কাঁকসা জঙ্গলমহলের একটি প্রাচীন গ্রামীণ জনপদ অযোধ্যা-বনকাটি। অবিভক্ত বর্ধমান জেলার জঙ্গলমহল মানে আউশগ্রাম এবং কাঁকসা থানার জঙ্গলভূমি। মাত্র দু’শো বছর আগেও গুসকরা থেকে বরাকর পর্যন্ত ছিল গভীর জঙ্গল। উইলিয়াম উইলসন হান্টারের ‘অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল’ (১৮৬৮)-এ সে বিবরণ আছে। কাঁকসা থানার উত্তর প্রান্তীয় অজয় তীরবর্তী এই জনপদ অযোধ্যা-বনকাটি। এক সঙ্গে বললে অবস্থানগত পরিচিতির সুবিধা হয়।

গ্রাম বনকাটি, মৌজা বনকাটি, জেএল নম্বর ৩২। গ্রাম অযোধ্যা, মৌজা শ্যামবাজার, জেএল নম্বর ৩৩। শ্যামবাজার নামেও রয়েছে গায়ে-গায়ে একটি গ্রাম বা পাড়া। রেনেল সাহেবের ম্যাপে (১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) একটি প্রাচীন রাস্তা বর্ধমান থেকে শুরু হয়ে দিগনগর, মানকর, ভাতকুণ্ডা, আদুরিয়া হয়ে সেনপাহাড়ির ভিতর দিয়ে অজয় পার হয়ে চলে গিয়েছে বীরভূমের রাজনগর পর্যন্ত। সে রাস্তার উপরেই এই জনপদ।

তখন কাঁকসা থানা এলাকার সমগ্র ভূখণ্ডই সেনপাহাড়ি নামে পরিচিত। বাংলার বিখ্যাত সেন রাজাদের নামেই সেনপাহাড়ি। বন কেটে বসত, তাই নাম বনকাটি। তবে বন কেটে বসতি স্থাপনের সময়কালের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। এক দল মানুষ বন-জঙ্গল সাফ করে বসত এবং আবাদের জায়গা বার করত। তাদের ‘বন কাটাদের দল’ বলা হতো। তাদের বসবাস থেকেই বনকাটির নাম— এমন মতও আছে।

অযোধ্যা নামে রয়েছে উত্তর ভারতীয় প্রভাব। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা থেকে আসা সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ব্রাহ্মণের বসবাসের কারণে গ্রামের সেই অংশের নাম পরবর্তীতে ‘অযোধ্যা’ হয়ে যায়।

অযোধ্যা-বনকাটিকে গঞ্জ হিসেবে গড়ে তোলার পিছনে এখানকার তাম্বুলি সম্প্রদায়ের বিশেষ ভূমিকা আছে। এঁরা মূলত ব্যবসায়ী। বিহার-ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছিলেন কমপক্ষে তিনশো বছর আগে। ব্রাহ্মণদের বসতি তারও আগের। এ ছাড়া, তন্তুবায়, সূত্রধর, কর্মকার, স্বর্ণকার, কুম্ভকার, ময়রা-মোদকেরা তাঁদের কর্মকুশলতায় অযোধ্যা-বনকাটিকে একটি জমাট গঞ্জে পরিণত করেন দু’শো বছর আগে। এলাকার সমৃদ্ধির শুরু তখন থেকেই।

বনকাটির জমিদার ছিলেন রামপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি গালার ব্যবসায়ে উপার্জন করেছিলেন। অন্য ব্যবসাও ছিল। তখন বসুধা থেকে শুরু করে সাতকাহনিয়া হয়ে বনকাটি পর্যন্ত ছিল পলাশের ছোট ছোট বন। সেই সব গাছে লাক্ষা পোকার চাষ হতো। বীরভূমের ইলামবাজার তখন গালা-শিল্পের জন্য বিখ্যাত।

বনকাটির জমিদার বাড়ির সম্মুখে রয়েছে টেরাকোটার অলঙ্করণ সমৃদ্ধ গোপালেশ্বর শিবমন্দির। রামের রাজসভা, দশমহাবিদ্যার নানা রূপ, নৌ বাণিজ্য, ইংরেজ সেনাদল এবং অন্য দেবদেবী— কী নেই সেই অলঙ্করণে। মন্দিরটি পঞ্চরত্ন অর্থাৎ পাঁচ চূড়া বিশিষ্ট। প্রতিষ্ঠা লিপি অনুযায়ী ১৭৫৪ শকাব্দে এটি নির্মিত। এই মন্দিরের পিতলের রথের গায়ের অলংকরণ যে কোনও শিল্পরসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। গোপালেশ্বর শিবমন্দির এবং পিতলের রথটির অবশ্যই উপযুক্ত সংরক্ষণ দরকার।

অযোধ্যা গ্রামের হাটতলা এলাকায় রয়েছে আর একটি টেরাকোটা সজ্জিত পঞ্চরত্ন শিবমন্দির। প্রতিষ্ঠা ১৭০৪ শকাব্দে। লাগোয়া আর একটি শিবমন্দির, ধর্মরাজ মন্দির, বিষ্ণুমন্দির প্রায় একই সময়ে নির্মিত। ধর্মরাজ মন্দির ভেঙে গিয়েছে। চতুষ্কোণ বিষ্ণুমন্দিরটিও অপূর্ব অলঙ্করণ সমৃদ্ধ ছিল। সেটি প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

ঘটকপাড়ার ভগ্ন শিবমন্দিরটিও  প্রায় আড়াইশো বছরের প্রাচীন। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের এবং অপর এক চট্টোপাধ্যায় পরিবারের শিবমন্দির দু’টি তুলনায় নবীন। প্রতিষ্ঠাকাল দু’শো বছর পূর্বে।

অনাদিনাথ শিবমন্দিরটি আনুমানিক ২৫০ বছরের পুরোনো। কামারপাড়ায় পাশাপাশি চারটি বিশাল শিবমন্দির সংরক্ষণের অভাবে ধুঁকছে। শোনা যায়, বীরভূমের কোটা-শীর্ষার কর্মকার বাড়ির জমিদার বাবুরা এগুলি তৈরি করিয়েছিলেন। আদতে তারা অযোধ্যা গ্রামেরই মানুষ। জমিদারির আয় এবং লৌহ অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যবসায় তাঁরা ধনী হয়ে উঠেছিলেন। এ রকম বিশালাকৃতি চারটি শিখর দেউল কমই দেখা  যায়। মন্দিরগুলিতে পঙ্খের আস্তরণের উপরে কিছু টেরাকোটার কাজ ছিল। এগুলি দু’শো বছরের বেশি প্রাচীন। 

বনকাটির রায়বাড়ির কথা না বললে লেখা অসম্পূর্ণ থাকে। এলাকার অন্যতম প্রাচীন এই পরিবারের কালীপূজা খুবই বিখ্যাত ছিল। পরিবার সূত্রে জানা যায়, এই বংশের আদি পুরুষ মহেশ্বরপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তান্ত্রিক। বাংলার সেন রাজাদের গুরু।

এই জঙ্গলমহলের সঙ্গে সেন রাজাদের পূর্ব পরিচয়ও ছিল। লক্ষ্মণ সেন তন্ত্র সাধনার জন্য এখানে এসেছেন। সঙ্গে এনেছিলেন গুরুদেবকে। প্রচুর জমিজায়গা লাভ করে মহেশ্বরপ্রসাদ এখানেই বসবাস স্থাপন করেন।  কালী মন্দির প্রাঙ্গণে উত্তরমুখী এবং পরবর্তীতে পূর্বমুখী বৃহৎ শিবমন্দিরগুলি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরমুখী মন্দির দু’টির স্থাপনাকাল ১৭০৪ শকাব্দ। পূর্বমুখী মন্দির তিনটির স্থাপনাকাল ১৭৫৭ শকাব্দ।

অযোধ্যা-বনকাটি এই প্রাচীন জনপদে মোট ১৯-২০টি শিবমন্দির রয়েছে। এদের মধ্যে আকৃতি, নির্মাণ কৌশল এবং টেরাকোটা অলঙ্করণের জন্য ছ’টি বিখ্যাত। মোটামুটি ২৫০ বছর আগে এই এলাকার সমৃদ্ধির শুরু। এবং পরবর্তী একশো বছরের মধ্যে এই জঙ্গলমহলের একটি সমৃদ্ধ গঞ্জ এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে অযোধ্যা-বনকাটি।

এখানকার প্রাচীন মন্দিরগুলি এলাকাবাসীর গর্বের বস্তু। কয়েকটির সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ছাড়া, তা সম্ভব নয়। পুরাতত্ত্ব বিভাগ সে কাজে এগিয়ে আসুক, এই অনুরোধ রইল।