গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
হুমকি-হুঁশিয়ারির পথে আর না-হেঁটে ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে দেশছা়ড়া করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস কোথায়, তাঁরা কী অবস্থায় রয়েছেন, সেই সম্পর্কে অন্ধকারে ভেনেজ়ুয়েলার সরকারও। আমেরিকার বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োর ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে খবর, একাধিক অপরাধের অভিযোগে মাদুরোকে গ্রেফতার করেছে আমেরিকা।
একটা সময় পর্যন্ত সংসার চালাতে বাস চালাতেন মাদুরো। ক্রমে ভেনেজ়ুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট উগো চাভেজ়ের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ২০১৩ সালে চাভেজ়ের মৃত্যুর পর ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন তিনি। চাভেজ় এবং তার পর মাদুরোর ২৬ বছরের শাসনে ভেনেজ়ুয়েলায় নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাঁদের দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অফ ভেনেজ়ুয়েলার।
দীর্ঘ দিন ধরেই ভেনেজ়ুয়েলা আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে। মাদুরোর নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার পরেও অবশ্য ২০২৪ সালের নির্বাচনে কার্যত হইহই করে পুননির্বাচিত হয়েছেন মাদুরো। ভেনেজ়ুয়েলার বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ়ই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভোটে কারচুপি করেছেন মাদুরো। মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর। কিন্তু তাঁকে ভোটে লড়তে দেওয়া হয়নি। ২০২৫ সালে ভেনেজ়ুয়েলায় ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ’ মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
কেন মাদুরোর উপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
ট্রাম্পের সঙ্গে মাদুরোর সংঘাত বহু দিনের। ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে মাদকের কারবার চালানোর অভিযোগ তুলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভেনেজ়ুয়েলার শরণার্থীদের আমেরিকায় আশ্রয় নেওয়া নিয়েও আপত্তি ছিল ট্রাম্পের। ২০১৩ সালের পর থেকে ভেনেজ়ুয়েলা থেকে বহু মানুষ আমেরিকায় আশ্রয় নিয়েছেন। তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা চাপানউতর ছিলই। সম্প্রতি মাদক চোরাচালান দুই দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায়। আমেরিকার অভিযোগ, মাদক পাচার এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য তেল ব্যবহার করছে ভেনেজ়ুয়েলা। ওই তেল আদতে চুরি করা হচ্ছে ভেনেজ়ুয়েলার বিভিন্ন খনি থেকে। তার পর তা বিক্রি করে জঙ্গি-কার্যকলাপে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে সম্প্রতি সে দেশের তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভেনেজ়ুয়েলা সীমান্তে কোনও তেলের ট্যাঙ্কার আসা-যাওয়া করতে পারবে না। ভেনেজ়ুয়েলার সরকারকেও ফের ‘জঙ্গি গোষ্ঠীর’ তকমা দেন তিনি। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট হিসাবে মাদুরোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন ট্রাম্প। গত কয়েক মাসে ভেনেজ়ুয়েলাকে ঘিরতে ক্যারিবিয়ান সাগরে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং পরমাণু-ডুবোজাহাজ নামিয়েছিল আমেরিকা। সর্বক্ষণ দেশটিকে একপ্রকার ঘিরে রেখেছিল মার্কিন ফৌজ। শুক্রবার মধ্যরাত (স্থানীয় সময় অনুসারে রাত ২টো) থেকেই ভেনেজ়ুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অন্তত সাত বার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। হামলার খবর পাওয়া যায় সে দেশের মিরান্ডা, আরাগুয়ার মতো প্রদেশেও।
পাল্টা কী দাবি ভেনেজ়ুয়েলার
আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ বলে অভিহিত করেছে ভেনেজ়ুয়েলা। ভেনেজ়ুয়েলার সরকারের দাবি, সে দেশের খনিজ তেল এবং সম্পদ হাতানোর জন্যই এই কাজ করেছে আমেরিকা। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই চেষ্টা সফল হবে না বলে জানিয়েছে তারা। আমেরিকার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বসতি এলাকাতেও হামলা চালানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। এটা ঠিক যে, বিশ্বের বৃহত্তম তৈল উত্তোলক দেশগুলির মধ্যে অগ্রগণ্য ভেনেজ়ুয়েলা। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরে থাকা এই ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশ বরাবরই আমেরিকার শিরঃপীড়ার কারণ। ভূরাজনৈতিক এই বাধ্যবাধকতা থেকেই আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করছিলেন মাদুরো। এমনকি সামরিক অভিযানের আগেই চিনের কয়েক জন প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। ইতিমধ্যেই ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন হানার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়া, ইরান, কিউবার মতো দেশ।