SIR in West Bengal

‘শাপে বর’ হল! সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অসুবিধার চেয়ে আসলে তাদের সুবিধাই করে দিল বেশি, দাবি করছে নির্বাচন কমিশন

গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে শুনানি শুরু হয়েছে। তার পর থেকে প্রায় এক মাস হতে চলল। কিন্তু সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ ভোটারেরই শুনানি সম্ভব হয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:১৮
এসআইআর-এর শুনানির জন্য লাইন ভোটারদের।

এসআইআর-এর শুনানির জন্য লাইন ভোটারদের। —ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এক প্রকার ‘শাপে বর’ই হয়েছে কমিশনের। এমনটাই মনে করছেন নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের একাংশ। তাঁদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অসুবিধার চেয়ে সুবিধাই করে দিয়েছে কমিশনের। আদালতের বেশির ভাগ নির্দেশ এসআইআর-এর কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছে বলেই মনে করছেন তাঁরা।

Advertisement

কমিশনের এক আধিকারিকের কথায়, “নির্বাচন কমিশনের মূল কাজে হস্তক্ষেপ করেনি সুপ্রিম কোর্ট। আদালত একবারও বলেনি শুনানি করা যাবে না। কমিশনের চিহ্নিত ভোটারদের শুনানিতে অংশ নিতে বলেছে। এমনকি, শুনানির জন্য অতিরিক্ত সময়ও পাওয়া যেতে পারে।”

বস্তুত, রাজ্যে ‘আনম্যাপ্‌ড’ এবং তথ্যগত অসঙ্গতি (লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি) থাকা প্রায় ১ কোটি ২৬ লক্ষ ভোটারকে শুনানির জন্য নোটিস পাঠানো হয়েছে। গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে শুনানি শুরু হয়েছে। শুনানি শুরুর পর থেকে প্রায় এক মাস হতে চলল। কিন্তু সূত্রের খবর, এখনও পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ ভোটারেরই শুনানি সম্ভব হয়েছে। বাকিদের এখনও শুনানি করা যায়নি।

পূর্ব ঘোষিত সূচি অনুসারে, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুনানির শেষ দিন। কমিশনের এক আধিকারিক জানাচ্ছেন, এত সংখ্যক ভোটারের শুনানি করতে গিয়ে দৃশ্যত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। হাতে আর অল্প কয়েক দিন বাকি রয়েছে। এই ক’দিনের মধ্যে কাজ কী ভাবে শেষ করবেন, তা নিয়েও চিন্তা ছিল। এ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কমিশনেরই সুবিধা হয়েছে বলে মনে করছেন আধিকারিকদের একাংশ। কারণ তাঁদের মতে, আদালতের নির্দেশের পরে শুনানি প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য আরও কিছু দিন বাড়তি সময় পেয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এত দিন পর্যন্ত তথ্যগত অসঙ্গতি থাকা ভোটারদের কেন্দ্রীয় ভাবে একটি তালিকা থেকেই ডাকা হচ্ছিল। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, ওই তালিকা প্রকাশ্যে আনতে হবে। পঞ্চায়েত ভবন, ব্লক অফিস, পুরসভার ওয়ার্ড অফিসে ওই তালিকা টাঙাতে হবে। তালিকা প্রকাশের দিন থেকে অতিরিক্ত ১০ দিন সময় দিতে হবে। যাঁরা এখনও দাবি, নথি বা আপত্তি জমা দেননি, তাঁদের জন্য ওই অতিরিক্ত সময় দিতে হবে।

কমিশনের আধিকারিকদের একাংশ মনে করছেন, এর ফলে শুনানির কাজ শেষ করতে পূর্ব ঘোষিত সূচির তুলনায় আরও অন্তত ১০ দিন বেশি সময় পেতে পারেন তাঁরা। যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছাড়াই কমিশন নিজে থেকে সময়সীমায় এই পরিবর্তন করতে পারত। তবে এ ক্ষেত্রে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আসায় কমিশনের কাজে কিছুটা সুবিধাই হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

কমিশনের এ রাজ্যের ওই আধিকারিকের আরও দাবি, সুপ্রিম কোর্ট যে তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে, সেই প্রস্তাব তারা কমিশনের কাছে আগেই দিয়েছিল। তাঁর দাবি, মৃত, স্থানান্তরিতদের সঙ্গে ‘নো-ম্যাপিং’ এবং তথ্যগত অসঙ্গতি থাকা ভোটারদের তালিকাও প্রকাশ করা হোক— এমন প্রস্তাব গিয়েছিল।

ওই আধিকারিকের কথায়, ‘‘এই তালিকা প্রকাশ হলে ইআরও-দের কাজ অনেক সহজ হবে। তাঁরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে পারবেন।’’ কিন্তু বাকি রাজ্যের কথা মাথায় রেখে আগে থেকে সেই পথে হাঁটেনি কমিশন। পরে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল ওই তালিকাপ্রকাশ চেয়ে আবেদন জানায়। এখন কমিশনের শুনানিতে ডাক পড়া সকলের তালিকাই প্রকাশিত হচ্ছে। এর ফলে একই সঙ্গে প্রতি দিনের শুনানির সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

পাশাপাশি, এসআইআর-এর কাজ সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ করতে হবে বলে জানিয়েছে সুুপ্রিম কোর্ট। আদালত আরও জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় কর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন নিয়ে কমিশন এবং রাজ্যের জারি করা নির্দেশ যথাযথ ভাবে পালন করতে হবে প্রত্যেক জেলাশাসককে। এই প্রক্রিয়ায় যাতে কোনও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা না হয় তা দেখতে হবে রাজ্য পুলিশের ডিজি, প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার এবং জেলাশাসককে।

আদালতের এই নির্দেশের ফলে কমিশনের সুবিধাই হয়েছে বলে মনে করছেন এ রাজ্যে কমিশনের আধিকারিকদের একাংশ। কমিশনের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘রাজ্যের কাছ থেকে এত দিন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর চাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তা পাওয়া যাচ্ছিল না। এ বার সেই সমস্যা মিটবে।’’ তা ছাড়া সম্প্রতি বিভিন্ন শুনানিকেন্দ্রে গোলমালের অভিযোগ উঠে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ফলে আগামী দিনে এই ধরনের ঘটনা এড়াতে পুলিশ আরও বেশি তৎপর থাকবে বলেও মনে করছেন কমিশনের ওই আধিকারিক।

যদিও সুপ্রিম কোর্টে কিছু ক্ষেত্রে ধাক্কাও খেয়েছে কমিশন। যেমন, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কোনও ভোটারের অনুমোদিত প্রতিনিধিও শুনানিতে যোগ দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সেই অনুমোদিত প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট এলাকার বুথস্তরের এজেন্ট (বিএলএ)-ও হতে পারেন। মুখে ‘ধাক্কা’র কথা স্বীকার করছেন না কমিশনের আধিকারিকেরা। তবে আদালতের এই নির্দেশে দৃশ্যত কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে কমিশন। কারণ, এই দাবি তৃণমূল আগে থেকেই তুলে আসছিল। এবং আদালতের এই নির্দেশকে নিজেদের ‘জয়’ হিসাবেই ব্যাখ্যা করছে রাজ্যের শাসকদল।

এর আগে কমিশন বলেছিল, ভোটারদের শুনানির নথি হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড গ্রাহ্য হবে না। মাধ্যমিক পাশের শংসাপত্রই লাগবে। তবে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, শুনানির সময় মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, যেখানে জন্মতারিখ উল্লেখ থাকে, তা মাধ্যমিক পাশ সার্টিফিকেটের বিকল্প নথি হিসাবে জমা দেওয়া যেতে পারে।

Advertisement
আরও পড়ুন