ছবিতে, মেসেজে ২০১৮-কে বরণের পালা তো শুরু হয়েছে সেই সকাল থেকেই! তবু পার্টির ডান্সফ্লোরের আলো-আঁধারিতে ডিজে-র কাউন্টডাউনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্ষবরণের আমেজটাই আলাদা।

রবিবার, রাত বারোটার সেই পরম মুহূর্তে বরাবরের মতো জড়তার আগল খুলে ফেলল কলকাতা। বছরের শেষ রাতটা পার্ক স্ট্রিটের জমায়েতে সামিল হওয়াটা আনকোরা তরুণ তো বটেই, শহরে ধাতস্থ জনতার জন্যও প্রায় দুঃসাহসিক কাজ বলা চলে। বর্ষশেষের ভিড়টা বুঝিয়ে দিয়েছে পার্ক স্ট্রিট এখনও ক্লিশে হয়নি কলকাতা বা মফস্‌সলের কাছে। রেস্তোরাঁর টেবিল পেতে সন্ধ্যা থেকেই মস্ত লাইন। রাসেল স্ট্রিট থেকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের অংশে পাগলাটে ভিড়। উচ্ছ্বাস, ক্লান্তি, মত্ততা— সব কিছু মিশে গিয়েছে তাতে। মধ্যরাতে নানা কিসিমের বাজির সঙ্গে ভেঁপু, সিটি বা গলা ফাটিয়ে নিখাদ চিৎকারই কলকাতার আবহসঙ্গীত হয়ে উঠল। চেনা-অচেনা ভুলে ফুরফুরে মেজাজে জড়ামড়ির দৃশ্যটাও ফিরে-ফিরে এল। মিডল্‌টন রোয়ের দিকটায় ওয়াচটাওয়ার থেকে শঙ্কায় পুলিশের খানিক ভুরু কুঁচকোল। স্খলিত টলমলে নারীপুরুষকে সামলাতে পুরুষ ও মহিলা পুলিশ— সবাইকেই খানিক ব্যস্ত হতে হল। বেপরোয়া মোটরবাইকের দৌরাত্ম্যও কম ছিল না। পরিস্থিতি সামলাতে গভীর রাতে বেশ কয়েক জনকে আটকও করতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। 

শহরের ক্লাবে ক্লাবে রুশ সুন্দরীদের বেলিডান্স কিংবা বলিউডি তারকাদের দেখার আকর্ষণে হন্যে হয়ে ছাড়পত্র জোগাড়ের মরিয়া চেষ্টা এ দিন জারি ছিল বিকেল অবধি। নৈশ উদ্‌যাপনের টানে দেখা গেল, কোনও কোনও বাবু-বিবি কার্যত অষ্টমীর ঠাকুর দেখার ঢঙে ক্লাব-হপিংয়ের মতলব ছকে ফেলেছেন। টালিগঞ্জ থেকে পার্ক স্ট্রিট বা ইস্টার্ন বাইপাসের ধারের নামজাদা ঠেকে কিছু ক্ষণের জন্য হত্যে দেওয়ার পরিকল্পনা! ক্লাবের গিজগিজে ভিড় অবশ্য অনেকের পছন্দ নয়। তাঁরাও দল বেঁধে বন্ধু-সহকর্মী-পরিবারের সঙ্গে পরপর পার্টির নির্ঘণ্ট ছকে রেখেছেন। গভীর রাত অবধি এই আমুদে জনতার সৌজন্যেই শহরের যান চলাচল ঢিমে অবস্থায় থাকল। বছর শেষের শহরে মাঝরাতের পরেও জমজমাট মেট্রো। ট্যাক্সি ধরতে চিরকেলে হয়রানি থাকল এক রকমই। অ্যাপ-ক্যাব ভাড়া হাঁকল আকাশছোঁয়া। উৎসবের রাতে শহরের চেনা হয়রানির ভাগে কম পড়েনি কিছুই। তবে সে সব আমজনতার উৎসাহেও চিড় ধরাতে পারেনি ছিটেফোঁটা।

আরও পড়ুন: বর্ষবরণেও শহর দাপাল শব্দদানব

উৎসবের মেজাজটা অবশ্য মালুম হচ্ছিল সকাল থেকেই। রবিবার, তায় বছরের শেষ দিন। তার উপরে শীতের মিহি ছোঁয়াটুকু থেকেও বঞ্চিত হয়নি কলকাতা। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্বাভাবিকের থেকে খানিক বেশি, জমিয়ে শীতের পক্ষে তাপমাত্রা ‘আহা মরি’ না হলেও এই হাল্কা শীতের স্পর্শেও অখুশি নয় শহর। 

আনন্দ: বর্ষবিদায়ের বিকেলে পার্ক স্ট্রিটের চেনা ছবি। রবিবার। নিজস্ব চিত্র

কলকাতা ছাড়িয়ে পিকনিকে সামিল হবে, না শহরের ভিতরে চিরাচরিত চিডি়য়াখানা-ভিক্টোরিয়ার বাগানের শীত-পার্বণে যোগ দেবে— সেই ধন্দ যথারীতি উঁকি দিয়েছে। তার সঙ্গে ২০১৭-এ শহরের অন্যতম সেরা আকর্ষণ হয়ে উঠেছে নিউ টাউনের ইকো-ট্যুরিজম পার্ক। ইকো পার্কে এ বছর সুযোগ মিলছে দুনিয়ার সাতটি বিস্ময়ের মুখোমুখি হওয়ার। ‘চিনের প্রাচীর’, ‘তাজমহল’-এর চাতাল কিংবা ‘মিশরের পিরামিড’ আমজনতার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল গত নভেম্বরেই। তা ছাড়া, ইকো পার্কের ‘জাপানিজ ফরেস্ট’-এর আকর্ষণও কম নয়। সেখানে জাপানি প্যাগোডা থেকে শুরু করে সুশি-তেরিয়াকির রেস্তোরাঁয় জমল ভিড়।

বছরের শেষ দিনটিতে ইকো পার্কের এই রকমারি বিস্ময় না আলিপুরের পশুপাখির বাগানে নবাগত সিংহ-জাগুয়ার-ক্যাঙারুদের চাক্ষুষ করার মজা— বেছে নেওয়া সহজ কাজ ছিল না কলকাতার জন্য। বছরের শেষ দিনটির হিসেবে, দেখা গেল চিড়িয়াখানায় কম-বেশি ৮১ হাজার লোক জড়ো হয়েছিল। ২০১৬-র শেষ দিনটিতে ইকো পার্কের ভিড় ৩৯ হাজারে আটকেছিল। এ বার তা ৯৪ হাজার পার করে, চিড়িয়াখানার মতো জনপ্রিয় স্থানকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। হিডকোর চেয়ারম্যান দেবাশিস সেন বলছিলেন, ‘‘নতুন আকর্ষণ ঘিরে যা উৎসাহ, তাতে পয়লা জানুয়ারি যে কী ভিড় হবে, তা ভেবে কূল পাচ্ছি না।’’ নিকো পার্কেও অনেকে ভিড় করেছিলেন আতসবাজির রোশনাইয়ের টানে। কলকাতার গঙ্গার ঘাটের আকর্ষণও নেহাত কম নয়।

শহরের নানা প্রান্তে জড়ো হয়ে ছুটির দিনের স্বাদ চেটেপুটে খেয়েছে কলকাতা। নতুন বছরে একুশ শতক এ বার সাবালকত্বের চৌকাঠ পেরোল বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচই। বর্ষবরণের উৎসব অবশ্য কলকাতার চিরকেলে রীতিই ধরে রেখেছে।