বেঁচে ফেরার পরে বাবার আদর। মানিসায়। ছবি: এ এফ পি।
সাদা কাপড়ে ঢাকা একের পর এক দেহ থরে থরে সাজানো। বন্ধুর দেহটাও এর মধ্যে রয়েছে কি না, দেখতে গিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। ভয়ে ভয়ে চাদরটা সরাতেই ছিটকে সরে এলেন কয়েক হাত দূরে। মৃতদেহের কয়লার মতো মুখটা যেন গিলে খেতে আসছে! মুখ চেনা দায়।
এ মুহূর্তে পশ্চিম তুরস্কের মানিসা শহরের সোমা কয়লা খনি অঞ্চলের ছবিটা এমনই। মঙ্গলবার সন্ধে সাতটা নাগাদ আগুন লাগার খবর আসে স্থানীয় একটি খনি থেকে। এর পর কেটে গিয়েছে গোটা একটা দিন। ধোঁয়া বেরোচ্ছে এখনও। শ্বাসরোধ করা বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যেই প্রাণ হাতে করে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে সেনা-দমকলবাহিনী। সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন ওই খনিরই ‘ভাগ্যবান’ কর্মীরা। সৌভাগ্য তো বটেই। খনির ট্রান্সফর্মারটিতে যখন বিস্ফোরণ ঘটে, তার একটু আগেই এক দল কর্মীর ছুটি হয়ে যায়। কাজে যোগ দেন নতুন লোকেরা। বলি হয়েছেন মূলত তাঁরাই। এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছুঁয়েছে ২৩২। উদ্ধারকর্মীরাই বলছেন, বিস্ফোরণের সময় খনিতে অন্তত ৭৮৭ জন লোক ছিলেন। তাই মৃতের সংখ্যা যে আরও কত শত বাড়বে, তার ঠিক নেই।
তুরস্কে খনি-বিপর্যয় নতুন কিছু নয়। মাঝেমধ্যেই ঘটে। একাংশের মতে, অব্যবস্থা-নিরাপত্তার অভাবই এর জন্য দায়ী। ১৯৯২ সালে এমনই এক খনি বিস্ফোরণে ২৬৩ জন মারা যান। এ বারে অবশ্য খনির মালিক অব্যবস্থার কথা মানতে নারাজ। তাঁকে সমর্থন জানিয়ে এক মন্ত্রীও জানালেন, ২০১২ সাল থেকে পাঁচ বার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
খনি-মালিক বললেন, “এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, কর্মীদের তাঁদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া।” যদিও তুরস্কের শক্তি-মন্ত্রীই জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজের প্রথম পর্যায়ে মাত্র ৯৩ জন কর্মী খনির গহ্বর থেকে বেঁচে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৫ জনই জখম। স্বাভাবিক ভাবেই যত সময় গড়াচ্ছে, প্রাণের আশা ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। তিনি-ই বললেন, “শ’চারেক উদ্ধারকর্মী দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন।” ঘটনাস্থলে হাজির রয়েছেন চিকিৎসক-নার্সরাও। নাগাড়ে বেজে চলেছে অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেন। ধোঁয়া-ধুলো-আতঙ্ক, দমবন্ধ করা পরিবেশের মধ্যেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে নিখোঁজ কর্মীদের পরিজনেরাও। যদি ভালমন্দ কোনও একটা খবর মেলে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধ। বিড়বিড় করে এক মনে প্রার্থনা করে যাচ্ছিলেন। স্ট্রেচারে করে দেহগুলো রাখতেই কাপড়ের ঢাকাটা সরিয়ে দিলেন। মুখটা দেখেই চিনতে পেরেছেন ছেলেকে। কোনও মতে তাঁকে সামলাল পুলিশ। আগলে রাখল তারাই।
দশ জনের একটি দল নিয়ে বন্ধুদের খোঁজে খনির এক কিলোমিটার গভীরে নেমে গিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। তার বেশি আর এগোতে পারেননি। তিন সহকর্মীর দেহ নিয়ে ফিরতে হয়েছে। বললেন, কার্বন মনোক্সাইডেই অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে। ভাইয়ের সন্ধানে খনিতে ঢুকে পড়েন অন্য এক ব্যক্তি। বিস্ফোরণের সময় কাছেই আর একটি খনিতে কাজ করছিলেন তিনি। দেড়শো মিটারের বেশি এগোতে পারেননি তিনিও। ছলছল চোখে বললেন, “কোনও আশা নেই। ও আর বেঁচে নেই!”
অসংখ্য মৃতদেহের ভিড়ে মাঝেমধ্যে মিলছে প্রাণের সন্ধান। সেনা তখন উল্লাসে ফেটে পড়ছে। আর সে সঙ্গে আশায় বুক বাঁধছে এক দল। তাদের ঘরের ছেলেটাও যদি বেঁচে ফেরে। এ ভাবেও তো ফিরে আসা যায়!