তিন দিন ধরে নিখোঁজ থাকা এক কাঠ ব্যবসায়ীর দেহ ঘিরে উত্তাপ ছড়াল পাত্রসায়রের কুশদ্বীপে। মঙ্গলবার সকালে কুশদ্বীপ বাজারে দোকানের ভিতরে ওই ব্যবসায়ীর দেহ মেলে। কিন্তু পুলিশ তা উদ্ধার করতে গেলে দফায় দফায় বাধা দেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। ওই ব্যবসায়ীকে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তাঁরা পুলিশ-কুকুর নিয়ে এসে তদন্ত করানোর দাবি তোলেন।

ব্যবসায়ী মানিক পালের (২৯) নিখোঁজের কথা পুলিশকে আগাম জানানো সত্ত্বেও, তদন্তে ঢিলেমি করা হয়েছে বলেও তাঁদের অভিযোগ। পরে এসডিপিও (বিষ্ণুপুর) সুকোমলকান্তি দাস বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে এলে তাঁরাও বিক্ষোভের মধ্যে পড়েন। বিকেল পাঁচটা নাগাদ পাত্রসায়র পঞ্চায়েত সমিতির খাদ্য কর্মাধ্যক্ষ শাজাহান মিদ্যা ঘটনাস্থলে এসে জনতাকে বোঝান। আশ্বাস দেন, পুলিশ-কুকুর এনেই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হবে। তারপরেই পুলিশ গিয়ে দেহটি উদ্ধার করে।

নিহতের গলায় দড়ির ফাঁস রয়েছে। তার ঠিক উপরেই কড়িকাঠেও ছেঁড়া দড়ি ঝুলছিল। জেলা পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘গলায় ফাঁস দিয়ে খুন করে মানিকের দেহ টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেই মনে করা হচ্ছে। ক’দিন আগেই তাঁকে খুন করা হয়। তবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে, দেহটির ময়না-তদন্ত করানো হবে।’’

মানিকের বাড়ি কুশদ্বীপের পূর্বপাড়ায়। তিনি নিজেই কাঠের আসবাসপত্র তৈরি করে বিক্রি করতেন। অবিবাহিত এই যুবকের বাড়িতে শুধু বিধবা মা রয়েছেন। রবিবার দুপুরে কাজে যাচ্ছেন বলে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। তারপর থেকে তিনি আর ফেরেননি। মোবাইলে ফোন করা হলে দেখা যায়, তা বন্ধ। এ নিয়ে পরিবার উদ্বেগ ছড়ায়। সোমবার মানিকের মা ষষ্ঠী পাল পাত্রসায়র থানায় ছেলের নামে নিখোঁজ ডায়েরি করেন। মঙ্গলবার সকালে কুশদ্বীপ বাজারের ব্যবসায়ী সমিতি বৈঠকে বসে ঠিক করে, মানিকের খোঁজের জন্য তাঁরাও আলাদা ভাবে পুলিশের কাছে ডায়েরি করবেন।

ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সমর দে বলেন, ‘‘সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও মানিকের খবর না পেয়ে এ দিন দুপুরে আমরা থানায় অভিযোগ জানাতে যাচ্ছিলাম। তার আগে মানিকের বন্ধ দোকান একবার খুলে দেখার কথা সবার মনে হয়। তালা ভেঙে দেখা যায়, দোকানের ভিতরে একটি তক্তপোষে মানিকের দেহ উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। পা দু’টো মেঝেতে ঝুলে রয়েছে। গলায় দড়ির ফাঁস।’’ তাঁকে খুন করা হয়েছে, এই অভিযোগ তুলে ক্ষোভ ছড়ায় এলাকায়।

বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, ২০১৪ সালে পুজোর সময়ে এলাকায় এক মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি খুন হন। পরের বছরে এক যুবকও এই গ্রামে খুন হন। তার পরে মানিকের এই রহস্য-ম়ত্যুও খুন বলেই দাবি করছেন স্থানীয়েরা। পর পর গ্রামের তিন জনের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠেন বাসিন্দারা। ক্ষোভ ছড়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও।

সঙ্গে সঙ্গে এলাকার প্রায় একশোটির বেশি দোকানের ঝাঁপ পড়ে যায়। আশপাশের গ্রাম থেকেও খবর পেয়ে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে যায়। ততক্ষণে চলে এসেছিল পাত্রসায়র থানার পুলিশ। তাঁদের দোকানের আশপাশে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। পুলিশ কর্মীদের ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন বাসিন্দারা। কয়েকজন পুলিশ কর্মীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। এসডিপিও আসার পরেও পরিস্থিতি বদলায়নি। পুলিশকর্মীরা দেহটি উদ্ধারের জন্য বারবার অনুরোধ করলেও জনতা পুলিশ-কুকুর এনে তদন্ত করানোর দাবিতে অনড় থাকে। এসডিপিও উপযুক্ত তদন্ত করার আশ্বাস দিয়ে মাইকে জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু লাভ হয়নি। বিক্ষোভের জেরে পুলিশ বাহিনী পিছু হটে। ঘটনাস্থলের কাছেই রয়েছে কুশদ্বীপ হাইস্কুল। ছুটির পরে পড়ুয়াদের ঘিরে রেখে পুলিশ এলাকা পার করে দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের অনুমান, আততায়ী দোকানে ঢুকে মানিককে খুন করে বাইরে থেকে দরজায় তালা ঝুলিয়ে চলে যায়। দোকান বাইরে থেকে বন্ধ দেখে তাই কারও সন্দেহ হয়নি যে ভিতরে ছেলেটার দেহ পড়ে রয়েছে।

মানিককে আগেও খুনের চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন তাঁর পরিবার। তাঁর দিদি কৃষ্ণা পালের দাবি, ‘‘২০১৫ সালে জমি বিক্রির আগের দিন হঠাৎ এক পড়শি ভাইয়ের উপরে হামলা চালিয়ে তাকে খুনের চেষ্টা করেছিল। দেড় মাস হাসপাতালে কাটিয়ে ভাই ফেরে। সেই অভিযুক্ত জামিন পেয়ে বাইরে রয়েছে।’’ মানিকের মা ষষ্ঠীদেবীও অভিযোগ করেন, ‘‘মাঝে মধ্যেই ছেলেকে কেউ ফোন করে ওই মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিত। তাই ওকে সাবধানে থাকতে বলতাম। কিন্তু হঠাৎ করে সর্বনাশ হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি।’’