Advertisement
E-Paper

দুনিয়া জুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদই জিতছে

মোদী আর পুতিন, এর্দোয়ান আর নেতানিয়াহুকে এক সূত্রে বেঁধেছে উগ্র জাতীয়তাবাদ। শরণার্থী সংকট বা সাম্রাজ্যের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন তো আছেই, পাশাপাশি আছে মানুষের আশাভঙ্গের প্রতিক্রিয়া। ভারতে মোদী, ইজরায়েলে নেতানিয়াহু, তুরস্কে এর্দোয়ান, পোল্যান্ডে দুদা, রাশিয়ায় পুতিন— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবী জুড়ে এত জন কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতাকে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির তখতে বসে থাকতে বোধ হয় আমরা আগে দেখিনি।

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৫ মে ২০১৬ ০০:২০
দোসর। ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যঙ্গচিত্র। লিথুয়ানিয়ার রাজধানীতে। এএফপি

দোসর। ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যঙ্গচিত্র। লিথুয়ানিয়ার রাজধানীতে। এএফপি

ভারতে মোদী, ইজরায়েলে নেতানিয়াহু, তুরস্কে এর্দোয়ান, পোল্যান্ডে দুদা, রাশিয়ায় পুতিন— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবী জুড়ে এত জন কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতাকে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির তখতে বসে থাকতে বোধ হয় আমরা আগে দেখিনি। অবশ্য পরিস্থিতির চাপে যেখানে আঙ সান সু চি রোহিঙ্গাদের বার্মিজ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করছেন বা এঞ্জেলা মার্কেল জার্মানি তথা ইউরোপীয়ন ইউনিয়নকে সিরিয়ান শরণার্থীদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তুরস্ককে কোটি কোটি ইউরো দান করছেন, সেখানে মেনে নেওয়া ভাল যে আলো ক্রমে নিভিতেছে। নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাষ্ট্রপতি হলেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়।

এই জাতীয়তাবাদ দেশবাসীকে নয়, দেশকে ভাল রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। দেশ নামক বিমূর্ত ধারণাটিকে দেশবাসীর মাথায় গেঁথে দেওয়ার জন্য এমন দিনের গল্প শোনায় যেখানে ইতিহাস, পুরাণ আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এ যে নেহাত কথার কথা নয় সেটা ভারতীয়রা বিলক্ষণ টের পাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা যে শুধু ভারতের নয়।

আন্দ্রেই দুদার কথাই ধরুন। দয়ার শরীর। কোটি কোটি সিরিয়ান এবং আফ্রিকান শরণার্থীদের মধ্যে জনা দেড়শোকে ঠাঁই দিয়েছেন পোল্যান্ডের মাটিতে; যারা ঢুকেছেন তাঁরাও অবশ্য প্রায়ই মারধর খাচ্ছেন। কিন্তু দুদা শুধু শ্বেতাঙ্গ পোলিশদের ত্রাতা হিসাবেই দেখা দেননি, ইতিহাসকেও দস্তুরমত নিজের পথে চালাতে চাইছেন। পোলিশ রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, পোল্যান্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল হাজার বছর আগের এক পোলিশ রাজার ক্রিশ্চান ধর্মে দীক্ষিত হওয়া। ভেবে দেখুন, এই সেই দেশ যেখানে নাজি অত্যাচারের দগদগে স্মৃতি নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে অসউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প; এই সেই দেশ যেখানে স্টালিন এবং তাঁর অনুগামী পোলিশ কমিউনিস্টরা চল্লিশ বছর ধরে হাজার হাজার মানুষকে জেলে পুরে রেখেছেন; এই সেই দেশ যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ইহুদিরা বহু বছর ধরে নির্যাতিত হয়ে এসেছেন। কিন্তু না, এত ঘটনাবহুল আধুনিক ইতিহাসের কিছুই পোলিশ রাষ্ট্রপতির কাছে গুরুত্ব পায়নি— কিছু ঘটনা তিনি স্রেফ অস্বীকারও করেছেন— গুরুত্ব পেয়েছে শুধুই ধর্ম।

ধর্মের প্রশ্ন নয়

অতি-জাতীয়তাবাদের একটি প্যাটার্ন বুনে দেওয়ার জন্য অনেকেই সমস্যাটিকে ধর্মের প্রিজমে দেখতে চান। বাস্তব অবশ্য বলছে, অতি-জাতীয়তাবাদ কোনও বিশেষ ধর্মের কুক্ষিগত অধিকার নয়। উদাহরণ, ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু মুসলিমপ্রধান তুরস্ক। ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদারপন্থার নিরিখে মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল তুরস্ক। অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে আর্মেনিয়ান গণহত্যার বিভীষিকাময় দিনগুলির থেকে দেশটিকে উদারপন্থার দিকে নিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ কাজ ছিল না কেমাল আতাতুর্ক সেটাই করেছিলেন।

আতাতুর্ক ক্ষমতায় আসার পর প্রায় একশো বছর হতে চলল। খাতায় কলমে তিনি এখনও এ দেশের জনক— অথচ তাঁর ধ্যানধারণার গুরুত্ব যেন ক্রমেই কমে আসছে। শেষ কয়েক বছর এ দেশের তাবড় নেতারা ঘটা করে পালন করছেন কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনবার্ষিকী। তাঁদের বিশ্বাস, গত শতকের তুরস্কের মুক্তিযুদ্ধ নয়, ১৪৫৩-তে বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনই নাকি উন্মেষ ঘটিয়েছে তুর্কি জাতীয়তাবাদের। মনে রাখা ভাল যে আদি অটোমানরা এসেছিলেন তুর্কমেনিস্তান থেকে, ইস্তানবুল থেকে যার দূরত্ব প্রায় হাজার দুয়েক মাইল। একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছেও তুরস্কের মতো আধুনিক একটি দেশে ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে, বিস্ময়াতীত ট্র্যাজেডি ছাড়া কী?

তবে সব সময় যে এত স্থূল পদ্ধতিতেই জাতীয়তাবাদ চাগিয়ে তোলা হয়, তা নয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯১৫-র আর্মেনিয়ান গণহত্যাকে তুরস্কের কোনও সরকারই গণহত্যা বলে স্বীকার করেনি, অথচ বর্তমান সরকারের কর্ণধাররা প্রায় হঠাৎই বলতে শুরু করেছেন, তাঁরা সেই সুদূর অতীতের কথা ভেবে ব্যথিত। তা হলে কি আলো দেখা গেল? না। কারণ, যে আর্মেনিয়ানরা খুন হয়েছিলেন, তাঁদেরকে এখন বলা হচ্ছে ‘অটোমান আর্মেনিয়ান’, অথচ অটোমান রাজপরিষদরাই চেয়েছিলেন আর্মেনিয়ানদের যে কোনও ভাবে তুরস্ক থেকে দূর করতে। সে কথা ভোলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এক বৃহৎ জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে, যেন তুরস্ক রাষ্ট্রে জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার চির কাল অক্ষয় স্থান ছিল এবং পনেরো লাখ মানুষের মৃত্যু স্রেফ কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির সংঘাতের ফল।

আহত অহঙ্কার

আজ আট মাসের বেশি সময় ধরে রাশিয়ার সেনাবাহিনী সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার অল-আসাদের রাজনৈতিক বিরোধীদের ধ্বংস করার কাজে সহায়তা করছে। কিন্তু পুতিন ঠিক কত জন শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছেন নিজের দেশে? গত বছর ৪৮২ জন সিরিয়ানকে রাশিয়া অস্থায়ী শরণার্থী হিসাবে দেশে ঢুকতে দিয়েছে। আর স্থায়ী শরণার্থী? এক জনও নন। অথচ সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা বলছে, রাশিয়ার প্রায় ৭০% মানুষ পুতিনের আগ্রাসনকে সমর্থন করছেন। ২০১৪-তেও প্রায় ৮৯% রুশ জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনের উচিত ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া।

পেরেস্ত্রৈকা এবং গ্লাসনস্ত-উত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ায় মধ্য এশিয়া এবং বাল্টিক সাগরের পাশের সোভিয়েত উপনিবেশগুলি যতই খুশি হোক না কেন, খোদ রাশিয়ার জাত্যভিমানে বড়সড় আঘাত লেগেছিল। শুরুর দিকের চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবার অপ্রতুলতায় মানুষ এ সব নিয়ে বড় একটা মাথা ঘামাননি। কিন্তু আস্তে আস্তে যেই দেশের অর্থনীতিতে স্থিতি আসতে শুরু করেছে, রাশিয়ার মানুষও হৃতগরিমা কী ভাবে ফিরে পাওয়া যায় সে নিয়ে অল্পবিস্তর ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন।

মুশকিল হল, পুতিন শুধু উগ্র জাতীয়তাবাদের বিস্তারের মাধ্যমেই হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজে পেয়েছেন। ও দিকে রাশিয়ার অর্থনীতি শেষ দু’তিন বছর ধরেই বেহাল। পুতিন যতই তেলের দাম পড়ে যাওয়াকে দায়ী করুন না কেন, এটা ঘটনা যে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা— সব কিছু মিলে রাশিয়ার অর্থনীতি এখন ভেতরফোঁপরা। কিন্তু সে নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় বা ইচ্ছা পুতিনের আছে বলে মনে হয় না। তিনি উগ্র জাতীয়তার রথে সওয়ার, দেশবাসীও সে গল্পে বিলক্ষণ বিশ্বাসী।

আশাভঙ্গ

শুধু পোল্যান্ড, রাশিয়া বা তুরস্ক নয়, গোটা ইউরোপ জুড়েই অতি রক্ষণশীল, উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলি মানুষের সমর্থন পাচ্ছে— ফ্রান্স, হল্যান্ড কি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলিতে দশ থেকে কুড়ি শতাংশ ভোট এই উগ্রবাদীদের দখলে। সিরিয়া এবং আফ্রিকার শরণার্থী সমস্যা অবশ্যই ইউরোপের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে— মার্কেলের মতো তুলনায় উদারপন্থী নেতাদের ওপরে আর ভরসা রাখতে পারছেন না তাঁরা। কিন্তু শুধু সেই কারণেই কি উগ্র জাতীয়তাবাদের এত বাড়বাড়ন্ত?

মনে হয় না। তুরস্কের কথাই ধরুন। এক জন তুর্কি দেখছেন বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া কি মাল্টার মতো দেশও ইউরোপীয়ন ইউনিয়নের সদস্যপদ পাচ্ছে স্রেফ ধর্ম ও বর্ণ পরিচয়ে। এক জন পোলিশ দেখছেন একমাত্র ইউরোপীয় দেশ হিসাবে মন্দার বাজারে সাফল্যের মুখ দেখলেও লভ্যাংশের সিংহভাগটা সেই চলে যাচ্ছে ইউরোপীয় সুপারপাওয়ারদের কাছেই। সার্বিয়ার মানুষরা দেখছেন শুধু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় থাকার জন্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের দেশে ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে ঢুকতে পারছে না।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হোক বা আইএমএফ, রাষ্ট্রপুঞ্জ বা ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন, সাধারণ মানুষের কাছে এই সংস্থাগুলি যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল, তার অধিকাংশই পূর্ণ হয়নি। এমনকী উন্নত দেশগুলিতেও আর্থিক বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার যে খনিশ্রমিকরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাবেন বলে পণ করেছেন, তাঁদেরকেও কিন্তু ধোঁকার টাটি কম দেখানো হয়নি। বিশ্বায়নের দৌলতে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজ অনেক কিছু পেয়েছে, ঠিকই। কিন্তু সেই এক কুমিরছানাকে বার বার দেখিয়ে উন্নত দেশগুলি তার ফায়দা তুলেছে হাজার গুণ। স্বভাবতই যে মানুষগুলির ভাগ্যে কিছুই জোটেনি, তাঁরা নিজেদের প্রাথমিক পরিচয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের শুরুর কথাও সেখানেই লুকিয়ে।

উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বাড়বাড়ন্তের পিছনে সাধারণ মানুষের আশাভঙ্গের এই আখ্যানটির গুরুত্ব কম নয়।

ইস্তানবুলের সাবাঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সের শিক্ষক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy