মা র্কিন রাজনীতি আশঙ্কায় তটস্থ— নূতন প্রেসিডেন্ট হাল ধরিবার পর কী না কী ঘটে তাহা দেখিতে। দেশের অভ্যন্তরের সঙ্গে বিদেশনীতিতে কী ঘটে তাহাও কম ঘোলাটে নয়। এই প্রথম এক জন প্রেসিডেন্ট সে দেশের মাথায় বসিতেছেন, যাঁহার আন্তর্জাতিক বীক্ষা বলিয়া কিছু নাই, যিনি প্রচারের সময় কোনও বিদেশনীতির বিন্দুমাত্র দিশা দিতে পারেন নাই। এবং যিনি প্রচারে আগাগোড়া রাশিয়ার প্রশংসায় মুখরিত থাকিয়াছেন। বাস্তবিক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রাশিয়া লইয়া এত গদগদ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় এমন দেখা যায় নাই। একই সঙ্গে, প্রথম বার মার্কিন দেশে নূতন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতার রাশ হাতে লইলে কী হইবে, ইহা ভাবিয়া সমুদ্রের ও পারে ইউরোপও আশঙ্কায় আধমরা। অল্পবিস্তর নীতিপদ্ধতির পরিবর্তন প্রতি নূতন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই ঘটে। কিন্তু ভূ-রাজনীতির পুরা ভারসাম্য পাল্টাইয়া দিবার মতো কিছু ঘটিতে পারে, এমন ভাবনায় ইউরোপকে দিশাহারা করিয়া দিতে কোনও নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট পারেন নাই। বিশ্ব-পরিস্থিতিতে ‘পশ্চিম বিশ্ব’ কথাটির একটি বিশেষ ‘রাজনৈতিক’ তাৎপর্য আছে। সেই তাৎপর্যই যেন পাল্টাইবার পথে।
জার্মান চ্যান্সেলার অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ইতিমধ্যেই বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সহিত হাত মিলাইয়া প্রচ্ছন্নে ভবিষ্যৎ মার্কিন রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন। দুই দেশের সম্মানভিত্তিক মিত্রতার মূলে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ ও আইনের শাসনই প্রধান, এই দাবিটির মধ্যে ট্রাম্প বিষয়ে মার্কেলের উদ্বেগের কারণটিও প্রকাশিত হইয়াছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরও অনেক দেশই ছটফট করিতেছে, প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, প্রচারকালে ট্রাম্প বারংবার জোর দিয়াছেন আইসোলেশনিজম বা রক্ষণশীল বিদেশনীতির উপর। আমেরিকা একা চলুক একার স্বার্থে, ইহাই এই নীতির সারাংশ। নীতিটি শুনিতে সরল। কিন্তু তলাইয়া দেখিলে বোঝা যায় যে কেবল নিজের স্বার্থ-চালিত বিদেশনীতি আজকের পৃথিবীতে একই সঙ্গে অসম্ভব, এবং অসঙ্গত। বিশ্বায়নের পর বিশ্বের সর্বাপেক্ষা উন্নত ও প্রধান ধনতন্ত্রের দেশ এমন নীতি মানিয়া চলিলে গোটা বিশ্বেরই ক্ষতি হইবার কথা। অকারণ নাক গলাইবার নীতি ভাল নয়। তেমনই অকারণ পঞ্চেন্দ্রিয় বন্ধের নীতিও রাষ্ট্রচালনায় বাঞ্ছিত নয়। আজ ন্যাটো চুক্তি সহসা অকার্যকর হইয়া গেলে ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্যে যে পরিবর্তন হইবে, তাহাতে বড় অস্থিতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা। আকস্মিক মার্কিন পশ্চাদপসরণের দায় তখন ইউরোপীয় দেশগুলিকে লইতে হইবে, আর মার্কিন দেশ সেই সুযোগে আইসোলেশনিস্ট বা এককবাদী হইয়া থাকিবে?
উদ্বেগের দ্বিতীয় কারণ ট্রাম্পের রাশিয়া নীতি। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এত প্রশংসা আর কোনও ভাবী বা বর্তমান রাষ্ট্রনায়কের কাছ হইতে পাইয়াছেন কি? স্বাভাবিক ভাবেই তিনি মিত্রতার হাত বাড়াইয়া দিবেন। যে কোনও মিত্রতাই বাঞ্ছিত, কিন্তু পূর্ব ইউরোপে যে দেশ ছড়ি ঘুরাইয়া চলিতে অভ্যস্ত, সেই ছড়িটি সেই অঞ্চল হইতে যে মিত্রতা-সূত্রে প্রত্যাহৃত হয় নাই, তাহাও মনে রাখা দরকার। নূতন করিয়া রুশ নিয়ন্ত্রণের সরীসৃপগুলি যদি ইউরোপের পূর্ব দিকে প্রবেশ করিতে শুরু করে, ইউরোপ এবং সেই সূত্রে গোটা দুনিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণে তার ছাপ পড়িবে। কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক সমীকরণেও। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের উপরে ইউরোর স্বাস্থ্য নির্ভরশীল। সেই স্বাস্থ্য খারাপ হইলে ইউরোপীয় অর্থনীতির অমঙ্গলের সম্ভাবনা। সব মিলাইয়া ট্রাম্প-আতঙ্কে কেবল আমেরিকা নয়, ইউরোপও বিপর্যস্ত। আর আমেরিকা ইউরোপ ডুবিলে আফ্রিকা এশিয়াও কি নিরাপদ থাকিতে পারে?