ঘানা ম্যাচের আগে ফুটবলারদের তাগিদ কতটা অক্ষত, তা বুঝতে বুধবার সকালে লুইস নর্টন দ্য মাতোস নিজের ঘরে ডেকেছিলেন ধীরাজ সিংহদের।

সেখানে তিনি ফুটবলারদের কাছে জানতে চান, ‘পরপর দুটো ম্যাচে হেরেছি আমরা, ঘানার বিরুদ্ধে কী হবে?’ টিম হোটেলের খবর, সবাই না কি পর্তুগীজ কোচকে জানিয়ে দেন, জেতার জন্যই খেলতে চান।

সন্ধ্যায় মূল স্টেডিয়াম থেকে প্রায় বাইশ কিলোমিটার দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাগবি মাঠে যুব বিশ্বকাপের বীর যোদ্ধাদের হাঁটা চলায় তাই কোনও ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত নেই। টিমের এক নম্বর ডিফেন্ডার আনোয়ার আলি আর অধিনায়ক অমরজিৎ সিংহের চোট থাকায় তাঁরা শুধু হেঁটেছেন। বাকিরা কিন্তু অদ্ভুত রকমের চাঙ্গা।

সূর্য যখন অস্তাচলের মুখে, তখন মাতোসের গলায় পাওয়া গেল অন্যরকম তৃপ্তি। ‘‘আমি ভাবতেই পারছি না ঘানার বিরুদ্ধে ছেলেরা জেতার কথা ভাবছে। জ্যাকসনের গোলটার মতোই এটা আমার কাছে অদ্ভূত এক অনুভূতি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা। টিমের ছেলেদের এই বিশ্বাসটাই আমি তৈরি করতে চেয়েছিলাম।’’ দাড়ি কাটেননি কলম্বিয়া ম্যাচের পর থেকে। হতাশা আর আফশোসের জন্য হয়তো। জানেন দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পয়ন ঘানা এই গ্রুপের সবথেকে শক্তিশালী দল। দ্রুত ড্রিবল আর শরীরিক শক্তি দিয়ে খেলে। হারানো কঠিন। ঘানার ইমানুয়েল টোকু আর ইব্রাহিম সাদিক যে কোনও টিমের রক্ষণকে দুমড়ে মুচড়ে দিতে পারে মূহূর্তে। তা সত্ত্বেও স্বপ্ন দেখছেন মাতোস। কলম্বিয়া ম্যাচ তাঁর এবং টিমের বিশ্বাস যেন বাড়িয়ে দিয়েছে এক ধাক্কায়।

কিন্তু পাও কোসি ফাবিনের টিম তো খোঁচা খাওয়া বাঘ। ভারতকে না হারাতে পারলে টুনার্মেন্ট থেকে ছিটকে যেতে পারে ঘানা। এই অবস্থাতেও মাতোসের মুখ থেকে বেরোয়, ‘‘ঘানার শক্তি জানি। তা সত্ত্বেও ছেলেরা তো দুশো ভাগ দিতে তৈরি। আমার টিমে আমার মতো লম্বা ফুটবলার নেই ঠিক। ইচ্ছা শক্তি আছে। যা অনেক কিছু ঢেকে দিতে পারে। একটাই অসুবিধা ঘানার সঙ্গে আমরা কখনও খেলিনি।’’

গ্রুপের যা পরিস্থিতি তাতে ঘানার বিরুদ্ধে জিতলেও বরিস সিংহ, অভিজিৎ সরকার, রহিম আলিদের পরের পর্বে যেতে অনেক রকম অঙ্ক মিলতে হবে। তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণও চলছে। সেই ভাবনাকে সামনে রেখেই আপাতত ফোকাস ঠিক রাখতে চাইছে মাতোসের দল। ‘‘আমাদের একমাত্র মোটিভেশন হল পরের ম্যাচ। ছেলেরা একটা গৌরবজনক অধ্যায় তৈরি করে টুর্নামেন্ট শেষ করতে চায়।’’

কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে লম্বা ফুটবলার নামিয়ে চমক দিয়েছিলেন ভারতের কোচ। কঠিন লড়াইয়ে ফেলেছিলেন তাদের। কথা বলে মনে হল, টক্কর দিতে ঘানার বিরুদ্ধে  কোমল থাটাল, রহিম আলিদের মতো গাট্টাগোট্টা ফুটবলারকে নিয়ে নতুন স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে চাইছেন মতোস। যাতে বিপদে পড়ে ফাবিনোর টিম। দলে যে কিছু বদল হবে সেটা বলেও দিয়েছেন তিনি। 

বিশাল চেহারার ঘানা কোচ ফাবিন টিমের সঙ্গে রয়েছেন প্রায় আ়ড়াই বছর। তাঁর সেরা অস্ত্র সেখানকার চারটি অ্যাকাডেমির ছাত্ররা। কিন্তু যুক্তরাস্ট্রের কাছে হারের পর তিনিও কী চাপে? হতে পরে আরোপিত, বিপক্ষকে আত্মতুষ্ট করার কৌশল। ঘটনা যাই হোক ফাবিন কিন্তু বলে দিয়েছেন, ‘‘আমাদের গ্রুপে ভারত একমাত্র দল যারা টিম গেম খেলছে, তাদের কোনও তারকা নেই। ওরা তো কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে জিততেও পারত। তাই সমীহ করছি।’’ ভারতীয় দলের কিপার ধীরাজ সিংহ এবং স্টপার আনোয়ার আলির ভূয়সী প্রশংসাও করেন ঘানার অত্যন্ত জনপ্রিয় কোচ।

তা শুনেই কী মাতোস খানিকটা হলেও নস্টালজিক? ‘‘আমার একটা দর্শন আছে। তা হল প্রত্যেকটা জয় থেকে যেমন শিক্ষা পাওয়া যায়, তেমন হার থেকেও অনেক কিছু ধরা পড়ে।’’ পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য, ‘‘এই যে পর্তুগাল বিশ্বকাপের মূলপর্বে উঠেছে এটা একদিনে হয়নি। তিরিশ বছর ধরে একটা প্রক্রিয়া চলছে সেটার ফল ফলছে। ভারতে তো এটা সবে শুরু হল।’’

মাতোসকে এ দিন প্রশ্ন করা হয় গোলকিপার ধীরাজ সিংহের পারফরম্যান্স নিয়ে? ‘‘গোলকিপার টিমের অন্যতম অঙ্গ। চেলসি, জুভেন্তাস, ম্যাঞ্চেস্টার যখন খেলতে নামে, তখন এটা ভেবে নামে যে পিছনে একজন সেরা কিপার আছে। ভারতের টিম সেই স্বাদ পাচ্ছে।’’ ভারতীয় দলের চিফ কোচ কোচ স্বীকার করে নেন, জ্যাকসনের গোলটা তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অনুভূতি।  অভাবনীয় এবং অবিশ্বাস্য কিছু না ঘটলে ভারতের ঐতিহাসিক যুব বিশ্বকাপ অভিযান আজ বৃহস্পতিবারই শেষ হয়ে যবে। এরপর কী? মাতোস বলে দেন, ‘‘পর্তুগালের বিশ্বকাপে যাওয়ার ছড়পত্রের মতো আমরাও পেতে পারি এই আশা নিয়ে আজ আমি এবং আমার টিম ঘুমোতে যাব।’’ চশমা পড়া পর্তুগীজ কোচকে সেই মূহূর্তে দেখে মনে হয় লোকটা সত্যিই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।