মা না থাকার যন্ত্রণা কলকাতা শহরে এসে আরও এক বার টের পেল আট বছরের সৃজল। পাশাপাশি, তার চিকিৎসা নিয়ে দিনভর চলল টানাপড়েন।

নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে সোমবার সকালে কোনও মতে ভর্তির ব্যবস্থা হলেও মা না থাকায় ওয়ার্ডের ভিতরে ঠাঁই হয়নি তার। নিয়ম অনুযায়ী শিশু বিভাগে রোগীর সঙ্গে মা কিংবা মাতৃস্থানীয় কারও থাকার কথা। কিন্তু সৃজলের সঙ্গে বাবা ছাড়া কার্যত কেউ নেই। আর বাবাকে শিশু ওয়ার্ডে রাখা যাবে না। কারণ সেখানে অন্য রোগীদের মায়েরা থাকেন। এই অবস্থায় ওয়ার্ডের বাইরের বারান্দায় একটি খাটের ব্যবস্থা করে প্রথমে সেখানেই রাখা হয় তাকে। বিকেলে ‘কোল্ড ওয়ার্ড’ নামে একটি ফাঁকা জায়গায় তাকে পাঠানো হয়। শিশু বিভাগের চিকিৎসকেরা ওই অস্থায়ী ওয়ার্ডেই এসে বার কয়েক দেখে গিয়েছেন তাকে।

শিলিগুড়ির কিছু সহৃদয় মানুষের দানে অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া জোগাড় করে এ দিন কলকাতায় এসেছে তারা। কিন্তু পৌঁছনোর পর থেকেই শুরু হয়েছে সমস্যা। তার বাবা, পেশায় প্রান্তিক চাষি, রমেশ রাই জানিয়েছেন, সৃজলের যখন চার মাস বয়স, তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তার পর থেকে তিনি একাই সৃজলকে বড় করছেন। কিন্তু মা না থাকার জন্য যে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হবে, তা আগে কখনও ভাবেননি।

এ দিকে, কলকাতায় পৌঁছলেও সারা দিনে এনআরএসে প্লাস্টিক সার্জারির কোনও ডাক্তার দেখতে আসেননি সৃজলকে। অথচ, প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের অস্তিত্ব না থাকার কারণেই উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ থেকে তাকে কলকাতায় রেফার করা হয়েছিল। এনআরএসে শিশু বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা সকাল ১০টায় প্লাস্টিক সার্জারির ডাক্তারকে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু রাত পর্যন্ত কেউ আসেননি। কেন আসেননি, সেই ব্যাখ্যা কারও কাছে নেই। রাতে এনআরএসের সুপার হাসি দাশগুপ্ত জানান, এই বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এ দিন ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ শিলিগুড়ি থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে কলকাতার এনআরএসে এসে পৌঁছয় সৃজল। তার বাবা ছাড়াও একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি ছিলেন সঙ্গে। দীর্ঘ যাত্রার শেষে আরও ভোগান্তি অপেক্ষা করে ছিল অসুস্থ ওই শিশুর জন্য। সৃজলের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, হাসপাতালে পৌঁছনোর পরে ইমার্জেন্সির ডাক্তারেরা তাঁদের এসএসকেএমে রেফার করেন। ওই কাকভোরেই তারা এসএসকেএমে গেলে সেখানকার ইমার্জেন্সির

ডাক্তারেরা জানান, আউটডোর খোলার পরে আসতে হবে। তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডাক্তারেরা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন, আদৌ ভর্তির প্রয়োজন আছে কি না। সৃজলের বাবা যখন সমস্ত কাগজপত্র দেখিয়ে অনুরোধ করেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য, তখন তাকে সোজা প্লাস্টিক সার্জারিতে রেফার করা হয়। সেখানকার ডাক্তারেরা জানান, বড় ধরনের সংক্রমণ রয়েছে শিশুটির। সংক্রমণ না কমলে অস্ত্রোপচার করা যাবে না। আর সংক্রমণ কমানোর জন্য শিশু বিভাগেই ভর্তি রাখতে হবে। শিশু বিভাগে ভর্তির জন্য সকাল ন’টায় তাকে নিয়ে আউটডোরে আসতে বলেন তাঁরা।

যন্ত্রণায় তখন কাতরাচ্ছে সৃজল। যে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা তার সঙ্গে কলকাতায় এসেছেন, তাঁদেরই এক জন বলেন, ‘‘ওই অবস্থায় আমরা আর বসে থাকতে পারিনি। ফের এনআরএসে এসে কোনওমতে শিশু বিভাগেই ওকে ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু শিশু বিভাগের ডাক্তারেরাও বারবার জানাচ্ছেন, এখানে ওর যথাযথ চিকিৎসা হওয়া সম্ভব নয়। ওকে এসএসকেএমে পাঠানো দরকার। এই অবস্থায় আমরা কী করব, বুঝতে পারছি না। অসহায় লাগছে।’’

যদিও এনআরএস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তাঁরাই সৃজলের চিকিৎসা করবেন। অসুখটা যেহেতু পুরনো এবং সংক্রমণ খুবই গভীর, তাই ফল পেতে খানিকটা সময় লাগবে। সুপার বলেন, ‘‘পেডিয়াট্রিকস ওয়ার্ডে ভর্তির ব্যবস্থা হয়েছে। চিকিৎসা শুরু হয়েছে। আমরা শিশুটিকে সারিয়ে তোলার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’’ কিন্তু উত্তরবঙ্গ থেকে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ার পরেও যে ভোগান্তির মুখে পড়তে হল সৃজলকে, তা কি এই শহরের চিকিৎসা ব্যবস্থার গায়েই অনেকখানি কালি ছিটিয়ে দিল না? তিনি বলেন, ‘‘সকালে যে এমন কোনও সমস্যা হয়েছে, সেটা জানতামই না। বাড়ির লোকেরা যদি সঙ্গে সঙ্গে জানাতেন, তা হলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিতাম। কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।’’

অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া জোগাড় করতে না পারায় আটকে ছিল কালিম্পং-এর বাসিন্দা আট বছরের সৃজলের চিকিৎসা। কুঁচকি ও পিঠের ঘায়ে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল চার দিকে। কোমর থেকে শরীরের নীচের অনেকটা অংশ অসাড়। মল-মূত্র ত্যাগের উপরে কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। মাস কয়েক আগে হঠাৎ তার কোমরের নীচ থেকে অসাড় হতে শুরু করে। ‘চাইল্ডলাইন’-এর সদস্যেরা শিশুটিকে কালিম্পং হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখান থেকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা হলেও উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে প্লাস্টিক সার্জারির ব্যবস্থা না থাকায় তাকে কলকাতায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

এ দিন রাতে ছেলেকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে রমেশ বলেন, ‘‘এখনও প্লাস্টিক সার্জারির ডাক্তার আসেননি। জানি না কী হবে। ছেলেটা সমানে কেঁদে চলেছে। কলকাতার ডাক্তারবাবুরা ছেলেটাকে সুস্থ করে আবার আমার কোলে ফিরিয়ে দিতে পারবেন তো?’’