কোথাও নদীর গতি বদলে যাওয়ায় সঙ্কুচিত হচ্ছে বৈকুণ্ঠপুরের বনভূমি। আবার কোথাও বিঘের পর বিঘে জঙ্গল কেটে রাতারাতি বসতি তৈরি হয়েছে। মহানন্দার জঙ্গলেও কোপ পড়ছে কমবেশি রোজই। বনভূমি যেমন কমছে, তেমনই বহরে বাড়ছে শিলিগুড়ির আয়তন। তাতেই বুনো জন্তুর বিচরণ ক্ষেত্র কমছে। কোথাও খাদ্যসঙ্কট তৈরি হচ্ছে। মূলত সে কারণেই বন্যেরা লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে বলে বন দফতরের একাংশ ও পরিবেশপ্রেমীদের অনেকেরই ধারণা।

আলিপুরদুয়ার নেচার ক্লাবের অমল দত্ত কিংবা বসুন্ধরা স্বেচ্ছাসেবীর কর্ণধার সুজিত রাহাদের অভিজ্ঞতা এমনই। ছোটবেলায় শিলিগুড়ির গা ঘেঁষে থাকা বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চল ও মহানন্দা অভয়ারণ্য এখন এতটা দূরে চলে গিয়েছে কেন, সেটা ভাবলেই বুনোদের চলাফেরা জায়গা কারা দখল করেছে সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়, মনে করেন সুজিতবাবু। তিনি বলেন, ‘‘বুনোরা লোকালয়ে আসছে, নাকি আমরা বুনো জন্তুদের বিচরণ ক্ষেত্রে ঢুকে পড়ছি— সেটা দেখা দরকার। শিলিগুড়ি শহর যে ভাবে পুবে ও উত্তরে বাড়ছে, তাতে বনভূমি কমারই কথা। বন দখল রুখতে যৌথ পরিচালন কমিটিগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে সরকারকে।’’

আশির দশকেও শিলিগুড়ি শহর বলতে বড় জোর ১১ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে বুঝতেন বাসিন্দারা। হাতে গোনা কয়েকটি ওয়ার্ড নিয়ে পুরসভা ছিল। এখন সেই ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ৪৭। তার উপরে বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চলের শালুগাড়া, মহানন্দা অভয়ারণ্য লাগোয়া গুলমা চা বাগানের কাছেপিঠে শয়ে-শয়ে ঘরদোর হয়েছে। বন দফতরের একটি সূত্রের আশঙ্কা, বৈকুণ্ঠপুর ও মহানন্দা মিলিয়ে অন্তত ৬০ হেক্টর জমি দখল করে বসতি হয়েছে। তাই পরিবেশপ্রেমীদের অনেকেই বছর পাঁচেক আগে সাতসকালে হাকিমপাড়ায় চিতাবাঘ ঢোকায় আশ্চর্য হননি। তার আগে শক্তিগড়ে বুনো হাতি ঢোকাও অস্বাভাবিক মনে করেননি তাঁরা। এমনকী, জনতার তাড়ায় দিনেদুপুরে সেবক রোডে়র জমজমাট বাণিজ্যিক এলাকায় বুনো দাঁতালের তাণ্ডবও বিচিত্র কিছু নয় বলে তাঁদের ধারণা।

বনের দখল

মহানন্দা অভয়ারণ্য

• আয়তন ১২৭ বর্গ কিলোমিটার।

• পাহাড়ি জঙ্গল ৬০%। বাকিটা সমতলে। হাতি-চিতাবাঘ-হরিণের বিচরণ ক্ষেত্র।

• গত দুই দশকে অন্তত ২০ হেক্টর বনভূমি দখল হয়েছে বলে অভিযোগ।

 

বৈকুণ্ঠপুর সংরক্ষিত বনাঞ্চল

• আয়তন প্রায় ২৩৬ বর্গ কিমি।

• তিস্তা, করতোয়া, জোড়াপানি, সাহু-সহ গোটা দশেক ছোট নদী ঘেরা বন হাতি-চিতাবাঘ-হরিণ-বাঁদর-গন্ডারের আস্তানা।

• গত দুই দশকে অন্তত ২৬ হেক্টর বনভূমি দখল করে বসতি হয়েছে বলে আশঙ্কা।

 

সূত্র: বন দফতর, পরিবেশপ্রেমী সংগঠন।

 

তাই এ বার সার্কিট হাউসের অদূরে চম্পাসারি-মিলন মোড়ে হাতি ঢোকার খবরে বিস্মিত নন শিলিগুড়ি শহরের মেয়র অশোক ভট্টাচার্যও। তিনি বলেন, ‘‘স্কুলবেলায় বৈকুণ্ঠপুর, মহানন্দার বন ছিল ঘাড়ের কাছে। এখন অনেক দূরে চলে গিয়েছে। বন দখলের প্রবণতা বন্ধ করতে আরও সচেতনতা জরুরি। না হলে বিপদ বাড়বে।’’

শিলিগুড়ি নাগরিক সংগঠনের মুখপাত্র রতন বণিক বলেন, ‘‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ফরেস্ট ম্যানেজমেন্টের একটা সমীক্ষা অনুযায়ী বৈকুণ্ঠপুর ও মহানন্দা অভয়ারণ্যের লাগোয়া এলাকার সিংহভাগ বাড়ির জ্বালানি বন থেকে জোগাড় করা হয়। উপরন্তু, আসবাবপত্র, ঘরদোর তৈরিতেও কাঠ জোগাড় হয় ওই বন থেকে। বনভূমি সঙ্কুচিত হওয়ার এটাও একটা কারণ।’’

বন দফতরের দাবি, ফি বছর কয়েক লক্ষ টাকার কাঠ, আসবাব বাজেয়াপ্ত করা হয়। বন দখল রুখতে নিয়মিত অভিযানও চলে। তবে বন কর্তাদের একাংশ একান্তে এটাও মানছেন, যতটা বাজেয়াপ্ত হয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কাঠ পাচার হয় বাইরে। জলপাইগুড়ি সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের মুখপাত্র রাজা রাউত বলেন, ‘‘আরও একটা মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে বছরভর পিকনিক। ডিজে নিয়ে, মদের আসর বসিয়ে যে নাচগান চলে, তাতে বুনো জন্তুরা বিরক্ত হয়। সেটা আমরা কবে বুঝব!’’