কলকাতা হল ভারতের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ— ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র এই সাম্প্রতিক রিপোর্টে নিশ্চয় আমাদের গর্বের কারণ আছে। অবশ্য কোয়েম্বত্তূর হচ্ছে সবচেয়ে নিরাপদ শহর, কিন্তু সেটাকে ‘প্রধান শহর’ বলা চলে না। যা লক্ষ করার, কলকাতায় অপরাধের হার দিল্লির আট ভাগেরও কম, যদিও রাজধানীতে অপরাধ দূর করতে অনেক বেশি টাকা আর লোকবল খরচা হচ্ছে। বেঙ্গালুরুকে খুবই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য ধরা হয়, তার তুলনায় কলকাতায় অপরাধের হার চার ভাগেরও কম, আর মুম্বইয়ের তুলনায় তো কলকাতা অনেক ভাল অবস্থানে আছেই।

রিপোর্টের পরের অংশটা পড়ে অবশ্য ভাল-লাগা উবে যায়, কারণ আমরা দেখি, নারীপাচার এবং স্ত্রীদের প্রতি স্বামীদের অত্যাচারের ক্ষেত্রে, দেশের মধ্যে একেবারে প্রথম স্থানে পশ্চিমবঙ্গ। মুখে অ্যাসিড ছোড়ার ঘটনার ক্ষেত্রেও তা-ই। এটা সত্যিই একটা বিরাট অবনমন, কারণ পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের দশকে এই রাজ্যটিই মেয়েদের প্রতি সম্মানের জন্য খ্যাত ছিল। এই পরিসংখ্যান এবং এখনকার বেশ কিছু সমীক্ষার ফল আমাদের বোঝায়, দুর্গা ও কালীর এই মাতৃভূমি এখন অনেক বদলে গিয়েছে।

গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে, বদলটা কেন ঘটল। প্রথম দায় অবশ্যই ভয়াবহ নকশাল আন্দোলনের সময়টার, আর কংগ্রেস ও অতিবাম পার্টিগুলোর মধ্যে তার পর রাজনৈতিক যে সংঘর্ষ শুরু হল, তার। ওই সাত-আট বছর পশ্চিমবঙ্গকে যে ভাবে ফালাফালা করেছে, তার ক্ষতগুলো কোনও দিন মিলিয়ে যাবে না। ওই সময় অনেক জিনিসই শেষ হয়ে যায়, তার মধ্যে আছে পার্ক স্ট্রিট-চৌরঙ্গির ঝলমলে নাইট-লাইফ, আর পাড়ায় পাড়ায় বেশি রাত্তিরের মজাদার আড্ডা। বাংলার যে টেনশনহীন ঢিলেঢালা জীবনযাত্রা, তার বদলে এ বার জাঁকিয়ে বসল পাইপগান-ঝলসানো লুম্পেন বুর্জোয়ার দাপট। পরের তিন দশকে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর লাগামছাড়া বিপ্লবিয়ানা (সঙ্গে অন্য ট্রেড ইউনিয়নরাও জুটেছিল) থেকে জন্ম নিল অন্তহীন ঘেরাও— রাগী নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষমতা প্রদর্শন। রাজ্য সরকারের মদতে এই সব পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনকে আদর্শগত কারণে মহিমান্বিত ও রোম্যান্টিক করে তুলত আইপিটিএ-র নাটক, গণসংগীত আর ঋত্বিক ঘটক মৃণাল সেনের প্রগতিশীল সিনেমা। কিন্তু এই আন্দোলনগুলো পুরোপরি ধ্বংস করে দিচ্ছিল রাজ্যের শিল্পের ভিত্তি।

অথচ এই একই বামফ্রন্ট সরকার যে নিষ্ঠার সঙ্গে অপারেশন বরগা আর পাট্টা বিতরণ সুসম্পন্ন করেছিল, তাতে গ্রামীণ এলাকায় বিরাট অর্থনৈতিক লাভ হয়েছিল। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে, এর কার্যকারিতা প্রায় শেষ হয়ে এল, আর তখন কোথায় সরকার অপারেশন বরগার তীব্রতাতেই নতুন সব সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে তৈরি থাকবে, তার বদলে গালভরা রাজনৈতিক লব্‌জ আওড়াতে লাগল, আর যত পারল অনুগত লোকলশকর বাড়িয়ে গেল। এতে ‘সর্বহারা’দের বদলে, দলে ভারী হয়ে উঠল ‘সর্ব-কাড়া’রা, যারা সব মূল্যবোধ আর সাংস্কৃতিক পরিশীলনের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ল। দোষ দেওয়া হত বুর্জোয়া প্রবণতা আর বিশ্বায়নকে, কিন্তু সুভাষ চক্রবর্তীর ‘হোপ ৮৬’ এসে ‘জলসাঘর’-এর অন্ত্যেষ্টি নিশ্চিত করল। এই পেশিরাজত্বে যারা কারবার শুরু করল নিজেদের কাছ থেকে প্রোমোটারদের ইট বালি কিনতে বাধ্য করে, পরে তারাই তৈরি করল শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যা রাজনৈতিক মদতে ভয়ংকর আকার নিল।

বামফ্রন্ট আমলে পঞ্চায়েতের নেতারা হয়ে উঠল একটা নতুন শ্রেণির ধনী দস্যু, যারা গ্রামে ঘুরে বেড়াত মোটরবাইক বা সরকারি জিপ বা অ্যাম্বাসাডরে, আর বিরোধীদের ভয় দেখাত বা পিষে ফেলত। এ জন্য তাদের নতুন সব কৌশলও ছিল, যেমন ‘বয়কট’। এই ভাবে, যে বিরাট অঙ্কের টাকা কেন্দ্র ও রাজ্য খরচা করত গ্রামের উন্নয়নের জন্য, সেখানকার রাস্তা বা জলসেচ ব্যবস্থা ভাল করার জন্য, তা জন্ম দিল ‘কনট্র্যাক্রেসি’-র (বিনয় চৌধুরীর ভাষা অনুসরণে)। কিছু উন্নয়ন অবশ্যই হত, কিন্তু  ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পক্ষে তা একেবারেই যথেষ্ট নয়। আমাদের বুঝতে হবে, পশ্চিমবঙ্গ অবশেষ বিহারকে ধরে ফেলতে পেরেছে— এখন দুই রাজ্যেরই জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি: প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১১০০ জন, যেখানে সর্বভারতীয় গড় ৩৮২। বিহারের মতোই, এ রাজ্যের কৃষিক্ষেত্র আর শিল্পের ছোট পরিসর এতগুলো মানুষকে কাজ দিতে একেবারে অক্ষম, আর তাই গত কুড়ি বছর ধরে, বাঙালি শ্রমিক আর নারীরা উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলিতে চলে যাচ্ছেন মরশুমি কৃষিকাজের জন্য, বা শহরে স্থায়ী কাজের জন্য। বিহার, ঝাড়খণ্ড, পূর্ব উত্তরপ্রদেশের লোক আর সর্বব্যাপী বাংলাদেশিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার চোটে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা সাধারণত বেশ হীন ধরনের কাজ করতে বাধ্য হন। তাই বাংলার শ্রেষ্ঠত্বের কথা ভেবে আবেগে উত্তাল হওয়ার আগে, নিষ্ঠুর সত্যিগুলো ভেবে নেওয়া ভাল।

গুজরাত বা অন্ধ্রপ্রদেশের পক্ষে, নতুন শিল্পের জন্য জমি দেওয়া তুলনায় সহজ, কারণ তাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব ভারতের গড় জনঘনত্বের চেয়েও কম। বাংলার জনঘনত্ব তাদের চেয়ে তিন গুণ বেশি আর জমির সঙ্গে আমাদের আবেগও অনেক বেশি জড়িয়ে, কারণ বাংলার জমি খুব ঊর্বর। জমি অধিগ্রহণকে আবেগের দৃষ্টিতে দেখা হয় কারণ এতে জীবিকার উপায়টাকে কেড়ে নেওয়া হয় আর যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় তা যথেষ্ট নয়। তা ছাড়া, যে শিল্প ওখানে হবে, সেখানে মেশিন বেশি কাজ করবে এবং মানুষ কম কাজ পাবে কি না, এমনকী আদৌ কোনও শিল্প হবে কি না, কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু জমি ছাড়া বড় বা মাঝারি কোনও শিল্পই গড়ে উঠতে পারে না, এবং সেগুলো ছাড়া রাজ্যের অর্থনীতি কখনও এতটা বেড়ে উঠতে পারে না যে সবচেয়ে নিম্ন স্তরে থাকা লোকগুলোকেও কাজ দিতে পারবে।

এই ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ’ পরিস্থিতিটাকেই গত ১৫ বছর ধরে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীরা পালটাবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এ রাজ্যে শিল্প-বিনিয়োগকে আবার টেনে আনা প্রায় অতিমানবিক কাজ। বাঙালি শ্রমিকের যে আগ্রাসী ইমেজ— যার নিজের অধিকার সম্পর্কে টনটনে সচেতনতা, কিন্তু নিজের কর্তব্য সম্পর্কে কোনও চেতনাই নেই— তা সারা দেশের শিল্পপতিদের মনে গেঁথে আছে। এখনকার মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে এই পরিস্থিতি শোধরানো কিছুটা সহজ, কারণ তাঁর পার্টি এবং ট্রেড ইউনিয়ন তাঁরই নিয়ন্ত্রণে, যা তাঁর আগের মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রে বলা যেত না। কিন্তু বামফ্রন্ট শেষ দিকে কিছুটা পরিণত বোধ অর্জন করেছিল এবং শিল্পপতিদের মাত্র এক জন ‘ইউনিয়ন নেতা’কে সন্তুষ্ট করতে হত, আর এই জমানায় সব এলাকায় এত নেতা, আর তাদের এমন লাগাতার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, শিল্পের টিকে থাকা শক্ত।

মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা মাথায় রাখলে, এই রাজ্য কেন স্ত্রীর প্রতি অত্যাচার আর নারীপাচারে প্রথম, তা ভেবে অবাক লাগে না। নিরক্ষরতা থেকেই কি এই পাপের জন্ম? না, কারণ সাক্ষরতার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের স্থান সর্বভারতীয় গড়ের ওপরে, স্কুলছুটের সংখ্যাও কম। নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক জানাচ্ছে, নেপালি ও বাংলাদেশি নারীদের পশ্চিমবঙ্গ দিয়েই পাচার করা হয়, তাই সংখ্যাটা বেশি মনে হয়। কিন্তু এটা অজুহাত। এই বছরের মার্চ থেকে, রাজ্য এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে, এবং যেহেতু পাচারের সংখ্যা তিন হাজার (যেখানে রাজ্যে নারীর সংখ্যা সাড়ে চার কোটি), সমস্যার সমাধান অবশ্যই সম্ভব। শিশুপাচারের দুটি চক্র এ বছর জলপাইগুড়ি ও উত্তর ২৪ পরগনায় ধরা পড়েছে, তাতে প্রমাণিত হয়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যদি সতর্ক থাকেন, এ ধরনের অপরাধ কমানো যেতে পারে। স্ত্রীদের প্রতি স্বামীদের অত্যাচারের বিষয়ে আরও গভীর ভাবনা প্রয়োজন। হতেই পারে, এ রাজ্যে সচেতনতা বেশি, তাই এ ধরনের নালিশও বেশি জমা পড়ছে, যেখানে অন্য রাজ্যের মহিলারা অনেকেই চুপ করে আছেন। কিন্তু এখন জেগে ওঠার সময় এবং বোঝার সময়, পশ্চিমবঙ্গে সমাজের কাজ হবে সমাধান করা। সহ্য করা নয়।

ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য