তিনি দু’দিকেই রয়েছেন, তাঁর ‘মানদণ্ডে’র কাঁটা কোনও দিকেই হেলে পড়েনি বোঝাতে শুক্রবার প্যালেস্তাইন রওনা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই প্রথম ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ককে দখলমুক্ত করার লড়াই ‘ইন্তিফাদা’র ধাত্রী ভূমি প্যালেস্তাইনে

ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটছে প্যালেস্তাইন সরকারি ভাবে ভারতের স্বীকৃতি পাওয়ার ৩০ বছর পর। জানুয়ারিতে সরকারি সফরে আসা ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানইয়াহুকে দিল্লিতে বুকে জড়িয়ে ধরে (যার আনুষ্ঠানিক নাম- বেয়ার হাগ) অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। আর তার ৪ সপ্তাহের মাথায় সেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন প্যালেস্তাইনের রাজধানী রামাল্লায়।

বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, এই সফরে তিনটি দেশে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। প্যালেস্তাইন, আরব আমিরশাহি এবং ওমান। দিল্লি থেকে উড়ে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রথমে নামবেন জর্ডনের রাজধানী আম্মানে। সেখান থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে প্যালেস্তাইনের রামাল্লা শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পৌছবেন একটি চপারে।

প্যালেস্তাইনের প্রেসিডেন্ট মেহমুদ আব্বাস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত বছর, দিল্লিতে। ছবি- সংগৃহীত।

সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন প্যালেস্তাইনের প্রেসিডেন্ট মেহমুদ আব্বাস। যিনি ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে বলেছেন- ‘মহান অতিথি’। গত বছর ভারত সফরে এসেছিলেন প্যালেস্তাইনের প্রেসিডেন্ট মেহমুদ আব্বাস। তার পর আরব আমিরশাহি ও ওমান সফর শেষে সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারি দি্ল্লিতে ফিরে আসবেন প্রধানমন্ত্রী।

বিদেশ মন্ত্রকের এ দিনের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্যালেস্তাইনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরকারি বৈঠকে বসার আগে এই ঐতিহাসিক সফরে প্যালেস্তাইন মুক্তি আন্দোলনের (পিএলও) প্রয়াত নেতা ইয়াসের আরাফতের স্মারক ভবনে গিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন- ভারত কি ঝুঁকছে ইজরায়েলের দিকে? বিশেষজ্ঞেরা বললেন...​

১৯৪৮ সালে প্যালেস্তাইনের দাবিকে কামান ও বন্দুকে দাবিয়ে ইজরায়েল একতরফা ভাবে নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার পর থেকেই প্যালেস্তাইনের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে এসেছে ভারত। রাষ্ট্র না হওয়া সত্ত্বেও, ১৯৭৪ সালে প্যালেস্তাইন নির্জোট দেশগুলির জোটের সদস্য হতে পেরেছিল মূলত, ভারতের জোরালো সমর্থনেই।

জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ। ছবি- সংগৃহীত।

তার পর ১৯৮৮ সালে যখন ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ককে দখলমুক্ত করার জন্য ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম বার ‘ইন্তিফাদা’ শুরু হল পিএলও নেতা ইয়াসের আরাফতের নেতৃত্বে, তখন তাকে পুরোদস্তুর সমর্থন করে গিয়েছে ভারত। ওই সময় দিল্লিতে এলে আরাফতকে সাদর অভ্যর্থনা জানান ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী।

আরও পড়ুন- জাপানি রাজকুমারীর বিয়ে স্থগিত, ‘রাজপথ’ মিশবে না ‘জনপথে’?

কিন্তু গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ইজরায়েল সফরের পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, প্যালেস্তাইনের প্রতি এত দিনের অবস্থানে কি আর থাকবে ভারত?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল আভিভ থেকে ইজরায়েলের মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ভারতের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছিল, গত এক বছরে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘সুমধুর’ হয়ে ওঠায়।

কিন্তু মোদী সরকার ভারতের পুরনো অবস্থান বদলায়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণার বিরুদ্ধে যে প্রস্তাব গৃহীত হয় রাষ্ট্রপুঞ্জে, তাতে ১২৭টি দেশের সঙ্গে ভারতও ভোট দেয় আমেরিকার বিরুদ্ধে। যা আসলে ইজরায়েলেরও বিপক্ষে যায়। কারণ, পূর্ব জেরুজালেমকে প্যালেস্তাইনের রাজধানী করার দাবি বরাবরই জানিয়ে আসছে আরব দেশগুলি। ইজরায়েল তা মানতে চায়নি বলেই ’৬৭-তে হয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ।

দিল্লি যে ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন, দুই দেশের মধ্যেই ভারসাম্য বজায় রেখে চলবে, তার জোরালো ইঙ্গিত দিতে জানুয়ারিতে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানইয়াহুর ভারত সফরের সময়েই দিল্লির তরফে ঘোষণা করা হয়, ফেব্রুয়ারিতে প্যালেস্তাইন সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।   

যুগ্ম সচিব বি বালা ভাস্কর এ দিন বলেছেন, ‘‘ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইন দু’টি দেশকেই আমরা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আমাদের পক্ষে প্রয়োজনীয় বলে মনে করি। এটাই আমাদের নীতি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সেটাই বোঝাতে চাইছেন এ বারের প্যালেস্তাইন সফরে।’’