু করেছেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে তাঁর সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত এবং বাহরিন সফর।
আবু ধাবিতে পৌঁছে মঙ্গলবারই ‘বন্ধুদের’ উদ্দেশে আশ্বাস দিয়েছেন রুবিয়ো। জানিয়েছেন, হরমুজ়ে জাহাজ চলাচল অবাধ থাকবে। ওই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজের কাছ থেকে কোনও দেশকেই ‘টোল’ আদায় করতে দেওয়া হবে না। ইরানকেও নয়। শান্তিচুক্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনাগুলিতেও ওয়াশিংটন নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। মার্কিন বিদেশসচিবের আশ্বাস, আমেরিকা বন্ধুরাষ্ট্রগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমেরিকা-ইরান মউ কোনও ভাবেই তেহরানকে বাড়তি সাহস জোগাবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, চার মাস ধরে চলা যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার বন্ধুরা বার বার আক্রান্ত হয়েছে। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা হয়েছে তাদের উপরে। এ অবস্থায় শান্তি সমঝোতায় ইরানকে ছাড় দেওয়াকে কেন্দ্র করে আমেরিকার বন্ধুরাষ্ট্রগুলির মধ্যে ‘অসন্তোষ’ দেখা দিয়েছে। সেই ‘অসন্তোষ’ দূর করতেই পশ্চিম এশিয়া সফর শুরু করেছেন রুবিয়ো। মঙ্গলবার রাতে আবু ধাবি পৌঁছোনোর পর তা নিজেই স্পষ্ট করেছেন তিনি। মার্কিন বিদেশসচিবের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ দূর করার বিষয়ে তাঁর কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কি না। উত্তরে তিনি বলেন, “অবশ্যই এ বিষয়ে আলোচনা হবে।” পাশাপাশি মউ-তে উল্লেখ নেই, এমন বেশ কিছু বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে।
হরমুজ় প্রণালী দিয়েও যে জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারবে, তা নিয়েও বন্ধুদের আশ্বস্ত করেন রুবিয়ো। তিনি বলেন, “এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। কোনও দেশই আন্তর্জাতিক জলপথে টোল চাপাতে পারে না। এটাই আন্তর্জাতিক আইন। গোটা বিশ্বের আন্তর্জাতিক জলপথে এটাই নিয়ম। আমরা আশা করি, এখানেও তা-ই থাকবে।”
নতুন সমঝোতার আওতায় ইরানের আটকে থাকা তহবিল মুক্ত করা হতে পারে, এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। ওই তহবিল মুক্ত হলে ইরান তা সামরিক খাতে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছে আমেরিকার বন্ধুরাষ্ট্রগুলি। যদিও আমেরিকার দাবি, ওই তহবিল শুধু আমেরিকার থেকে কৃষিপণ্য কেনার জন্যই ব্যবহার করতে পারবে ইরান। আবার পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের উপর নজরদারি নিয়েও আমেরিকা এবং ইরানের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য উঠে এসেছে। আমেরিকার দাবি, ইরানে ফের আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পাঠানো হবে এবং তাতে রাজি হয়েছে ইরান। তবে তেহরানের দাবি, এমন কোনও কথাই হয়নি। চুক্তি ঘিরে এমন ধোঁয়াশাগুলির মাঝে মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে পৌঁছোন রুবিয়ো।
উপসাগরীয় দেশগুলির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ইরান। যুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকাকে বিভিন্ন ভাবে রসদের জোগান দেওয়ার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলিকেই দায়ী করেছে তেহরান। ইরান যুদ্ধের সময়ে অর্থনৈতিক ভাবেও যথেষ্ট ক্ষতির মুখে পড়েছিল আমেরিকার এই বন্ধুদেশগুলি। সেই তালিকায় রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও। যুদ্ধের কারণে প্রবাসীরা পালিয়ে গিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে। বুধবার সকালে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা বিন জ়ায়েদ বিন সুলতান আল নাহয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রুবিয়ো। তার পরে সেখান থেকে রওনা দিয়েছেন কুয়েতের উদ্দেশে।
উল্লেখ্য, আমেরিকা-ইরান শান্তি সমঝোতা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনাগুলিতে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি রুবিয়োকে। শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলকে নেতৃত্বে দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। সে দিক থেকেও বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে রুবিয়োর এই পশ্চিম এশিয়া সফর যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন রাজনীতিতে রিপাবলিকান পার্টির অন্দরে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসাবে সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাব্য প্রার্থী হলেন ভান্স এবং রুবিয়ো। সে দিক থেকে এই সফর রুবিয়োর কাছে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, তাঁকে যেমন ইরানচুক্তি টিকিয়ে রাখতে হবে, একই সঙ্গে আমেরিকার বন্ধুদের সংশয় এবং উদ্বেগেরও একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য সমাধান’ করতে হবে।