কয়েক বছর আগে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে সাহিত্য উৎসবের অভিজ্ঞতাটা এখনও খচখচ করে তিলোত্তমা মজুমদারের কাছে।

ঠা ঠা রোদে খোলা মঞ্চে বাংলা ভাষার আরও দু’জন অগ্রজ লেখকের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন তিনি। ভিতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহে ভিন্ ভাষার ক’জন নামজাদারও তখন আসর বসেছে। তিলোত্তমার কথায়, ‘‘আমার ভাল লাগেনি পুরো ব্যবস্থাপনাটা। মাইক হাঁকিয়ে ওই দিকের আসরে লোক ডাকা হচ্ছিল। এই দিকটা কেমন অবহেলিত। একটা বৈষম্যের কাঁটা খচখচ করছিল।’’

এই একটি দুপুরকেই সাহিত্য উৎসবের বিষয়ে তাঁর মাপকাঠি বলে ধরতে চান না তিলোত্তমা। কিন্তু বাঙালির নিজভূমে আন্তর্জাতিকতার গন্ধ মাখা বিপুল পৃষ্ঠপোষকতাধন্য সাহিত্য উৎসবগুলির চরিত্র এর মধ্যে কিছুটা উঠে আসছে! গত কয়েক বছরে প্রচারের বহরে কলকাতায় তিনটি সাহিত্য উৎসব এখন চোখ টানছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওয়েবসাইটে তাদের কয়েক বছরের নির্ঘণ্ট ঘাঁটলে বাংলায় লেখালেখি করেন এমন সাহিত্যিকদের খুঁজে পেতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখ রাখতে হবে।

বিষয়টা অস্বীকার করছেন না কলকাতাবাসী ইংরেজি ভাষার সাহিত্যিক অমিত চৌধুরীও। বেশ কয়েক দশক আগে বুদ্ধদেব বসুর লেখা বাঙালির ভোজ-বিলাস সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধের স্মৃতি উঠে এল অমিতের সঙ্গে আলাপচারিতায়। বুদ্ধদেব তখন অতিথিপরায়ণ বাঙালি গৃহলক্ষ্মীর আপ্যায়নের ঢং নিয়ে আফশোস করেছিলেন। অতিথির যত্নের ত্রুটি না-রাখলেও তাঁর রসনাতৃপ্তির জন্য আপ্যায়নকারিণী যেন নিজ হেঁসেলের উৎকর্ষ এড়িয়ে চলেন। সাহেবি ফিশ ফ্রাই, মাটন রোস্ট বা পার্ক স্ট্রিটের টুটিফ্রুটির উপরেই বরং নির্ভরশীল তিনি। এ যুগে বাঙালি খাবার নিয়ে বাইরের লোক কিছুটা ওয়াকিবহাল। কিন্তু অনেকেরই মনে হয়, নিজের ভাষার সাহিত্য ভাঁড়ার নিয়ে এক ধরনের হীনম্মন্যতাবোধ কিংবা তাচ্ছিল্য লেগে আছে সাহিত্য উৎসবগুলির গায়ে। অমিত বলছেন, ‘‘বেশির ভাগ সাহিত্য উৎসব নিয়েই আমার সমস্যা আছে। বাংলা বা অন্যত্র স্থানীয় ভাষার লেখকেরা তো তাঁদের জাতির বহু দিনের উৎকর্ষ ঘরানার উত্তরাধিকারী। উৎসবগুলোয় তাঁদের দেখা না মিললে ভাল লাগে না।’’

বাংলার সঙ্গে কেন এই বিচ্ছেদ? কলকাতা লিটারারি মিট-এর অধিকর্তা মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি কথাও বলতে চাননি। তবে এপিজে কলকাতা লিটারারি ফেস্টিভ্যালের সহ অধিকর্তা আঞ্জুম কাটিয়ালের কথায়, ‘‘যোগাযোগের ভাষা হিসেবে ইংরেজির রমরমা থাকলেও বাংলার যশস্বী লেখকদের অভিজ্ঞতাও আমরা মেলে ধরি।’’ যেমন, নবনীতা দেবসেনের ৮০ বছরের উদ্‌যাপন থেকে গল্পকার অনিতা অগ্নিহোত্রীর ‘সৃজনশীল হয়ে ওঠা’ও এ বার সাহিত্য আসরে রাখা হয়েছিল। তা ছাড়া, দুই বাংলার সাহিত্যিকদের নিয়ে ফি-অক্টোবরে বাংলা সাহিত্য উৎসবও তাঁরা করে থাকেন। কয়েক বছর ধরে বইমেলার আকর্ষণ কলকাতা লিটারেচার ফেস্টিভ্যালের অধিকর্তা সুজাতা সেনের ব্যাখ্যা, ‘‘এমনিতে বইমেলাময় বাংলা ভাষার লেখকদের নিয়ে নানা অনুষ্ঠান থাকে। সাহিত্য উৎসবে বিদেশি সাহিত্যিকেরা থাকলেও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন মুখও তাঁদের সঙ্গী।’’ বৃহস্পতিবার এই উৎসবের উদ্বোধন অবশ্য শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের হাতেই হয়েছে।

বাংলার এই ব্রাত্য থাকার কথা শুনে স্মিত হাসছেন শীর্ষেন্দুবাবু। বলছেন, ‘‘আসলে সাহিত্য উৎসবগুলোই তো আর নিছক সাহিত্য উৎসব নয়। সিনেমা-রাজনীতির গুণিজন— সবাইকে ডেকে এক ধরনের বিচিত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খানিক ক্ষণ সময় কাটাতে ভালই লাগে।’’ উৎসব কর্মকর্তারা কেউ কেউ মানছেন, কর্পোরেটদের চাপেও নানা ক্ষেত্রের তারকাদের ডাকতেই হয়। স্রেফ বাংলা কেন, শুধু সাহিত্যিকদের দিয়েই আর চিঁড়ে ভেজে না।