(বাঁ দিকে) খালেদা জ়িয়া এবং চিকিৎসক এফএম সিদ্দিকী (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
বাংলাদেশের সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জ়িয়ার চিকিৎসায় এ বার ‘ইচ্ছাকৃত গাফিলতি’র অভিযোগ উঠল! আর সেই অভিযোগ তুললেন, চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক-চিকিৎসক এফএম সিদ্দিকী স্বয়ং। তিনি বলেন, ‘‘ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে খালেদা জ়িয়ার লিভারের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।’’
ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন খালেদা গত ৩০ ডিসেম্বর প্রয়াত হন। ৮০ বছরের বিএনপি নেত্রী ডায়াবিটিস, আর্থাইটিস, কিডনি, যকৃৎ, হৃদ্রোগ, ফুসফুস, দৃষ্টি সংক্রান্ত একাধিক রোগে দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছিলেন। গত বছর চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো জানিয়েছে, শুক্রবার ঢাকায় খালেদার শোকসভায় চিকিৎসক সিদ্দিকী বলেন, ‘‘আমাদের তত্ত্বাবধানে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে আমরা অত্যন্ত বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করি যে ম্যাডাম (খালেদা) লিভার (যকৃৎ) সিরোসিস রোগে আক্রান্ত। অথচ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার ছাড়পত্রে তাঁর জন্য আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় মেথোট্রেক্সেট নামের একটি ট্যাবলেট নিয়মিত সেবনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ভর্তি থাকা অবস্থাতেও তাঁকে এই ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এই ওষুধটি বন্ধ করে দিই।’’
ঘটনাচক্রে, ঢাকার মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। যার পরিচালনার ভার বর্তমানে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে। খালেদার চিকিৎসার জন্য ভারপ্রাপ্ত চিকিৎসকদলের প্রধান এ ক্ষেত্রে সরকারি চিকিৎসকদের দিকে অভিযোগে আঙুল তুললেও তার নিশানায় ছিল পূর্ববর্তী শাসক শেখ হাসিনার সরকার। প্রসঙ্গত খালেদা ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড–১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে একটি মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। সে সময় থেকেই সিদ্দিকী খালেদার চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন। ৩০ ডিসেম্বর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিলের আগে ঢাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা। সিদ্দিকীর অভিযোগে, সে সময়ই ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ হয়েছিল।
ওই শোকসভায় সিদ্দিকী বলেন, ‘‘ম্যাডাম রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং রিউমাটোলজিস্টদের পরামর্শে তিনি এই ওষুধটি সেবন করছিলেন। এর পাশাপাশি তাঁর এমএএফএলডি (মেটাবোলিক অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ়) ছিল।’’ সেই সঙ্গে তাঁর দাবি, ‘‘ম্যাডামের লিভারের অসুখ নির্ণয় করা খুবই সহজ একটি বিষয় ছিল। এর জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। মেথোট্রেক্সেট সেবনের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্তে লিভার ফাংশনের কয়েকটি উপাদান পরীক্ষা করা জরুরি এবং অস্বাভাবিক ফলাফল পাওয়া গেলে ওষুধটি বন্ধ করে ন্যূনতম পেটের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করে লিভারের অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ম্যাডামের লিভার ফাংশন টেস্ট (যকৃতের কার্যকারিতা পরীক্ষা) খারাপ দেখার পরেও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকেরা একটি আলট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং এমটিএক্স (মেথোট্রেক্সেট) বন্ধ করেননি!’’
খালেদার মৃত্যুর পরেই তাঁকে ‘স্লো পয়জন’ (ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ) করার অভিযোগ তুলেছিলেন বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশ। সেই অভিযোগে কার্যত সম্মতির সিলমোহর দিয়ে চিকিৎসক সিদ্দিকীর মন্তব্য, ‘‘মেথোট্রেক্সেট সেই ওষুধ, যেটা তাঁর ফ্যাটি লিভার অসুখ বাড়িয়েছিল এবং সেটা লিভার সিরোসিসে নিয়ে গিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে এটা তাঁর লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জন’ ছিল।’’ এর পরেই তিনি বলেন, ‘‘এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এটি তাঁকে (খালেদা) হত্যার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ছাড়া তাঁর ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিক্যাল বোর্ডের কাছে রয়েছে।’’ এ বিষয়ে আইনগত ভাবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে খালেদার চিকিৎসাজনিত অবহেলার তিনটি বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক সিদ্দিকী। ওই তিনটি বিষয় হল—
১. সরকার গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন দক্ষতার ভিত্তিতে তাঁরা খালেদার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় তাঁদের ওপর বর্তায় কি না।
২. ঢাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থাকাকালীন কোন কোন চিকিৎসক তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।
৩. মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা চলাকালীন খালেদার আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন— সে ক্ষেত্রে কেন তা হয়নি এবং কারা তাতে বাধা দিয়েছিল?