Advertisement
E-Paper

নারী দিবস কী, জানবেন না?

সকালে পাড়ার ব্যাংকে নারীকর্মীদের সভায় ভাষণ দিয়ে শুরু করে বসন্ত বিকেলের পড়ন্ত রোদের নারীবাদী মিছিল, ‘আটই মার্চ দিচ্ছে ডাক, পিতৃতন্ত্র নিপাত যাক।’

দোলন গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৮ ০০:১০

সারা বছরের মধ্যে এই নারী দিবসের দিনটিতে দুনিয়া জুড়ে মেয়েদের খুব আদরযত্ন করা হয়। পরিবারে তাদের জন্য উপঢৌকন সাজানো হয়, আপিস-কাছারিতে মেয়েদের সে দিন খুব খাতির, জিন‌্স থেকে জামদানি সর্বত্র মেয়েদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। আমাদের, অর্থাৎ নারী আন্দোলনের কর্মীদের সে দিন বারোয়ারি সরস্বতী পুজোর পুরোহিতের দশা। সারা বছর নারী-অধিকার কর্মীদের কেউ পাত্তা দেয় না। পরিবার থেকে রাষ্ট্র— সবাই তাদের দাবিদাওয়াগুলি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়। হঠাৎ ৮ মার্চের পুণ্যতিথিতে তাদের নিয়ে টানাটানি। সকালে পাড়ার ব্যাংকে নারীকর্মীদের সভায় ভাষণ দিয়ে শুরু করে বসন্ত বিকেলের পড়ন্ত রোদের নারীবাদী মিছিল, ‘আটই মার্চ দিচ্ছে ডাক, পিতৃতন্ত্র নিপাত যাক।’

এ সব দেখেশুনে, ‘বাহ্! মেয়েদেরও তা হলে বাজারদর চড়ছে’ ভেবে, যেই না একটু আত্মতৃপ্তি, অমনি পর দিন সর্ব দর্প চূর্ণ করে ছেলের দল ঝাঁপিয়ে পড়বেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, ‘মেয়েদের জন্য একটা আস্ত গোটা দিন কেন শুনি, অ্যাঁ? ছেলেরা কি কম খেটে মরে? ছেলেরাও অত্যাচারিত, বঞ্চিত! পুরুষের জন্য কোনও দিবস নেই কেন? আমাদেরও দিবস চাই’ ইত্যাদি বলে কেঁদে-ককিয়ে একশা করবেন। ছেলেদের দোষ নেই। তাঁদের অনেকেই সম্ভবত দিনটির ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিকতা জানেন না। উদ‌্‌যাপনের ঘটায় সে ইতিহাস গিয়েছে হারিয়ে। নারী দিবস এখন হিরের দোকানে ছাড়ের উৎসব।

নারী দিবসের ইতিহাসে গোড়ার কথাটি হল, শ্রমিক নারীর কাজের সময়, ছুটি, সম্মানজনক বেতনের দাবিতে আন্দোলন। ১৮৫৭-র ৮ মার্চ আমেরিকার বস্ত্রশিল্পের নারী শ্রমিকদের কাজের সময় কমানো ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে লড়াই পশ্চিমি দুনিয়ায় আলোড়ন তোলে। পরবর্তী কালে যুক্ত হয় মেয়েদের ভোটের অধিকারের দাবি। এই সমস্ত দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে ১৯১০ সালে কোপেনহাগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মহিলা সম্মেলনে ৮ মার্চ নারী দিবস পালনের ডাক দেওয়া হয় এবং ১৯১১ থেকে তা পালন শুরু হয়। ভারতেও পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে মেয়েদের অর্থনৈতিক, সামাজিক অধিকারের দাবিতে নারী দিবস পালন শুরু হয়। এর পাশাপাশি পণ, ধর্ষণ, মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গার্হস্থ্য হিংসা, পরিবারে মেয়েদের অবস্থান ইত্যাদি বিষয় নারী আন্দোলনের দাবির অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে এবং প্রতি বছর এই সব দাবি আদায়ের আওয়াজ তোলা হয় নারী দিবসে।

কিন্তু নারী দিবস যখন মূলধারার উৎসবে পরিণত হল, রাষ্ট্র থেকে কর্পোরেট, সবাই যখন নারী দিবস নিয়ে মাতামাতি শুরু করল, তখন এই সব ‘অস্বস্তিকর’ প্রশ্নকে সরিয়ে রাখা হল। নারী দিবসের পিছনে যে মেয়েদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটি আছে, সেটি সুচতুর ভাবে আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হল, কারণ মেয়েদের সামাজিক, অর্থনৈতিক বঞ্চনা আজও কমেনি। আইন যা-ই বলুক, আজও নারী-পুরুষ সমান কাজে সমান মজুরি পায় না, মেয়েরা সম্পত্তির ভাগ চাইতে আজও কুণ্ঠা বোধ করে, সম্প্রতি আমাদের দেশে অর্থকরী কাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ পর্যন্ত কমতির দিকে। পণ, গার্হস্থ্য নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন কোনও কিছুই চোখে পড়ার মতো কমেনি। প্রসঙ্গত, যশোধরা বাগচী এবং শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্ত সম্পাদিত ‘সচেতনা এখনও’ বইটিতে গত ত্রিশ বছরের মেয়েদের জীবনের বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে এবং দেখা যাচ্ছে ত্রিশ বছর আগে যে বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজও তা প্রাসঙ্গিক।

৮ মার্চকে যে রাষ্ট্র তথা বাণিজ্যিক সংস্থারা ছোঁ মেরে হাতিয়ে নিল, তার পিছনেও একটি রাজনীতির গল্প আছে। নারী দিবস যেহেতু পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে, নির্দিষ্ট ভাবে ধনতান্ত্রিক পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধারালো আন্দোলন গড়ে তোলার দিন হিসাবে ইতিহাসে জায়গা করে নিচ্ছিল, সেই হেতু রাষ্ট্র এবং বাজার সম্মিলিত ভাবে দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য, আন্দোলনের পথ থেকে এই দিনটিকে সরিয়ে আনার জন্য কোমর বেঁধে লাগল। সুপরিকল্পিত ভাবে দমনের পথে না গিয়ে, ওই একটি দিন মেয়েদের চোখে রূপকথার কাজল পরানো শুরু হল। যে অভাগীকে রোজ ভোর পাঁচটায় উঠে বাচ্চাকে স্কুলের জন্য তৈরি করে, স্বামীর বিছানায় ধোঁয়া-ওঠা চা দিয়ে, রান্না সেরে দৌড়ে-দৌড়ে অফিস পৌঁছতে হয়, দু’দশ মিনিট দেরি হলে বসের কাছে, ‘মেয়েদের দ্বারা কিস্যু হয় না’ শুনতে হয় এবং বাড়ি ফিরেই ফের হেঁশেল ঠেলতে হয়, সেই মেয়ে যখন ৮ মার্চ ঘুম থেকে উঠে দেখেন বিজ্ঞাপনী ঢঙে স্বামী-সন্তান তাঁর জন্য প্রাতরাশ সাজিয়ে রেখেছে, অফিসে ঢোকামাত্র অফিসের বস নারীকর্মী হিসাবে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করছেন, এমনকী সন্ধেবেলার সিরিয়াল জুড়ে নারীর জয়গান গাওয়া হচ্ছে, তখন মেয়েদের চোখেও অসত্যের ঘোর লাগে, অনেক মেয়েই এই মিথ্যের বেসাতির সওয়ার হয়ে পড়েন।

তবে ধারণা এবং চেতনার অভাবটাই সব নয়। নারী দিবসের সঙ্গে নারীর অধিকারের যে সংযোগ, নারীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের যে সংযোগ এবং সর্বোপরি আজ নারীবাদের যে সংযোগ, সেটাই সম্ভবত পুরুষদের রাগিয়ে দিচ্ছে। বহু পুরুষ আছেন যাঁরা ‘নারীবাদ’ শব্দটি শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। তাঁদের কাছে নারী দিবস ‘নারীবাদীদের’ উৎসব। সত্যিই তো, পুরুষেরও দুঃখ, বঞ্চনা আছে, তাঁদেরও অফিসে বসের গাল খেতে হয়। কিন্তু একটা কথা তাঁদের বুঝতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে নারী এবং পুরুষের অনেক সমস্যা এক মনে হলেও তার ফল মেয়েদের জীবনে সব সময় বহুমাত্রিক। মেয়েদের এবং ছেলেদের অবস্থানে আজও অনেক ফারাক।

তা ছাড়া, বেশির ভাগ পুরুষের কাছেই এই বার্তা এখনও পৌঁছয়নি যে, নারীবাদ মানে নারী বনাম পুরুষের যুদ্ধ নয়। নারীবাদ ক্ষমতার সোপানতন্ত্র ভাঙতে চায়। ক্ষমতাবানের সঙ্গে ক্ষমতাহীনের লড়াই, প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে মুক্ত চিন্তার জেহাদই হল নারীবাদ। এই ক্ষমতার ভিত্তি হতে পারে লিঙ্গ, শ্রেণি, ধর্ম, জাতপাত, বর্ণ, যৌনতা, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি বিভিন্ন পরিচিতি। নারীবাদী চিন্তা অনুযায়ী, পিতৃতন্ত্রে পুরুষও বঞ্চিত হয়, পুরুষকেও অনিচ্ছা-সত্ত্বে অনেক দায়ভার গ্রহণ করতে হয়। পিতৃ-মাতৃবিয়োগে ছেলেরা প্রাণ খুলে কাঁদতে পারেন না, স্ত্রীকে সংসারের কাজে সাহায্য করলে তাদের ‘স্ত্রৈণ’ বলে খাটো করা হয়, যে ছেলে লিপস্টিক পরে পিতৃতন্ত্র তাকে ‘ছক্কা’ ডাকে। নারীবাদ পুরুষকেও পিতৃতন্ত্রের বাঁধন থেকে মুক্তি দিতে চায়। নারীবাদ সমাজ-নির্মিত পৌরুষের ধারণার বিরুদ্ধে সরব। সেই জন্যই নারী দিবস পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার দিন, পুরুষের বিরুদ্ধে নয়। নারী দিবস শুধু নারীর দিন নয়, সমস্ত পিতৃতন্ত্রবিরোধী মানুষের উৎসব।

Women's Day patriarchal society Women's Movement
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy