ইরানের মেজর জেনারেল মহম্মদ আলি জাফারি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
২০০৩ সালে ইরাকে ২৬ দিনের সামরিক অভিযানে আমেরিকা ‘ধ্বংস’ করে দিয়েছিল সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে! খুঁজে খুঁজে ইরাকের তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্তাদের শেষ করেছিল তারা, যার ফলে ধসে পড়েছিল সাদ্দামের সাম্রাজ্য। কিন্তু ইরানে এখনও পর্যন্ত সেই ‘সাফল্য’ পায়নি আমেরিকা। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ সে দেশের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্তার মৃত্যুর পরেও ইরানি শাসন ভেঙে পড়েনি। অনেকের মতে এর নেপথ্যে রয়েছেন মেজর জেনারেল মহম্মদ আলি জাফারি, যিনি ইরানের ‘এলিট ফোর্স’ ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর প্রাক্তন কমান্ডার-ইন-চিফ পদেও ছিলেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে ইজ়রায়েল এবং ইরান। অভিযানের পোশাকি নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরানের সর্বোচ্চ পদাধিকারীদের ‘খতম’ করেছে যৌথ বাহিনী। আয়াতোল্লা আলি খামেনেই ছাড়াও আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল মহম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সইদ আব্দুর রহিম মুসাভি-সহ বেশ কয়েক জনের মৃত্যু হয়েছে এই কয়েক দিনে।
‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার’-এ প্রতিবেদন অনুসারে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যৌথ হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলে ধাক্কা এবং তাদের সব সামরিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু আমেরিকা বা ইজ়রায়েল— কেউই এখনও পর্যন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারেনি। আর তা সম্ভব হয়েছে জাফারির কারণেই! তিনি ইরানে একটি ধারণার প্রচলন করেন। সেই ধারণার মূল মন্ত্রই ছিল, নেতৃত্বের মৃত্যু হলেও ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করা। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন বাহিনী এবং মন্ত্রক তাদের কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
বাস্তবে তার প্রতিফলনও দেখছে বিশ্ব। যৌথ হামলায় দমেনি তেহরান। বরং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় লাগাতার হামলা চালিয়ে ‘প্রতিশোধ’ নিচ্ছে তারা। বিশেষত, মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস করার লক্ষ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, কুয়েত, ইরাকে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানি বাহিনী।
দিন কয়েক আগে ইরানের বিদেশমন্ত্রী সইদ আব্বাস আরাঘাচি জানিয়েছিলেন, কী ভাবে মার্কিন হামলা প্রতিহত করা যায় তা গত দু’বছর ধরে অধ্যয়ন করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আরাঘাচি বলেছিলেন, ‘‘তেহরানে বোমা হামলা করেও আমাদের যুদ্ধ পরিচালনা করার ক্ষমতায় কোনও প্রভাব ফেলা যাবে না। ‘বিকেন্দ্রীভূত মোজাইক প্রতিরক্ষা’ থেকে আমরা শিখেছি কখন এবং কী ভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করা যায়।’’ আর এই প্রতিরক্ষা মডেলের প্রবর্তক জাফারি। অনেকের মতে, এই মোজাইক মতবাদ হয়তো ইরানকে যুদ্ধে জয় এনে না-ও দিতে পারে। কিন্তু এই মতবাদ থেকে ইরান সহজে আত্মসমর্পণ না-করার বার্তা পায়।
পহলভি রাজবংশ পতনের পর ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশে থাকা গোয়েন্দা বিভাগে নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন জাফারি। ১৯৭৯-৮৯ সাল পর্যন্ত ইরান-ইরাক যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন তিনি। তাঁর কৃতিত্বের জন্য পদোন্নতিও হয় তাঁর। যুদ্ধের পর ১৯৯২ সালে তাঁকে আইআরজিসির স্থলবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে বসানো হয়। একই সঙ্গে তেহরানের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের একটি ইউনিট ‘সারাল্লা’তেও যোগ দিয়েছিলেন জাফারি।
২০০৫ সালে জাফারিকে ইরানের ‘গার্ডস সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ়ের’ কর্তা করা হয়। পরে তিনি মোজাইক মতবাদ তৈরিতে মনোনিবেশ করেন। ২০০৭ সালে আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক করা হয়েছিল জাফারিকে।
২০১০ সালে ইউএস ইনস্টিটিউট অফ পিসের এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, মোজাইক মতবাদ তৈরিতে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করেছিলেন জাফারি। ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলাও পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি। জাফারি দেখেছিলেন, ২০০৩ সালে ইরাকে সাম্রাজ্য ধ্বংসের নেপথ্যে ছিল সাদ্দাম কেন্দ্রীভূত সামরিক বাহিনী বা কাঠামো! অর্থাৎ, সাদ্দামকে নিহত বা বন্দি করতে পারলেই ইরাক হস্তগত করতে পারবে মার্কিন বাহিনী। বাস্তবেও হয়েছিল সেটাই। সেই থেকে শিক্ষা নিয়ে জাফারি ইরানে এমন ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, যা কখনওই কোনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হবে না। কারও মৃত্যু হলেও ভেঙে পড়বে না গোটা শাসনব্যবস্থা।