
লাল রাজনীতির মাটি থেকে উঠে আসা ঝোড়ো নাম। উত্তরবঙ্গের সিপিএমের যুব সংগঠনে একদা দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু সময়ের মোড়ে বদলে গিয়েছে পথ। বদলেছে দর্শনও। ২০২১ সালের ভোটের আগে দলবদল করে বাম থেকে রাম হওয়া সম্ভবত তাঁর জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। বদলের গল্পে আছে নাটকীয় মোচড়। সিপিএমের একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে শ্মশানে দাহকার্যে ব্যস্ত ছিলেন। তখনই ফোন আসে দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার। সেই ফোনই বদলে দিয়েছিল শঙ্করের রাজনৈতিক জীবনদর্শন। বামত্বকে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে উঠিয়ে রামত্বকে কাছে টানেন। মার্ক্সবাদী থেকে হয়ে যান হিন্দুত্ববাদী। পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ‘রাজনৈতিক গুরু’ অশোক ভট্টাচার্যকে হারিয়ে শিলিগুড়ির বিধায়ক হন। এ বার লড়বেন শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের বিরুদ্ধে। বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন সুবক্তা এবং সুতার্কিক শঙ্কর। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘ভরসার মুখ’। বিদায়ী বিধানসভায় তিনি বিজেপি পরিষদীয় দলের মুখ্যসচেতক। দলের অন্যতম কৌশলী সৈনিক। বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দেন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে।
চে গেভারার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাম বাহুতে উল্কি করিয়েছিলেন। রাজনৈতিক দর্শন এবং আদর্শ বদলালেও সেই উল্কি অটুট। ঝান্ডার রং বদলে গিয়েছে। বদলে গিয়েছে প্রতীক। কিন্তু শরীরে খোদাই করা অতীত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।

বাসন্তী রং তাঁর বিশেষ প্রিয়। প্রায় সময়েই বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবিতে শোভিত থাকেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে দ্রুততম দৌড়ের রেকর্ডও তাঁরই দখলে। কংগ্রেসে থাকার সময় বর্ধমানের মঙ্গলকোটে সিপিএম হার্মাদদের তাড়া খেয়ে ধুতি হাঁটুর উপর তুলে ধানক্ষেত পেরিয়ে যে দৌড় দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গবাসী চিরকাল মনে রাখবেন। পেশায় চিকিৎসক। নামডাকও ছিল। কিন্তু রাজনীতির নিশির ডাক যে শুনেছে, তাকে কি আর স্টেথোস্কোপ আটকে রাখতে পারে! সেই কবে থেকে তিনি সবংয়ের বিধায়ক! প্রথমে কংগ্রেসের। পরে তৃণমূলের। একদা বলতেন, তাঁর মরদেহে কংগ্রেসের তেরঙা পতাকা থাকবে। খুব ভুল বলতেন না। রং সেই তিনটিই আছে এখনও। শুধু ভিতরে ‘হাত’ বদলে ‘জোড়াফুল’ হয়েছে। তাতে কী? রং এবং সবং— দুই’ই ধরে রেখেছেন। গ্রহের ফেরে যখন একবার রাজ্যসভায় যেতে হয়েছিল, তখনও সবংকে বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন সহধর্মিনী গীতার আঁচলে। মানসের আত্মজ কৌশিকও পেশায় চিকিৎসক। বিদেশে থাকেন। পড়াশোনার প্রতি এখনও অনুরাগ আছে। বয়সে ছোট কারও কাছেও শিক্ষা নিতে আপত্তি নেই। পুত্রের কাছ থেকে ভার্চুয়াল ক্লাসে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে সড়গড় হয়ে নেন মাঝেমধ্যেই। তবে মানসের আরও দুই কন্যা আছে। কেলেঘাই এবং কপালেশ্বরী সেই দুই ‘মানসকন্যা’। যারা তাঁকে বছরের পর বছর ভোটে জেতায়। দুই নদীর জলে বন্যার সুরাহা করবেন বলে প্রতিবার ভোট প্রার্থনা করেন তিনি।
পাঁচ কন্যার পর জন্ম পুত্রসন্তানের। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন ‘ডিম্বেশ্বর’। যার অর্থ ‘করুণার প্রভু’ অথবা ‘শিব’। তবে ইস্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে সেই নাম বদলে গেল। কঠিন এবং দুরূহ উচ্চারণের ‘ডিম্বেশ্বর’ নয়। সহজ এবং সরল ‘মানস’।

মৌসম নামের মতো বদলই তাঁর পরিচয়। কখনও কংগ্রেস, কখনও তৃণমূল, আবার ফের কংগ্রেস। গত কয়েক বছরে বাংলার রাজনীতিতে এমন ‘মৌসুমি হাওয়া’ কমই দেখা গিয়েছে! তিনিই ভারতের সেই বিরল রাজনীতিকদের একজন, যিনি তিনটি আইনসভার ই সদস্য হয়েছেন। বিধানসভা, লোকসভা এবং রাজ্যসভা। রাজনীতির রক্ত তাঁর জন্মগত। মালদহের বরকত গনি খান চৌধুরীর উত্তরাধিকার এখনও তাঁদের পরিবারকে প্রাসঙ্গিক রেখেছে। সেই সূত্রেই মায়ের মৃত্যুর পর মাত্র ২৯ বছর বয়সে সুজাপুর বিধানসভায় পা রাখেন। তারপর আর থামেননি। বিধায়কত্ব শেষ হওয়ার আগেই লোকসভায় ঝাঁপ। কংগ্রেসের টিকিটে মালদহ উত্তর থেকে সাংসদ। অল্পদিনেই ‘হাইকম্যান্ড’-এর নজরে পড়ে যাওয়া। তারপরেই হঠাৎ মোড়। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে তৃণমূলে যোগ। ভোটে হারলেও ভাগ্য সহায়। ২০২০ সালে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ। কিন্তু সেখানেও স্থায়ী হল না ঠিকানা। মেয়াদ ফুরোনোর আগেই আবার দলবদল। প্রত্যাবর্তন কংগ্রেসে। এ বার তাঁর নতুন ঠিকানা মালতীপুর। নিজের পুরনো ‘ঘাঁটি’ সুজাপুর নয় কেন? শোনা যাচ্ছে, এ শুধু বিধানসভা নির্বাচন নয়, এ হল দূরাগত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। ২০২৯ সালে দক্ষিণ মালদহ লোকসভা থেকে ‘দিল্লি চলো’ হল তাঁর লক্ষ্য।
রাজনীতির বাইরেও মৌসম নাকি ভীষণ হিসেবি। কোথায়-কখন কী বলবেন, সংসারে কোথায় কী খরচ করবেন, সবটাই পরিকল্পিত। নিজের আগামী পদক্ষেপ কাউকে বুঝতে দেন না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ‘ধুরন্ধর’!

এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় নেত্রী থাকাকালীন মাঝেমধ্যেই অসম যেতেন। তিনি কি জানতেন সেই অসমেরই ভূমিপুত্র ভূপেন হাজারিকার গান পশ্চিমবঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে? ২০২১ সালের বিধানসভায় তিনি বালি কেন্দ্রে সিপিএম-এর প্রার্থী। ২০২৪ সালের লোকসভায় তিনি শ্রীরামপুরে সিপিএমের প্রার্থী। ২০২৬ সালের বিধানসভায় আবার তিনি উত্তর দমদমে সিপিএমের প্রার্থী। জন্ম ৯ অগস্ট ‘নাগাসাকি দিবসে’। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে এখনও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলেন না। ঠাকুর্দা পদ্মনিধি ধর ডোমজুড়ের প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক। পদ্মনিধির নাতনি হলেও ঘোর বিরোধী পদ্মশিবিরের। সিপিএমে গুঞ্জন, তাঁকে প্রথমে ভবানীপুরে দাঁড়াতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ‘দিদি’র বিরুদ্ধে লড়তে রাজি হননি। যদিও এই খবরে কোনও আনুষ্ঠানিক সিলমোহর নেই। তবে উত্তর দমদমের প্রচারে তিনি ‘ডিডি’। নাম-পদবির আদ্যক্ষর জুড়ে প্রচার কর্মসূচির নাম দিয়েছেন ‘ডিডি-কে বলো’। সিপিএম-এর কেউ কেউ সমাজমাধ্যমে ‘ডিডি’র ছবি দিয়ে লিখছেন, ‘চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।’ সম্ভবত এটি কোন পণ্যের বিজ্ঞাপনী ‘ক্যাচলাইন’ তা না জেনেই! এমনিতে তিনি বিড়ালবিলাসিনী। তবে বাড়ির দু’টি বিড়ালকেই অকালে হারিয়েছেন।
ছবিতে হাতের ভ্যানিটি ব্যাগে মহার্ঘ ফরাসি ব্র্যান্ড ‘লুই ভিঁতো’র লোগো। সর্বহারার দলের নেত্রী হয়ে ‘লুই ভিঁতো’? বিতর্কের ঝড় বহিল ফেসবুকে। শেষে জানা গেল, ব্যাগের সাকিন নয়াদিল্লির সরোজিনী মার্কেট। দর কুল্যে সাড়ে ৪০০ টাকা। অনেকে রসিকতা করে বললেন, ‘গরিবের মহুয়া মৈত্র’। একটি বিশেষ ভারতীয় ব্র্যান্ডের ব্যাগের শখ অবশ্য রয়েছে তাঁর। যে ব্র্যান্ডের সঙ্গে জুড়ে আছে দলিত শিল্পীদের শ্রম। তবে এখনও কেনা হয়ে ওঠেনি।

ব্যবধান পাঁচ বছরের। এক খালের ধার থেকে তিনি এসেছেন অন্য খালের ধারে। ২০২১ সালে লড়েছিলেন তালপাটি খালের ধারের নন্দীগ্রামে। পাঁচ বছর পরে ২০২৬ সালে তিনি লড়ছেন বালিখাল এবং বাগখালের মধ্যবর্তী ভূখণ্ড উত্তরপাড়ায়। আক্ষরিক অর্থেই সিপিএম এখন ‘সর্বহারা’। এই ভোট তাদের কাছে খাতা খোলার লড়াই। সেই লড়াইয়ের অন্যতম ‘মুখ’ মিনাক্ষী। গত এপ্রিলে ‘মিনাক্ষী মন্দিরের শহর’ বলে পরিচিত তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ে অনুষ্ঠিত সিপিএমের পার্টি কংগ্রেস থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছেন। ছিলেন যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক। অনেকে বলেন, এই সংগঠনে এর আগে বাম মহলে জনপ্রিয়তার তরঙ্গ তুলেছিলেন ‘মামু’। অর্থাৎ, প্রাক্তন মন্ত্রী অধুনাপ্রয়াত মানব মুখোপাধ্যায়। তার পরেই ‘মিমু’। মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। উত্তরপাড়ায় প্রচারে বেরিয়ে নানাবিধ কর্মকাণ্ড করছেন। কোন্নগরে এক সক্রিয় তৃণমূল কর্মীর শাড়ির দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছে মিনাক্ষীর মিছিল। দলীয় কর্মীরা পইপই করে বারণ করছেন, ওই দোকানে যেতে হবে না। মিনাক্ষী শোনেননি। ঢুকে পড়েছেন। হাত মিলিয়েছেন। একটি শাড়ি উপহারও পেয়েছেন। মিনাক্ষীর ডাকনাম ‘পলি’। তাঁর যে কোনও ছবিকে কি ‘পলিগ্রাফ’ বলা যেতে পারে? অলির কথা শুনে বকুল হেসেছিল। পলির কথা শুনে বালিখাল-বাগখালের মাঝের দু’কূল হাসবে?
আগে কলেজে অস্থায়ী ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন। এখন পার্টি করেন। তিনি ‘বর্ধমান লাইন’। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট সেই লাইনেই তাঁর থাকার বন্দোবস্ত করেছে। সিপিএম রাজ্য দফতরে একদা যে ঘরে থাকতেন বিনয় কোঙার, সেটিই আপাতত তাঁর আস্তানা। ভোটের উত্তরপাড়ায় থাকার জায়গা হয়েছে প্রাক্তন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী প্রয়াত সুদর্শন রায়চৌধুরীর বাড়ি। ঠিকানা: কোন্নগর সাধুর গলি।

তিরিশ বছর আগে তিনি প্রথম বার বিধায়ক হয়েছিলেন। তিন দশক পরে আবার বিধানসভার লড়াইয়ে মুর্শিদাবাদের ‘রবিনহুড’। ১৯৯৬ সালে লড়েছিলেন নবগ্রাম থেকে। এ বার ঘরের মাঠ বহরমপুরে। তিন দশক আগে যখন ভোটে লড়েছিলেন, তখন তিনি মুর্শিদাবাদ-ছাড়া। সিপিএম জমানার পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তাঁকে নিরাপদ আস্তানায় রেখে দিয়েছিলেন ‘ছোড়দা’ সোমেন মিত্র। অধীরের বক্তৃতার রেকর্ডিং নবগ্রামের গাঁয়ে গাঁয়ে পরশ দিয়েছিল। জিতেছিলেন। কিন্তু তার পর থেকে আর বিধানসভায় লড়েননি। ১৯৯৯ সালে প্রথম বার বহরমপুর থেকে সাংসদ আরএসএপি-র প্রমথেশ মুখোপাধ্যায়কে হারিয়ে। তার পর থেকে বহরমপুর আর অধীর সমার্থক। কিন্তু গত লোকসভায় হেরে যান তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে। যদিও অধীর আশা ছাড়েননি। বলেছিলেন, হেরে গেলে রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে বাদাম বেচবেন! হেরেছিলেন। বাদাম বেচতে বেরোননি। রাজনীতিও ছাড়েননি। আবার বিধানসভার লড়াইয়ে। ১৯৯৪ সালের একটি খুনের মামলায় গ্রেফতার হতে হয়েছিল অধীরকে। বহরমপুর জেলে থাকার সময়ে অসুস্থ হয়েছিলেন। তাঁর চিকিৎসা করেছিলেন চিকিৎসক নির্মলচন্দ্র সাহা। যিনি গত লোকসভা ভোটে বহরমপুরে ছিলেন অধীরের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী।
১৯৯৪ সালে এক সিপিএম কর্মী খুনের ঘটনায় অধীরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। সেই পর্বে আত্মগোপন করতে তারাপীঠ শ্মশানে কাটিয়েছিলেন বেশ কিছুদিন। মাছ পুড়িয়ে খেতেন। দেড় দশকের বেশি ধূমপান ছেড়েছেন। তার পরে চুইংগাম খেতেন। ইদানীং তা-ও বন্ধ।

রাজ্যের রাজনীতিতে গত পাঁচ বছরে কট্টর হিন্দুত্বের ‘মুখ’। একদা ঘাসফুল শিবিরের ভরসা, এখন পদ্ম শিবিরের প্রধান অস্ত্র। যদিও ঘনিষ্ঠদের কাছে দাবি করেন, এই ঝোঁক নাকি ইদানীংকার নয়, ছোটবেলার সংস্কারেই বোনা ছিল এর বীজ। রাজনীতির ময়দানে যতই তর্ক-বিতর্ক থাকুক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ এখনও অটুট। বিশেষত, পূর্ব মেদিনীপুর জুড়ে। অনায়াসে শ্রীখোল গলায় ঝুলিয়ে হরিনাম সংকীর্তনে যোগ দেন। মাথার উপর দু’হাত তুলে শ্রীচৈতন্যের মতো নাচতেও দেখা যায় মাঝেমধ্যে। একদা তৃণমূলের সরকারে একাধিক দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। সে সব ছেড়েছুড়ে রামচন্দ্রের পদপ্রান্তে গিয়ে বসেছেন। ২০২১ সাল থেকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। রাজনৈতিক আদর্শ মানেন সতীশ সামন্ত, সুশীল ধাড়াকে। একদা ‘রাজনৈতিক গুরু’ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৯ সাল থেকে অমিত শাহ। বলেন, আর ‘গুরু’ বদলাবেন না। নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও মমতার টক্কর নিতে নেমেছেন। শুভেন্দু মানেই চরৈবেতি। ৪০০-৫০০ কিলোমিটার রাস্তা উজিয়ে গন্তব্যে পৌঁছনো তাঁর কাছে নিত্যদিনের ব্যাপার। সঙ্গী বিশ্বস্ত কালো এসইউভি। অন্যান্য রাজনীতিকদের মতো চালকের পাশের আসনে বসেন না। বসেন মাঝখানে। জনসভা, মিছিল থেকে শুরু করে মন্দির দর্শন সবই এক সূচিতে বাঁধা। দেখে গোলগাল মনে হলেও ডায়েটে শৃঙ্খলা আছে। ব্রাউন রাইস, পানিফলের আটার রুটি আর রাতে নিয়ম করে আধ ঘণ্টা হাঁটা। শুনে ‘ফিটনেস গুরু’ মনে হয় বৈকি! কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। দিনের বেশিরভাগ সময়ই কেটে যায় বাতানকূল গাড়ির অভ্যন্তরে আরামে। ঘনিষ্ঠরা ঠাট্টা করে বলেন, “হাঁটা যত, বসা তার চেয়ে বেশি!” রাজনীতির কড়া ভাষণের আড়ালে নিরন্তর মজার লড়াই চলে— ওজন বনাম সময়সূচি। বিশ্ব যোগ দিবসে সূর্যপ্রণাম করতে গিয়ে ঘেঁটে গিয়েছিলেন। তবে শবাসনে দারুণ পারফর্ম করেছিলেন। ভোটের ময়দান জিততে অভ্যস্ত। এখন দেখার শরীরচর্চার লড়াইয়ে জেতেন নাকি রণে ভঙ্গ দেন।
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় শেষ বার হল-এ গিয়ে সিনেমা দেখেছিলেন। তবে বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পরে গত পাঁচ বছরে তিনটি সিনেমা দেখেছেন। তা-ও দলের নির্দেশে। বলেন, রাজনীতি করলে সিনেমা দেখার সময় পাওয়া যায় না!

প্রতিপক্ষ চাই! যে করেই হোক। কারণ, তিনি লড়াই চান। এই বিধানসভা ভোটে যেমন তাঁর প্রতিপক্ষ নির্বাচন কমিশন। লড়াই ছাড়া ‘দিদি’ থাকতে পারেন না। এ বার কি তাঁর লড়াই ‘কঠিন’? গত বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে আচমকা ঘোষণা করেছিলেন, সেখান থেকেই লড়বেন। বলেছিলেন, ভবানীপুর তাঁর ‘বড় বোন’। নন্দীগ্রাম ‘মেজো বোন’। ভোটের ফলাফল অনুকূলে আসেনি। শান্তিকুঞ্জের মেজোপুত্রের কাছে পরাজিত হয়ে ফিরেছিলেন ‘বড় বোন’ ভবানীপুরে। এ বারেও ভবানীপুর থেকেই তিনি প্রার্থী। আসলে তিনি অঘোষিত প্রার্থী বাকি ২৯৩টি আসনেও। গত বিধানসভা নির্বাচনে স্লোগান দিয়েছিলেন ‘খেলা হবে।’ নন্দীগ্রামের প্রচারের সময়ে পায়ে আঘাত পান। ফ্লেক্সে তাঁর প্লাস্টার-করা পায়ের ছবি দিয়ে তৃণমূল লিখেছিল, ‘ভাঙা পায়ে খেলা হবে।’ রাজ্য জুড়ে সেই ‘খেলা’ হলেও নন্দীগ্রামের ‘ডার্বি’ জিতেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এ বার মনস্থির করে শুধু বড় বোনের কাছেই রয়েছেন দিদি। হলদি নদীর তীর থেকে আদিগঙ্গার তীরে। লড়াই সেই শুভেন্দুর সঙ্গেই। এ বার মমতার স্লোগান ‘ফাটাফাটি খেলা হবে।’ এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন ভবানীপুরের বিএলএ-দের সঙ্গে অন্তত বার পাঁচেক বৈঠক করেছেন। তিনি কি কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন? ঘনিষ্ঠেরা বলছেন, আদৌ কোনও উদ্বেগ নেই। গুরুত্ব আছে। যে কোনও লড়াইয়ের মতোই তিনি এই লড়াইয়েও সিরিয়াস। কর্মিসভায় মমতার জয়ের ব্যবধান বেঁধে দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়— ৬০ হাজার। পাশাপাশিই অদৃশ্য সিসিটিভি বসিয়েছেন কর্মীদের উপর।
ভাইপো-ভাইঝিদের নাম রেখেছিলেন ইংরাজি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘এ’ দিয়ে। অভিষেক, আকাশ, আবেশ, অগ্নিশা ইত্যাদি। পরের প্রজন্মের নামকরণও ‘এ’ দিয়েই। অভিষেকের পুত্র-কন্যার নাম আজানিয়া-আয়াংশ। ভাই কার্তিকের পুত্র আবেশের কন্যাসন্তানের নাম ‘পিসিঠাকুমা’ রেখেছেন আদিরা। ব্যাঘ্রশাবকেরও নামকরণ করেছেন। তবে তাতে বর্ণমালা গুরুত্ব পায়নি।