Share this candidate

CLOSE

রাজা-উজিরের গপ্পো

সুতো-সুঁই থেকে ‘চলবে না’!

অগ্নিমিত্রা পাল, বয়স: ৫১

বাবাকে দেখে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ছোটবেলায়। আসানসোলের পরিচিত চিকিৎসক অশোক রায়ের কন্যা অগ্নিমিত্রা ছোট থেকেই ভাবতেন, স্টেথোস্কোপই হবে তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। কিন্তু বটানির বই ছেড়ে একসময় হাতে তুলে নিলেন সুতো-সুঁই। ফ্যাশনের জগতে ঢুকে হয়ে গেলেন নামী ডিজাইনার। কলকাতার পেজ থ্রি পার্টি, সেলেবদের ভিড় সর্বত্রই তাঁর অবাধ বিচরণ। প্রিয় অভিনেত্রী শ্রীদেবীর জন্য পোশাক তৈরির সুযোগ যেন সেই সাফল্যের শিরোপা। ২০১৯ সালে জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। মুকুল রায় এবং কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের হাত ধরে বিজেপিতে যোগদান। সেখান থেকেই নতুন অবতার অগ্নির। ডিজাইনার হয়ে গেলেন আগুনঝরা নেত্রী। রাজ্য বিজেপির মহিলা মোর্চার দায়িত্ব, শাসকের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন— সবমিলিয়ে দ্রুত উত্থান তাঁর। ২০২১ সালে আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে তাঁকে টিকিট দিয়েছিল বিজেপি। প্রথম বার ভোটে দাঁড়িয়েই জয়। তৃণমূলের টিকিটে ময়দানে য়ুযুধান সায়নী ঘোষকে হারিয়েছিলেন অগ্নিমিত্রা। বিধায়ক হয়ে বিধানসভায় বক্তৃতা করেছেন। ড্রয়িং খাতায় ফ্যাশনের বদলে উঠে এসেছে পদ্মফুল। বিধানসভায় বিজেপির যে ‘হল্লা ব্রিগেড’ সর্বদা শাসক তৃণমূলের কড়া নজরে থেকেছে গত পাঁচ বছর, তার অন্যতম সদস্য অগ্নিমিত্রা। তবে রাজনীতির মঞ্চে সবসময় জয় আসেনি। লোকসভায় দু’বার লড়ে হেরে গিয়েছেন। তবে আপাত-গ্ল্যামারের ঝলকানির দুনিয়ায় সে ভাবে ফেরেননি। এখন তাঁর বিচরণ রাজনীতির গ্রহে। বিজেপি কর্মীদের কাছে পরিচয়: ‘অগ্নিদিদি’।

অজানা কথা

মঙ্গলবার মানেই নিরামিষ খাবার আর হনুমানজির পুজো। আলমারিতে ডিজ়াইনার পোশাকের জায়গা নিয়েছে গেরুয়াপাড় শাড়ি। আক্ষেপ, প্রবল ব্যস্ততায় পরিবারকে সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ

হুড়-হুড় দবং, দবং দবং!

ফিরহাদ হাকিম, বয়স: ৬৭

কলকাতার মেয়র। রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রীও বটে। ফলত তৃণমূলে একদা প্রস্তাবিত ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতির কঠিন ব্যতিক্রম। গত কয়েকমাস ধরে শরীরচর্চায় মন দিয়েছেন। সিপিএম আমলে মার খেয়ে অর্জন করা কোমরের চোট এখনও ভোগায়। কিন্তু রাজনীতিতে ‘সক্রিয়’ থাকতে হবে। দিদির দলে হাঁটা মাস্ট! অতএব চেতলা পার্কে রোজ হাঁটেন। কন্যা প্রিয়দর্শিনীর পরামর্শ মেনে এড়িয়ে চলেন মিষ্টি। মন্ত্রী হলেও চেতলা বাজারের কাছে ‘মহামিলনের ঠেক’-এ নিয়মিত যাতায়াত আছে। সেখানে পাড়ার শাসক থেকে বিরোধী সব মতাবলম্বীদের গুলতানি। মন্ত্রিত্বকে জোব্বার মতো গায়ে জড়িয়ে রাখেন না। পাড়ার লোক ডাকলে এক্সারসাইজ় মাঝপথে থামিয়ে বিড়াল উদ্ধার করতে চলে যান। রাজনীতি থেকে সমাজনীতি— ফিরহাদ হাকিম ‘ববি’ নামেই পরিচিত। বাবা আব্দুল হাকিম নাম রেখেছিলেন তাঁর প্রিয় অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ববি সিম্পসনের নামে। পিতার স্বপ্ন ছিল, ছেলে নামজাদা বক্সার হবে। কিন্তু বিধির বিধান ববিকে বানিয়েছে রাজনীতির রিংয়ের ওজনদার খেলোয়াড়! কলকাতা পুরসভা থেকে নবান্ন, নবান্নের ১৪ তলায় মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে তাঁর কালীঘাটের বাড়ির অন্দরমহল— ববির অবাধ যাতায়াত। প্রয়োজনে শীর্ষ আধিকারিকদের ধমকও দেন। তিনিই আবার একতাল নরম কাদামাটি ছোট্ট নাতনি আয়াতের সামনে। 

অজানা কথা

প্রথম বার বন্দরের বিধায়ক। তাঁর খিদিরপুরে অফিসে হাতে পিস্তল নিয়ে ঢুকে পড়েছিল একজন। সকলে থরহরিকম্প। ববি চেয়ার ছেড়ে উঠে এক লাথিতে সামনের টেবিল উল্টে দিয়েছিলেন। বীরপুঙ্গব ভ্যাবাচাকা! আর ববি ‘দবং হিরো’।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

নামে নীল, কাজে লাল-সবুজ-কমলা

রুদ্রনীল ঘোষ, বয়স: ৫৩

‘বাম’ থেকে ‘রাম’ হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তিনি। তবে সরাসরি নয়। ভায়া তৃণমূল। ছাত্রজীবনে ছিলেন সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর নেতা। কর্মক্ষেত্র ছিল হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজ। ছাত্রফ্রন্ট থেকে সিপিএমের পার্টি সদস্যপদও পেয়‌েছিলেন। তা নিয়ে তাঁর শ্লাঘাবোধও রয়েছে। কিন্তু তৃণমূল সরকারে আসার পরে লাল থেকে ক্রমে সবুজঘেঁষা হয়ে ওঠেন। জুটে গিয়েছিল সরকারি পদও। সে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে তিনি কমলা শিবিরে চলে যান। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি-র হয়ে প্রথম লড়েছিলেন ভবানীপুরে। কিন্তু এ বার তাঁর ‘পুর’ বদলেছে। তিনি লড়ছেন হাওড়ার শিবপুর থেকে। যা তাঁর ‘ঘরের মাঠ’। সেখানে তৃণমূলের প্রার্থী রানা চট্টোপাধ্যায়। যিনি গত বার জিতেছিলেন বালি কেন্দ্রে। এই সুযোগে রুদ্রবাহিনী চোরাগোপ্তা প্রচার করছে, ‘শিবপুর নিজের ছেলেকেই চায়!’ গত বিধানসভা ভোটে পদ্মের প্রতীকে রুদ্রের সঙ্গে লড়েছিলেন তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা তনুশ্রী চক্রবর্তীও। ভোটের পরে তনুশ্রী রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলেও রুদ্র মাটি কামড়ে ছিলেন। তনুশ্রী বিবাহ করে ভিন্‌দেশে সংসারধর্ম করছেন। কিন্তু ‘বিজেপি-র রাহুল গান্ধী’ রুদ্র এখনও অকৃতদার। গত নভেম্বরে তনুশ্রীর বিয়ের পরে রুদ্রকে নিয়ে কৌতূহল বেড়েছিল। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিয়ে করবেন। তবে কি ভোট মিটলেই সানাই বাজবে? 

 

অজানা কথা

বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন স্কুলশিক্ষক। বাবা ছিলেন আঁকিয়ে। সরকারি আর্ট কলেজের ডিগ্রিধারী। সেই সূত্রেই আঁকা রুদ্রের রক্তে। তিনি এখনও আঁকেন। তবে ক্যানভাসে আঁকার সুযোগ খুব একটা পান না। বদলে এমন একটি মোবাইল সেট ব্যবহার করেন, যাতে ডিজিটাল পেন্টিংয়ের বন্দোবস্ত রয়েছে। তাতেই ছবি আঁকেন অভিনেতা-নেতা।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

বঙ্গের নারী, অন্ধ্রের নাড়ি

শশী পাঁজা, বয়স: ৬৩

‌শ্যামবাজারের শশীবাবুকে চেনেন? যুগ যুগ ধরে তিনি বাঙালির জিভের জড়তা কাটানোর জনক। আর শ্যামপুকুরের শশী পাঁজা? তিনি বাবু নন। বিবি। উত্তর কলকাতার পাঁজা পরিবারের বধূ। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রয়াত অজিত পাঁজার পুত্রবধূ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের মন্ত্রী। গোড়া থেকে নারী ও শিশুকল্যাণ দফতর নিয়েই থাকতেন। কয়েক বছর আগে তার সঙ্গে জুড়েছে শিল্প-বাণিজ্য দফতরও। যদিও মুখ্যমন্ত্রী বিদেশে বিনিয়োগ আনতে গেলে শশীকে কলকাতাতেই থাকতে হয়। পেশায় তিনি চিকিৎসক। এবং ঘটনাচক্রে, আরজি করের প্রাক্তনী। স্বামী প্রসূন পাঁজাও চিকিৎসক। তিনিও আরজি কর। ২০১০ সালে প্রথম তৃণমূলের টিকিটে জিতে কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর। তার পরে ২০১১ সাল থেকে পর পর তিন বার শ্যামপুকুরের বিধায়ক। এ বারও লড়ছেন সেখানেই। তিনিই তৃণমূলে একমাত্র ‘দখিন হাওয়া’। তেলুগু পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন হিন্দমোটরের পদস্থ কর্তা। চাকরিসূত্রেই পশ্চিমবাংলায় এসেছিলেন। থেকে যান হুগলিতে। শশী পশ্চিমবঙ্গের নারীদের নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু তাঁর নাড়ির যোগ অন্ধ্রে। বাংলা তাঁর স্বামীর ভাষা। তেলুগু তাঁর মাতৃভাষা। তিনি দু’টিতেই সড়গড়। 

অজানা কথা

পাঁজা পরিবার রাজ্য-রাজনীতিতে বিরল। তাদের তৃতীয় প্রজন্ম রাজনীতিতে। অজিতের পর শশী। শশীর পরে তাঁর কন্যা পূজা পাঁজা কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর। পাঁজাবাড়ির অন্দরমহল বলছে, মেয়ের জন্য সৎপাত্র দেখতে চাইছেন শশী। কিন্তু বিয়ের কথা শুনলেই মন্ত্রী মায়ের উপর বেজায় চটে যাচ্ছেন কাউন্সিলর কন্যা।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

হিং ‘স্টিং’ ছট্

হুমায়ুন কবীর, বয়স: ৬৩

রাজ্য-রাজনীতির গেছোদাদা। গত ১৫ বছরে ‘ডাল’, থুড়ি ‘দল’ বদল করেছেন অহরহ। এই তিনি কংগ্রেস তো এই তৃণমূলে, এই তিনি বিজেপি তো এই আবার তৃণমূল। শেষমেশ ডালবদলে ইতি টেনে আস্ত একটা দল গড়ে ফেলেছেন। প্রথমে দলের নাম রেখেছিলেন ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’। মুর্শিদাবাদ আমের জন্য খ্যাত বলে সম্ভবত দলের নামে জনতার আগে ‘আম’ জুড়তে হয়েছে হুমায়ুনকে। অর্থাৎ, ‘আমজনতা উন্নয়ন পার্টি’। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর স্বপ্নমঙ্গল কি দুঃস্বপ্নে পর্যবসিত হইল? ভোটের অব্যবহিত আগেই গোপন ক্যামেরা অভিযানের ‘হিং স্টিং ছট্’ প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। যাতে বিজেপির সঙ্গে তাঁর যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। হতচকিত কবীর প্রথমে বলেছিলেন, ভিডিয়ো এআই দিয়ে তৈরি। পরে অবশ্য বলেছেন, তিনি পুরো ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আনবেন। অর্থাৎ, এআই দিয়ে যে তৈরি নয়, তা নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। স্টিং-কাণ্ডের পরে হুমায়ুনের দলকে তালাক দিয়েছে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির মিম। তবে হুমায়ুন শুধু রাজনীতির জিরাফ হয়ে বড় গলা করে কথা বলছেন না। তিনি ধর্মেও আছেন। বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করেছেন। এই বৈশাখে হুমায়ুন কি ভোটের হালখাতা খুলতে পারবেন?

অজানা কথা

এককালে বেলডাঙায় সাইকেলের দোকান চালাতেন। কংগ্রেসি রাজনীতি থেকেই উত্থান। বাড়তে থাকে প্রতাপ। পাল্লা দিয়ে বাড়ে ব্যবসা। জোড়া রাইস মিলের মালিক হন। বাবরি মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে টাকা জোগাড় করতে একটি রাইস মিল অবশ্য বিক্রি করে দিয়েছেন।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

ফ্রেমের প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী

অরূপ বিশ্বাস, বয়স: ৬১

ছবিই কর্ম, ছবিই ধর্ম, ছবি হি পরমং তপঃ। ছবি ছাড়া তিনি যেন জল বিনে মছলি। কাজ করেন উদয়াস্ত। সে কাজও ছবিতে ধরা থাকে। ডিসেম্বরে একটু ছবি কেলেঙ্কারি হয়েছিল ঠিকই। লিয়োনেল মেসির সঙ্গে ছবি তোলাতে গিয়ে সমস্যা। সাধের ক্রীড়া দফতর থেকেই অব্যাহতি নিতে হল মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে। জীবনের শুরুর ছবি খুব সাদামাঠা। নিউ আলিপুর কলেজে ছাত্র রাজনীতি দিয়ে। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলে নাম লেখানোর পর থেকেই তাঁর জীবন-লিফ্‌টের বোতামে হাত। কাউন্সিলর থেকে বরো চেয়ারম্যান, সেখান থেকে ঝপ করে টালিগঞ্জের বিধায়ক। তা-ও ভোটের মাত্র ২১ দিন আগে টিকিট পেয়ে। জিতেছিলেন মাত্র ৫২৬ ভোটে। সেই থেকে ছুটছে তাঁর অশ্বমেধের ঘোড়া। প্রতিবারই শোনা যায়, তাঁর আসন নাকি টলোমল। কিন্তু প্রতিবারই তিনি টালিগঞ্জের ‘ফার্স্ট বয়’। কারণ, তিনি সারাবছর পড়াশোনা করেন। ফলে পরীক্ষায় ভয় নেই। ভোটও বোঝেন ছবির মতো। যেমন বোঝেন পুজো। আর বোঝেন দিদি। ২০১১ সালে রাজ্যে ‘পরিবর্তনের সরকার’ এলেও প্রথম দফায় মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি। তীব্র অভিমানে অভিন্নহৃদয় বন্ধু (এবং মন্ত্রী) ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে কথা বলতেন না। তবে বেশিদিন ঠোঁট ফুলিয়ে থাকতে হয়নি। মাত্র ন’মাস পরেই রদবদলে অরূপ মন্ত্রী। দায়িত্বের ঝুলি ভারী একাধিক দফতরে। একদা অতিরিক্ত হাঁটায় অনীহা ছিল। জেলাসফরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কয়েক বার তাঁকে হাঁটার সঙ্গী করেছিলেন। তার পর থেকে দেখা গিয়েছিল, মমতার সঙ্গে সফরে গেলেও ঠিক ‘সময়মতো’ অরূপের দফতরের বৈঠক পড়ে যায়। সেই প্রকল্পের নাম ‘দিদিকে বোলো না’। 

অজানা কথা

অকৃতদার অরূপ সম্প্রতি একটি ‘বিগ্‌ল’ পুষেছেন। ছানাটি দুরন্ত। ছটফটে শিশু সারমেয়কে কোলে তুলে আদর করতে গিয়ে সম্প্রতি আঁচড় খেয়েছেন। ভোটের সময়। তাই ঝুঁকি নেননি। সটান নিজ কেন্দ্রের বাঙ্গুর হাসপাতালে। ইঞ্জেকশন নিয়ে আবার প্রচারে। তবে পোষ্যের সঙ্গে এখনও কোনও ছবি দেখা যায়নি।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

হাউ ইজ় দ্য জোশ? দিলীপ ঘোষ!

দিলীপ ঘোষ, বয়স: ৬২

ডানপিটে ছেলের তকমা ছোটবেলা থেকেই। বাড়ির লোকের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া সেই ছেলেই এখন বিজেপি রাজনীতির আগুনখোর মুখ। এখনও লাঠি খেলেন। তলোয়ারও তাঁর হাতে অনায়াস। কথার ঝাঁজে এখনও আগুন। স্পষ্ট কথায় তাঁর কষ্ট নেই। জীবন বারবার ছুড়ে দিয়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে। আন্দামানে সুনামি থেকে বাংলার রাজনৈতিক ময়দান— সর্বত্র লড়ে গিয়েছেন। নিজের স্লোগান নিজেই বাঁধেন, ‘হাউ ইজ় দ্য জোশ? দিলীপ ঘোষ!’ সঙ্ঘের প্রচারক থেকে হঠাৎ বাংলার রাজনীতিতে অবতরণ। তার পরে রাজ্য বিজেপির সভাপতি, বিধায়ক, সাংসদ। দিলীপের উত্থান যেন ছায়াছবির চিত্রনাট্য। মাত্র কয়েক বছরে পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে ‘গেমচেঞ্জার’। ৪ শতাংশের দলকে ৪০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব তাঁরই ঝুলিতে। তবে রাজনীতি যেমন উত্থান দেয়, তেমনই পতনের স্বাদও চাখিয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে আসন বদলে হারের ধাক্কা, সভাপতির পদ হারানোয় কেরিয়ারে খানিক গ্রহণ লেগেছিল। রাজ্য বিজেপি-তে শমীক ভট্টাচার্যের জমানা শুরু হওয়ার পরে আবার আলোকবৃত্তে তিনি। আবার বিধানসভা ভোটের ময়দানে। বিতর্ক তাঁর নিত্যসঙ্গী, সিদ্ধান্তে অনড় থাকা তাঁর স্বভাব। ব্যক্তিগত জীবনেও চমক! বিবাহ থেকে রাজনৈতিক দূরত্ব, আবার প্রত্যাবর্তন। নির্বাচনের ময়দানে আবার হুঙ্কার ছাড়ছেন তিনি।

অজানা কথা

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রাজনীতির জটিল সমীকরণ মেলান। অবসর পেলে বাগান নিয়ে পড়ে থাকতে ভালোবাসেন। রাজনীতিতে হতাশ হয়ে এক সময়ে ভেবেছিলেন ড্রাগনফ্রুট চাষ করবেন! এখন অবশ্য পদ্মফুলে ভরসা ফিরে এসেছে।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

বহুরূপে সম্মুখে তোমার

ব্রাত্য বসু, বয়স: ৫৭

একই অবয়বে বহু চরিত্রের বাস। মন্ত্রী, রাজনীতিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা, অধ্যাপক— রেকারিং ডেসিম্যালের মতো পরিচয় চলেছে তো চলেছেই! তালিকা শেষ করতে গেলে শ্বাস ফুরিয়ে যায়। একসময় নিজের পরিচয়ে ‘নাট্যকার’ শব্দটাই সবচেয়ে আগে বসাতেন। তিনি বড় পরিচালক না বড় অভিনেতা, সে তর্ক চলতেই থাকবে। তবে এখন ভোটের অঙ্ক মেলাতে মেলাতে ‘রাজনীতিক’ পরিচয়টাই সামনে এনে ফেলেছেন। পিতৃদত্ত নাম ছিল ব্রাত্যব্রত। নাট্যকার বিষ্ণু বসুর পুত্র তিনি। কিন্তু স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় ‘ব্রত’ খসে পড়ে। সেই থেকে তিনি শুধুই ‘ব্রাত্য’। তাঁর আরও এক পরিচয় ‘নিয়ন্ত্রণপ্রিয়তা’। বিশেষত, বাতানুকূল যন্ত্রের ক্ষেত্রে। দফতর হোক বা বাড়ি, পার্টি অফিস হোক বা মিটিং রুম— ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস যেন তাঁর ব্যক্তিগত মতাদর্শ! বিশ্ব রাজনীতি থেকে সিনেমার খুঁটিনাটি নখদর্পণে। ব্রাজিল থেকে ভেনেজুয়েলা, হলিউড থেকে বলিউড। কোথায় পৃথিবী কোন দিকে মোড় নিচ্ছে অনর্গল বলে যেতে পারেন। কথায় কথায় উদ্ধৃতি দেন লিও তলস্তয় থেকে চিয়াং কাইশেক। সবই তাঁর ঠোঁটস্থ। ফলে আড্ডা যে কখন ডিঙি মেরে ‘লেকচার’ হয়ে যায়, টের পাওয়া দায়। দুর্বলতা? ধূমপান। একবার বিধানসভায় ভোটাভুটির মাঝেই ‘সুখটান’-এর টানে বাইরে গিয়ে স্পিকারের কড়া সিদ্ধান্তে ভোট দিতে পারেননি! ভোজনরসিক তিনি চিরকাল। অধ্যাপক ব্রাত্যের খাসির মাংস প্রিয় ছিল। কিন্তু রাজনীতিক ব্রাত্য বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে রসনায় লাগাম টেনেছেন। আফসোসটা রয়ে গিয়েছে।

অজানা কথা

নিয়ম করে প্রতি রাতে একটি করে আন্তর্জাতিক ছবি দেখেন। আর রোজ ভোরে উঠে নিয়ম করে লেখেন। দেখা এবং লেখায় তিনি ক্লান্তিহীন। আর ক্লান্তিহীন ফুটবল আলোচনায়। ফুটবলপ্রেমে বিশ্বকাপও দেখে এসেছেন। আর ক্লান্তি নেই ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থনে।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

বাসন্তী রং দিয়া

মানস ভুঁইয়া, বয়স: ৭৪

বাসন্তী রং তাঁর বিশেষ প্রিয়। প্রায় সময়েই বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবিতে শোভিত থাকেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে দ্রুততম দৌড়ের রেকর্ডও তাঁরই দখলে। কংগ্রেসে থাকার সময় বর্ধমানের মঙ্গলকোটে সিপিএম হার্মাদদের তাড়া খেয়ে ধুতি হাঁটুর উপর তুলে ধানক্ষেত পেরিয়ে যে দৌড় দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গবাসী চিরকাল মনে রাখবেন। পেশায় চিকিৎসক। নামডাকও ছিল। কিন্তু রাজনীতির নিশির ডাক যে শুনেছে, তাকে কি আর স্টেথোস্কোপ আটকে রাখতে পারে! সেই কবে থেকে তিনি সবংয়ের বিধায়ক! প্রথমে কংগ্রেসের। পরে তৃণমূলের। একদা বলতেন, তাঁর মরদেহে কংগ্রেসের তেরঙা পতাকা থাকবে। খুব ভুল বলতেন না। রং সেই তিনটিই আছে এখনও। শুধু ভিতরে ‘হাত’ বদলে ‘জোড়াফুল’ হয়েছে। তাতে কী? রং এবং সবং— দুই’ই ধরে রেখেছেন। গ্রহের ফেরে যখন একবার রাজ্যসভায় যেতে হয়েছিল, তখনও সবংকে বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন সহধর্মিনী গীতার আঁচলে। মানসের আত্মজ কৌশিকও পেশায় চিকিৎসক। বিদেশে থাকেন। পড়াশোনার প্রতি এখনও অনুরাগ আছে। বয়সে ছোট কারও কাছেও শিক্ষা নিতে আপত্তি নেই। পুত্রের কাছ থেকে ভার্চুয়াল ক্লাসে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে সড়গড় হয়ে নেন মাঝেমধ্যেই। তবে মানসের আরও দুই কন্যা আছে। কেলেঘাই এবং কপালেশ্বরী সেই দুই ‘মানসকন্যা’। যারা তাঁকে বছরের পর বছর ভোটে জেতায়। দুই নদীর জলে বন্যার সুরাহা করবেন বলে প্রতিবার ভোট প্রার্থনা করেন তিনি। 

অজানা কথা

পাঁচ কন্যার পর জন্ম পুত্রসন্তানের। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন ‘ডিম্বেশ্বর’। যার অর্থ ‘করুণার প্রভু’ অথবা ‘শিব’। তবে ইস্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে সেই নাম বদলে গেল। কঠিন এবং দুরূহ উচ্চারণের ‘ডিম্বেশ্বর’ নয়। সহজ এবং সরল ‘মানস’।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

এক জীবনে তিন মঞ্চ

মৌসম বেনজির নূর, বয়স: ৪৬

মৌসম নামের মতো বদলই তাঁর পরিচয়। কখনও কংগ্রেস, কখনও তৃণমূল, আবার ফের কংগ্রেস। গত কয়েক বছরে বাংলার রাজনীতিতে এমন ‘মৌসুমি হাওয়া’ কমই দেখা গিয়েছে! তিনিই ভারতের সেই বিরল রাজনীতিকদের একজন, যিনি তিনটি আইনসভার ই সদস্য হয়েছেন। বিধানসভা, লোকসভা এবং রাজ্যসভা। রাজনীতির রক্ত তাঁর জন্মগত। মালদহের বরকত গনি খান চৌধুরীর উত্তরাধিকার এখনও তাঁদের পরিবারকে প্রাসঙ্গিক রেখেছে। সেই সূত্রেই মায়ের মৃত্যুর পর মাত্র ২৯ বছর বয়সে সুজাপুর বিধানসভায় পা রাখেন। তারপর আর থামেননি। বিধায়কত্ব শেষ হওয়ার আগেই লোকসভায় ঝাঁপ। কংগ্রেসের টিকিটে মালদহ উত্তর থেকে সাংসদ। অল্পদিনেই ‘হাইকম্যান্ড’-এর নজরে পড়ে যাওয়া। তারপরেই হঠাৎ মোড়। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে তৃণমূলে যোগ। ভোটে হারলেও ভাগ্য সহায়। ২০২০ সালে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ। কিন্তু সেখানেও স্থায়ী হল না ঠিকানা। মেয়াদ ফুরোনোর আগেই আবার দলবদল। প্রত্যাবর্তন কংগ্রেসে। এ বার তাঁর নতুন ঠিকানা মালতীপুর। নিজের পুরনো ‘ঘাঁটি’ সুজাপুর নয় কেন? শোনা যাচ্ছে, এ শুধু বিধানসভা নির্বাচন নয়, এ হল দূরাগত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। ২০২৯ সালে দক্ষিণ মালদহ লোকসভা থেকে ‘দিল্লি চলো’ হল তাঁর লক্ষ্য।

অজানা কথা

রাজনীতির বাইরেও মৌসম নাকি ভীষণ হিসেবি। কোথায়-কখন কী বলবেন, সংসারে কোথায় কী খরচ করবেন, সবটাই পরিকল্পিত। নিজের আগামী পদক্ষেপ কাউকে বুঝতে দেন না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ‘ধুরন্ধর’!

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

আমি চে-চে দেখি সারাদিন

শঙ্কর ঘোষ, বয়স: ৫১

লাল রাজনীতির মাটি থেকে উঠে আসা ঝোড়ো নাম। উত্তরবঙ্গের সিপিএমের যুব সংগঠনে একদা দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু সময়ের মোড়ে বদলে গিয়েছে পথ। বদলেছে দর্শনও। ২০২১ সালের ভোটের আগে দলবদল করে বাম থেকে রাম হওয়া সম্ভবত তাঁর জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। বদলের গল্পে আছে নাটকীয় মোচড়। সিপিএমের একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে শ্মশানে দাহকার্যে ব্যস্ত ছিলেন। তখনই ফোন আসে দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার। সেই ফোনই বদলে দিয়েছিল শঙ্করের রাজনৈতিক জীবনদর্শন। বামত্বকে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে উঠিয়ে রামত্বকে কাছে টানেন। মার্ক্সবাদী থেকে হয়ে যান হিন্দুত্ববাদী। পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ‘রাজনৈতিক গুরু’ অশোক ভট্টাচার্যকে হারিয়ে শিলিগুড়ির বিধায়ক হন। এ বার লড়বেন শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের বিরুদ্ধে। বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন সুবক্তা এবং সুতার্কিক শঙ্কর। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘ভরসার মুখ’। বিদায়ী বিধানসভায় তিনি বিজেপি পরিষদীয় দলের মুখ্যসচেতক। দলের অন্যতম কৌশলী সৈনিক। বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দেন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে। 

অজানা কথা

চে গেভারার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাম বাহুতে উল্কি করিয়েছিলেন। রাজনৈতিক দর্শন এবং আদর্শ বদলালেও সেই উল্কি অটুট। ঝান্ডার রং বদলে গিয়েছে। বদলে গিয়েছে প্রতীক। কিন্তু শরীরে খোদাই করা অতীত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

আমি এক যাযাবর

দীপ্সিতা ধর, বয়স: ৩২

এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় নেত্রী থাকাকালীন মাঝেমধ্যেই অসম যেতেন। তিনি কি জানতেন সেই অসমেরই ভূমিপুত্র ভূপেন হাজারিকার গান পশ্চিমবঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে? ২০২১ সালের বিধানসভায় তিনি বালি কেন্দ্রে সিপিএম-এর প্রার্থী। ২০২৪ সালের লোকসভায় তিনি শ্রীরামপুরে সিপিএমের প্রার্থী। ২০২৬ সালের বিধানসভায় আবার তিনি উত্তর দমদমে সিপিএমের প্রার্থী। জন্ম ৯ অগস্ট ‘নাগাসাকি দিবসে’। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে এখনও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলেন না। ঠাকুর্দা পদ্মনিধি ধর ডোমজুড়ের প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক। পদ্মনিধির নাতনি হলেও ঘোর বিরোধী পদ্মশিবিরের। সিপিএমে গুঞ্জন, তাঁকে প্রথমে ভবানীপুরে দাঁড়াতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ‘দিদি’র বিরুদ্ধে লড়তে রাজি হননি। যদিও এই খবরে কোনও আনুষ্ঠানিক সিলমোহর নেই। তবে উত্তর দমদমের প্রচারে তিনি ‘ডিডি’। নাম-পদবির আদ্যক্ষর জুড়ে প্রচার কর্মসূচির নাম দিয়েছেন ‘ডিডি-কে বলো’। সিপিএম-এর কেউ কেউ সমাজমাধ্যমে ‘ডিডি’র ছবি দিয়ে লিখছেন, ‘চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।’ সম্ভবত এটি কোন পণ্যের বিজ্ঞাপনী ‘ক্যাচলাইন’ তা না জেনেই! এমনিতে তিনি বিড়ালবিলাসিনী। তবে বাড়ির দু’টি বিড়ালকেই অকালে হারিয়েছেন।

অজানা কথা

ছবিতে হাতের ভ্যানিটি ব্যাগে মহার্ঘ ফরাসি ব্র্যান্ড ‘লুই ভিঁতো’র লোগো। সর্বহারার দলের নেত্রী হয়ে ‘লুই ভিঁতো’? বিতর্কের ঝড় বহিল ফেসবুকে। শেষে জানা গেল, ব্যাগের সাকিন নয়াদিল্লির সরোজিনী মার্কেট। দর কুল্যে সাড়ে ৪০০ টাকা। অনেকে রসিকতা করে বললেন, ‘গরিবের মহুয়া মৈত্র’। একটি বিশেষ ভারতীয় ব্র্যান্ডের ব্যাগের শখ অবশ্য রয়েছে তাঁর। যে ব্র্যান্ডের সঙ্গে জুড়ে আছে দলিত শিল্পীদের শ্রম। তবে এখনও কেনা হয়ে ওঠেনি।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

পলির কথা শুনে...

মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, বয়স: ৪২

ব্যবধান পাঁচ বছরের। এক খালের ধার থেকে তিনি এসেছেন অন্য খালের ধারে। ২০২১ সালে লড়েছিলেন তালপাটি খালের ধারের নন্দীগ্রামে। পাঁচ বছর পরে ২০২৬ সালে তিনি লড়ছেন বালিখাল এবং বাগখালের মধ্যবর্তী ভূখণ্ড উত্তরপাড়ায়। আক্ষরিক অর্থেই সিপিএম এখন ‘সর্বহারা’। এই ভোট তাদের কাছে খাতা খোলার লড়াই। সেই লড়াইয়ের অন্যতম ‘মুখ’ মিনাক্ষী। গত এপ্রিলে ‘মিনাক্ষী মন্দিরের শহর’ বলে পরিচিত তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ে অনুষ্ঠিত সিপিএমের পার্টি কংগ্রেস থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছেন। ছিলেন যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক। অনেকে বলেন, এই সংগঠনে এর আগে বাম মহলে জনপ্রিয়তার তরঙ্গ তুলেছিলেন ‘মামু’। অর্থাৎ, প্রাক্তন মন্ত্রী অধুনাপ্রয়াত মানব মুখোপাধ্যায়। তার পরেই ‘মিমু’। মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। উত্তরপাড়ায় প্রচারে বেরিয়ে নানাবিধ কর্মকাণ্ড করছেন। কোন্নগরে এক সক্রিয় তৃণমূল কর্মীর শাড়ির দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছে মিনাক্ষীর মিছিল। দলীয় কর্মীরা পইপই করে বারণ করছেন, ওই দোকানে যেতে হবে না। মিনাক্ষী শোনেননি। ঢুকে পড়েছেন। হাত মিলিয়েছেন। একটি শাড়ি উপহারও পেয়েছেন। মিনাক্ষীর ডাকনাম ‘পলি’। তাঁর যে কোনও ছবিকে কি ‘পলিগ্রাফ’ বলা যেতে পারে? অলির কথা শুনে বকুল হেসেছিল। পলির কথা শুনে বালিখাল-বাগখালের মাঝের দু’কূল হাসবে? 

অজানা কথা

আগে কলেজে অস্থায়ী ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন। এখন পার্টি করেন। তিনি ‘বর্ধমান লাইন’। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট সেই লাইনেই তাঁর থাকার বন্দোবস্ত করেছে। সিপিএম রাজ্য দফতরে একদা যে ঘরে থাকতেন বিনয় কোঙার, সেটিই আপাতত তাঁর আস্তানা। ভোটের উত্তরপাড়ায় থাকার জায়গা হয়েছে প্রাক্তন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী প্রয়াত সুদর্শন রায়চৌধুরীর বাড়ি। ঠিকানা: কোন্নগর সাধুর গলি।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

তিস্ সাল বাদ!

অধীর রঞ্জন চৌধুরী, বয়স: ৭০

তিরিশ বছর আগে তিনি প্রথম বার বিধায়ক হয়েছিলেন। তিন দশক পরে আবার বিধানসভার লড়াইয়ে মুর্শিদাবাদের ‘রবিনহুড’। ১৯৯৬ সালে লড়েছিলেন নবগ্রাম থেকে। এ বার ঘরের মাঠ বহরমপুরে। তিন দশক আগে যখন ভোটে লড়েছিলেন, তখন তিনি মুর্শিদাবাদ-ছাড়া। সিপিএম জমানার পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তাঁকে নিরাপদ আস্তানায় রেখে দিয়েছিলেন ‘ছোড়দা’ সোমেন মিত্র। অধীরের বক্তৃতার রেকর্ডিং নবগ্রামের গাঁয়ে গাঁয়ে পরশ দিয়েছিল। জিতেছিলেন। কিন্তু তার পর থেকে আর বিধানসভায় লড়েননি। ১৯৯৯ সালে প্রথম বার বহরমপুর থেকে সাংসদ আরএসএপি-র প্রমথেশ মুখোপাধ্যায়কে হারিয়ে। তার পর থেকে বহরমপুর আর অধীর সমার্থক। কিন্তু গত লোকসভায় হেরে যান তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে। যদিও অধীর আশা ছাড়েননি। বলেছিলেন, হেরে গেলে রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে বাদাম বেচবেন! হেরেছিলেন। বাদাম বেচতে বেরোননি। রাজনীতিও ছাড়েননি। আবার বিধানসভার লড়াইয়ে। ১৯৯৪ সালের একটি খুনের মামলায় গ্রেফতার হতে হয়েছিল অধীরকে। বহরমপুর জেলে থাকার সময়ে অসুস্থ হয়েছিলেন। তাঁর চিকিৎসা করেছিলেন চিকিৎসক নির্মলচন্দ্র সাহা। যিনি গত লোকসভা ভোটে বহরমপুরে ছিলেন অধীরের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী। 

অজানা কথা

১৯৯৪ সালে এক সিপিএম কর্মী খুনের ঘটনায় অধীরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। সেই পর্বে আত্মগোপন করতে তারাপীঠ শ্মশানে কাটিয়েছিলেন বেশ কিছুদিন। মাছ পুড়িয়ে খেতেন। দেড় দশকের বেশি ধূমপান ছেড়েছেন। তার পরে চুইংগাম খেতেন। ইদানীং তা-ও বন্ধ।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

অধিকারী বুঝে নেওয়া প্রখর দাবিতে

শুভেন্দু অধিকারী, বয়স: ৫৫

রাজ্যের রাজনীতিতে গত পাঁচ বছরে কট্টর হিন্দুত্বের ‘মুখ’। একদা ঘাসফুল শিবিরের ভরসা, এখন পদ্ম শিবিরের প্রধান অস্ত্র। যদিও ঘনিষ্ঠদের কাছে দাবি করেন, এই ঝোঁক নাকি ইদানীংকার নয়, ছোটবেলার সংস্কারেই বোনা ছিল এর বীজ। রাজনীতির ময়দানে যতই তর্ক-বিতর্ক থাকুক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ এখনও অটুট। বিশেষত, পূর্ব মেদিনীপুর জুড়ে। অনায়াসে শ্রীখোল গলায় ঝুলিয়ে হরিনাম সংকীর্তনে যোগ দেন। মাথার উপর দু’হাত তুলে শ্রীচৈতন্যের মতো নাচতেও দেখা যায় মাঝেমধ্যে। একদা তৃণমূলের সরকারে একাধিক দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। সে সব ছেড়েছুড়ে রামচন্দ্রের পদপ্রান্তে গিয়ে বসেছেন। ২০২১ সাল থেকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। রাজনৈতিক আদর্শ মানেন সতীশ সামন্ত, সুশীল ধাড়াকে। একদা ‘রাজনৈতিক গুরু’ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৯ সাল থেকে অমিত শাহ। বলেন, আর ‘গুরু’ বদলাবেন না। নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও মমতার টক্কর নিতে নেমেছেন। শুভেন্দু মানেই চরৈবেতি। ৪০০-৫০০ কিলোমিটার রাস্তা উজিয়ে গন্তব্যে পৌঁছনো তাঁর কাছে নিত্যদিনের ব্যাপার। সঙ্গী বিশ্বস্ত কালো এসইউভি। অন্যান্য রাজনীতিকদের মতো চালকের পাশের আসনে বসেন না। বসেন মাঝখানে। জনসভা, মিছিল থেকে শুরু করে মন্দির দর্শন সবই এক সূচিতে বাঁধা। দেখে গোলগাল মনে হলেও ডায়েটে শৃঙ্খলা আছে। ব্রাউন রাইস, পানিফলের আটার রুটি আর রাতে নিয়ম করে আধ ঘণ্টা হাঁটা। শুনে ‘ফিটনেস গুরু’ মনে হয় বৈকি! কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। দিনের বেশিরভাগ সময়ই কেটে যায় বাতানকূল গাড়ির অভ্যন্তরে আরামে। ঘনিষ্ঠরা ঠাট্টা করে বলেন, “হাঁটা যত, বসা তার চেয়ে বেশি!” রাজনীতির কড়া ভাষণের আড়ালে নিরন্তর মজার লড়াই চলে— ওজন বনাম সময়সূচি। বিশ্ব যোগ দিবসে সূর্যপ্রণাম করতে গিয়ে ঘেঁটে গিয়েছিলেন। তবে শবাসনে দারুণ পারফর্ম করেছিলেন। ভোটের ময়দান জিততে অভ্যস্ত। এখন দেখার শরীরচর্চার লড়াইয়ে জেতেন নাকি রণে ভঙ্গ দেন। 

অজানা কথা

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় শেষ বার হল-এ গিয়ে সিনেমা দেখেছিলেন। তবে বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পরে গত পাঁচ বছরে তিনটি সিনেমা দেখেছেন। তা-ও দলের নির্দেশে। বলেন, রাজনীতি করলে সিনেমা দেখার সময় পাওয়া যায় না!

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন

লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই!

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বয়স: ৭১

প্রতিপক্ষ চাই! যে করেই হোক। কারণ, তিনি লড়াই চান। এই বিধানসভা ভোটে যেমন তাঁর প্রতিপক্ষ নির্বাচন কমিশন। লড়াই ছাড়া ‘দিদি’ থাকতে পারেন না। এ বার কি তাঁর লড়াই ‘কঠিন’? গত বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে আচমকা ঘোষণা করেছিলেন, সেখান থেকেই লড়বেন। বলেছিলেন, ভবানীপুর তাঁর ‘বড় বোন’। নন্দীগ্রাম ‘মেজো বোন’। ভোটের ফলাফল অনুকূলে আসেনি। শান্তিকুঞ্জের মেজোপুত্রের কাছে পরাজিত হয়ে ফিরেছিলেন ‘বড় বোন’ ভবানীপুরে। এ বারেও ভবানীপুর থেকেই তিনি প্রার্থী। আসলে তিনি অঘোষিত প্রার্থী বাকি ২৯৩টি আসনেও। গত বিধানসভা নির্বাচনে স্লোগান দিয়েছিলেন ‘খেলা হবে।’ নন্দীগ্রামের প্রচারের সময়ে পায়ে আঘাত পান। ফ্লেক্সে তাঁর প্লাস্টার-করা পায়ের ছবি দিয়ে তৃণমূল লিখেছিল, ‘ভাঙা পায়ে খেলা হবে।’ রাজ্য জুড়ে সেই ‘খেলা’ হলেও নন্দীগ্রামের ‘ডার্বি’ জিতেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এ বার মনস্থির করে শুধু বড় বোনের কাছেই রয়েছেন দিদি। হলদি নদীর তীর থেকে আদিগঙ্গার তীরে। লড়াই সেই শুভেন্দুর সঙ্গেই। এ বার মমতার স্লোগান ‘ফাটাফাটি খেলা হবে।’ এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন ভবানীপুরের বিএলএ-দের সঙ্গে অন্তত বার পাঁচেক বৈঠক করেছেন। তিনি কি কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন? ঘনিষ্ঠেরা বলছেন, আদৌ কোনও উদ্বেগ নেই। গুরুত্ব আছে। যে কোনও লড়াইয়ের মতোই তিনি এই লড়াইয়েও সিরিয়াস। কর্মিসভায় মমতার জয়ের ব্যবধান বেঁধে দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়— ৬০ হাজার। পাশাপাশিই অদৃশ্য সিসিটিভি বসিয়েছেন কর্মীদের উপর।  

অজানা কথা

ভাইপো-ভাইঝিদের নাম রেখেছিলেন ইংরাজি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘এ’ দিয়ে। অভিষেক, আকাশ, আবেশ, অগ্নিশা ইত্যাদি। পরের প্রজন্মের নামকরণও ‘এ’ দিয়েই। অভিষেকের পুত্র-কন্যার নাম আজানিয়া-আয়াংশ। ভাই কার্তিকের পুত্র আবেশের কন্যাসন্তানের নাম ‘পিসিঠাকুমা’ রেখেছেন আদিরা। ব্যাঘ্রশাবকেরও নামকরণ করেছেন। তবে তাতে বর্ণমালা গুরুত্ব পায়নি।

রেখাচিত্র: শৌভিক দেবনাথ
সবিস্তার পড়ুন