কাঞ্চীরাজের নিকট বিদায় চাহিয়া বিদূষক বলিয়াছিলেন, মহারাজের সভায় থাকিলে তিনি হাসিতে ভুলিয়া যাইবেন। ২০১৫ সালের বঙ্গদরবারে চাকুরি করিলে তিনি কথাটির পুনরাবৃত্তি করিতেন। রসিকতা-রসদের অভাবে নহে, তাহার আতিশয্যে। মেট্রো স্টেশনের নাম যে দিন মহানায়ক উত্তমকুমার হয়, সেই দিনই জানা গিয়াছিল, উদ্ভটরসের জন্য আর নাটক রচনার প্রয়োজন হইবে না, বাস্তব যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তব যে ক্রমশই কী হারে উদ্ভটতর হইয়া উঠিতে পারে, তাহা না দেখিলে বিশ্বাস করা কঠিন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজত্বে সচিবালয় হইয়াছে নবান্ন, বোলপুর হইয়াছে গীতবিতান। যে নাগরিক ভাবিতেছিলেন, কালে কালে আরও কত দেখিতে হইবে, তাঁহাকে নিরাশ না করিয়া মহালয়া তিথিতে শ্রীমতী মুখ্যমন্ত্রী আপন সকল দৃষ্টান্ত অতিক্রম করিলেন। নগরের নবীনতম ও দীর্ঘতম উড়ালপুলটির নামকরণ করিলেন ‘মা’। ইহা দেখিলে স্বয়ং সুকুমার রায়ও নমস্কার করিয়া কলমটি নামাইয়া রাখিতেন। তিনি এক রসিকের কথা শুনাইয়াছিলেন, যে জুতোকে ডাকিত অবিমৃশ্যকারিতা, ছাতাকে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, গাড়ুকে পরমকল্যাণবরেষু। কিন্তু তাঁহাকে কৌতুক সৃষ্টির জন্য অনেক শব্দ ব্যবহার করিতে হইয়াছিল। একটি শব্দে এমন আশ্চর্য রস বানানোর সাধ্য তাঁহারও হইত না। প্রসঙ্গত, সুকুমার রায়ের গল্পে বাড়ির নাম কিংকর্তব্যবিমূঢ় দিবামাত্র অবশ্য তাহা হুড়মুড়িয়া ভাঙিয়া পড়ে। কলিকাতাবাসী কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করিবেন, ‘মা’ নিজেকে রক্ষা করিবেন, সন্তানদেরও। প্রথম পর্বে এই সেতু লইয়া বিচিত্র সমস্যা দেখা দিয়াছে, এখনও অবধি ইহাকে দ্বিমুখী করা যায় নাই, করিলেই তুমুল যানজট। যানবাহন কখনও পশ্চিমবাহিনী, কখনও পূর্বমুখী। হয়তো ইহাও বঙ্গেশ্বরীর লীলা— তিনি দেখাইয়া দিতেছেন, কী ভাবে একটি ফ্লাইওভার একটি নদীর মতো হইয়া উঠিতে পারে। নদীকে মা হিসাবে কল্পনা করিতে সত্যই অপূর্ব লাগে। হয়তো সেই কল্পনাই তাঁহার অভীষ্ট। এহ বাহ্য। সৃষ্টিশীলতায় সুঅভিজ্ঞ ব্যক্তির ন্যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়াই নীরব। নূতন এবং নগরীর দীর্ঘতম উড়ালপুলের নামটির ব্যঞ্জনা কী? তাহা কি ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর দ্যোতক? মা দুর্গার চরণে স্বভাবসিদ্ধ শ্রদ্ধাতর্পণ? না, নিজ জন্মদাত্রীরই নামাঞ্জলি? তর্ক চলুক। প্রশ্ন, ইহার পরে কী? অদূর ভবিষ্যতে কি তিনি শপিং মলকে ‘বাবা’ ডাকিতে শিখাইবেন, স্টেডিয়ামকে ‘ভাই’, অনুষ্ঠানবাড়ি ‘দিদি’ এবং গণশৌচালয় হইবে ‘মেসোমশাই’।
হযবরল’কে বাস্তবের মাটিতে টানিয়া নামাইলে কৌতুকরসের ঘোর বিপদ। বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতির দুনিয়ায় এই রসের আকাল চলিতেছে অনেক দিনই। এই সংকট নূতন নহে, নানা সমালোচক নানা ভাবে তাহার নানা ব্যাখ্যাও দিয়াছেন। তবু যেটুকু টিমটিম করিয়া বাঁচিয়া আছে, তাহাও বুঝি এ বার ষোলো আনা বিসর্জনের পথে। রাস্তাঘাটেই যদি ট্যাঁশগরু চলে, অফিসে কুমড়োপটাশ আসিয়া বসে, বোম্বাগড়ের রাজার পিসি তাঁহার কুমড়োটি লইয়া আইপিএল মঞ্চ অলংকৃত করেন— তবে তাঁহাদের গল্প পুনরায় কল্পনা করিয়া, পুলকিত হইবার আর উপায় থাকে না। যাহা বাস্তব নহে, বাস্তবের বিকৃতি বা আধিক্য, তাহা লইয়াই নানাবিধ কৌতুক চিরকাল জমিয়াছে। কিন্তু বাস্তব যখন নিজেকে ভেঙচাইতে থাকে, তখন আর কে কৌতুক করিবে, কে-ই বা তাহাতে পুলকিত হইবে? পরিপার্শ্বে অসম্ভব ও কিম্ভূত কাণ্ড অনবরত ঘটিয়া চলিলে অতি সৃষ্টিশীল কবি-মনও যে যানজটে স্তব্ধ হইয়া যায়। উদ্ভাবন-শক্তিটি খোয়াইয়া বিস্ফারিত নেত্রে সে কেবলই চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে থাকে, বঙ্গ হাস্যমঞ্চের শূন্য মণ্ডপে বিসর্জনের পিদিম জ্বলিতেছে। কারণ দেবীপক্ষের শুভারম্ভে শহরের প্রাণকেন্দ্রে বঙ্গজননী মমতা অসুরজ্ঞানে, কৌতুককে বধ করিয়াছেন। ইহাই হয়তো পশ্চিমবঙ্গে এ বারের পূজায় ‘মা’-এর উপহার।
য ৎ কি ঞ্চি ৎ
বাবা রামদেব খুব হাসিয়েছেন। দিল্লির একটি হাসপাতালে এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন তিনি। সেখানকার ডাক্তারবাবুরা তাঁকে নিশ্চয়ই ‘যোগ’-সূত্রেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু রামদেবের তুলনা নেই, তিনি এক ঘণ্টা রকমারি কৌতুকের কথা এবং দেহভঙ্গিতে দর্শক ও শ্রোতাদের একেবারে মাতিয়ে দিয়েছেন। অনেকে অবশ্য রাগ করেছেন— হাসপাতালের সভায় এ আবার কী? কিন্তু সেটা তাঁদের অন্যায় রাগ। ডাক্তারের মন ভাল থাকলে তো রোগীর মঙ্গল।