সমস্যা চলছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। অথচ দলের শীর্ষ নেতারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি, সোমবার থেকে তা দেখছে আমড্যাংরা এলাকা। অবশেষে বুধবার গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে এক দলীয় কর্মী খুন হয়ে যাওয়ার পরে জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব লাগাম টানতে উদ্যোগী হলেন। দলের জেলা সভাপতি অরূপ খান জানালেন, বিষ্ণুপুর বিধানসভা এলাকার তালড্যাংরা ব্লকের আওতায় থাকা গ্রামগুলিতে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটাতে দু’পক্ষের নেতাদের নিয়ে আলোচনায় বসবেন তিনি।

২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী তুষারকান্তি ভট্টাচার্যের কাছে পরাজিত হন তৃণমূল প্রার্থী তথা প্রাক্তন মন্ত্রী শ্যাম মুখোপাধ্যায়। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিষ্ণুপুর বিধানসভা কেন্দ্রের আওতায় থাকা তালড্যাংরার সাতমৌলি, আমড্যাংরা, ঢ্যামনামারার মতো এলাকাগুলিতে রাজনৈতিক সন্ত্রাস মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ওই এলাকায় জোট প্রার্থী তুষারবাবুর অনুগামী ও শ্যামবাবুর অনুগামীদের ঝামেলা কার্যত রোজকার ঘটনা হয়ে ওঠে। ওই বছরেই কলকাতায় শহিদ দিবসের মঞ্চে তৃণমূলের বাঁকুড়া জেলা পর্যবেক্ষক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দেন তুষারবাবু। তুষারবাবু তৃণমুলে যোগ দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলের অনেকেই অনুমান করেছিলেন, বিষ্ণুপুর বিধানসভার তালড্যাংরা ব্লকের গ্রামগুলিতে রাজনৈতিক সন্ত্রাস এ বার বন্ধ হবে।

কিন্তু তাঁদের ভুল প্রমাণ করে দিয়ে, ফের যুযুধান দু’পক্ষের সংঘর্ষ চলতেই থাকে। লাগাতার ওই দুই নেতার অনুগামীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তপ্ত হচ্ছে তালড্যাংরা ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামগুলি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও ঘটনাতেই শাসকদলের জেলা নেতৃত্বকে সমস্যা মেটাতে উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ দলীয় কর্মীদের একাংশের।

সমস্যার কারণ কী? বুধবার বাঁকুড়া মেডিক্যালে হাজির থাকা শ্যামবাবুর অনুগামী হিসেবে পরিচিত ঢ্যামনামারার বাসিন্দা তাজাউদ্দিন খান, এশা হক মল্লিকদের বক্তব্য, ‘‘আমরা প্রথম থেকেই তৃণমূল করে আসছি। সিপিএমের অনেক অত্যাচার সহ্য করেও ২০১১-র ভোটে শ্যামবাবুকে জিতিয়েছিলাম। ২০১৬-র ভোটেও শ্যামবাবুকে জেতাতে প্রাণপাত করেছিলাম। এলাকায় যাঁরা সিপিএম করত তাঁদের হাত ধরেই তুষারবাবু জিতেছেন। এখন ওই সিপিএম কর্মীরাই নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করতে শুরু করেছেন।’’ নির্বাচনে হারার পরে শ্যামবাবু জেলা রাজনীতিতে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়ার সুযোগে তুষারবাবুর অনুগামীরা তাঁদের উপরে অত্যাচার শুরু করেছেন বলেই অভিযোগ তাজাউদ্দিন, এশা হকদের।

যদিও ওই এলাকার তুষারবাবুর অনুগামীদের দাবি, ‘‘শ্যামবাবুর পরাজয় তিনি নিজে ও তাঁর অনুগামীরা কেউই মেনে নিতে পারছেন না। তাই তুষারবাবু তৃণমূলে যোগদানের পরেও দু’পক্ষের দূরত্ব রয়েই গিয়েছে।’’

দুই নেতা কেন নিজেদের মধ্যে সমস্যা মিটিয়ে নিতে উদ্যোগী হচ্ছেন না? শ্যামবাবু এই প্রশ্নের কোনও জবাব দেননি। যদিও তুষারবাবু দাবি করেছেন, ‘‘আমি আগেও এলাকায় শান্তি ফেরাতে দলীয় নেতাদের মধ্যস্থতায় শ্যামকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। উনি আলোচনায় বসার আশ্বাস দিয়েও বসেনি। এ দিনও আমি রাজ্য নেতৃত্বকে আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছি। রাজ্য এ নিয়ে ভাবছে।’’

জেলায় এসে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে পর্যবেক্ষক অভিষেক বারবার নেতৃত্বকে দ্বন্দ্ব মেটাতে নির্দেশ দিয়ে যান। কিন্তু তারপরেও শ্যাম-তুষারের দ্বন্দ্ব মেটাতে জেলা নেতৃত্ব সক্রিয় না হওয়ায় ক্ষুব্ধ দলের নীচুতলার কর্মীরা। যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ দলের জেলা সভাপতি। তিনি বলেন, ‘‘আগে বহুবার শ্যামবাবু ও তুষারবাবুকে আলোচনা করে সমস্যা মিটিয়ে নিতে বলা হয়েছে।’’ নির্দেশের পরেও সমস্যা না মেটায় কেন দুই নেতার বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নেয়নি? এই প্রশ্নের অবশ্য সদুত্তর মেলেনি তাঁর কাছে। তবে রাজ্য নেতৃত্বের নজরেও এ বার এই সমস্যা পড়েছে। অরূপবাবু বলেন, ‘‘শীঘ্রই দু’জনকে নিয়ে আলোচনায় বসব। রাজ্য নেতৃত্বও বিষয়টি দেখছে। এ ব্যাপারে রাজ্যের সঙ্গেও আমরা আলোচনা চালাচ্ছি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘এ দিনের খুনের ঘটনার দলীয় ভাবেও তদন্ত হচ্ছে। পুলিশকে বলেছি দোষি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে।’’