পছন্দের সংস্থাকে বরাত পাইয়ে দিতে হবে। তাই অর্থবিধির ব্যাপারে ‘নমনীয়’ হওয়ার জন্য অধীনস্থ এক আমলাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী অমিত মিত্র। কিন্তু সেই আমলা দৃঢ় ভাবে আপত্তি করায় মুখ পুড়েছে অমিতবাবুর। নবান্ন সূত্রের খবর, নিজের অফিসারেরই কাছে ধাক্কা খেয়ে শেষে নিয়ম মেনে ফের দরপত্র চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

তিনি কৃষ্ণ গুপ্ত। শিল্পোন্নয়ন নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের কোন অনিয়ম আটকালেন কৃষ্ণবাবু?

সরকারি উদ্যোগে আগামী ৬ থেকে ৮ জানুয়ারি কলকাতায় বসছে ‘গ্লোবাল বেঙ্গল ইনভেস্টমেন্ট সামিট’, বেঙ্গল লিডস-এর আসর। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘বিশ্ব বাংলা সম্মেলন’। আগে তিন বার নিষ্ফলা চেষ্টার পরে এটি মমতার চতুর্থ শিল্প সম্মেলন। এ বারের সম্মেলনস্থল রাজারহাটের প্রকৃতি তীর্থ, সল্টলেকের হেলিপ্যাড ময়দান ও বাইপাসের এক পাঁচতারা হোটেল।

এই সম্মেলনের জন্য ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা বাছাই করতে গত মাসের মাঝামাঝি বিজ্ঞাপন দিয়ে দরপত্র চায় রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগম। নিগম সূত্রের খবর, প্রাথমিক ভাবে তিনটি সংস্থাকে বাছাই করা হয়। তিন দিনের সম্মেলন আয়োজন এবং প্রায় পাঁচ হাজার প্রতিনিধি-অতিথির থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য ৮০ লক্ষ টাকা দর দেয় কলকাতার একটি সংস্থা। এটাই সর্বনিম্ন দরপত্র। বাকি দু’টি সংস্থা এর তিন এবং চার গুণ দর দিয়েছিল।

নিগমের খবর, অর্থবিধি অনুযায়ী সর্বনিম্ন দর দেওয়া সংস্থাকেই বরাত দেওয়ার কথা। ফলে কলকাতার ওই সংস্থার নামই চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু এই বাছাইয়ে সায় ছিল না নবান্নের শীর্ষ মহলের। তারা ওই সংস্থার উপরে চাপ দিতে শুরু করে। নিগমের এক কর্তার কথায়, “পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, বরাত পেয়েও কাজ করবে না বলে জানায় সংস্থাটি।” ওই সংস্থার কোনও কর্তা অবশ্য এ নিয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।

বরাত পাওয়া সংস্থাটি সরে দাঁড়ানোর পরে প্রাথমিক ভাবে বাছাই হওয়া দু’টি সংস্থার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা সর্বনিম্ন দরে কাজ করতে রাজি কি না। কিন্তু কোনও সংস্থাই সাড়া দেয়নি।

তখন আসরে নামেন অমিতবাবু। নিগমের কর্তাদের ডেকে পাঠিয়ে তিনি নির্দেশের সুরে অনুরোধ করেন, ‘আপনারা নিয়মে আটকে না-থেকে একটু নমনীয় হোন।’ যে সংস্থাটি তিন কোটি টাকা, অর্থাৎ সর্বোচ্চ দর দিয়েছে, তাদেরই কাজটা দেওয়ার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।

অমিতবাবুর পরামর্শের পিছনে যে সম্ভবত খোদ মুখ্যমন্ত্রীর অনুমোদন রয়েছে, তা বুঝতে বাকি ছিল না নিগমের কর্তাদের। কেননা, মুম্বইয়ের শিল্প সম্মেলনে মুকেশ অম্বানীকে হাজির করতে পারার পরে মমতার খাতায় অমিতবাবুর নম্বর অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে তাঁকে শিল্প দফতরেরও ভার দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মন্ত্রিসভায় পার্থবাবু বা সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো দুঁদে রাজনৈতিক নেতারা থাকলেও কাজকর্মের জন্য এই ‘কর্পোরেট’ মন্ত্রীর উপরেই বেশি নির্ভর করেন তিনি। আর বিশ্ব বাংলা সম্মেলন তো একান্ত ভাবে মমতারই মস্তিষ্কপ্রসূত।

এত কিছু জেনেও অমিতবাবুর পরামর্শ সপাটে ফিরিয়ে দেন কৃষ্ণ গুপ্ত। তিনি অর্থমন্ত্রীকে জানিয়ে দেন, নিয়ম মোতাবেক কোনও কাজের জন্য সর্বনিম্ন দরের চেয়ে বেশি টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। সে কাজ অন্তত তিনি করতে পারবেন না। বরাত পাওয়া সংস্থা যখন কাজ করতে চাইছে না এবং বাছাই করা দু’টি সংস্থার কেউই ওই দরে কাজ করতে রাজি নয়, তখন নতুন করে দরপত্র চাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

নিগমের খবর, কৃষ্ণ গুপ্তর কাছ থেকে মুখের উপর জবাব পেয়ে আর কথা বাড়াননি অর্থমন্ত্রী। দরপত্রের ফাইলটা তিনি নিজের কাছেই রেখে দেন। এবং শেষমেশ নিয়ম মেনে টেন্ডারটাই বাতিল করে দিতে বাধ্য হন অমিতবাবু। নবান্নের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, “গাল বাড়িয়ে থাপ্পড় খাওয়া বোধহয় একেই বলে।” এ বার নতুন করে দরপত্র চেয়ে ফের সংস্থা বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে বলে নবান্নের খবর।

এই নিয়ে অর্থমন্ত্রী যথারীতি ফোন ধরেননি। এসএমএসের জবাব দেননি। কৃষ্ণ গুপ্তও মন্তব্য করতে চাননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী কাজ করলে নিগম কর্তাদের চাকরি যেত। জবাবদিহি করতে হতো সিএজি-র কাছেও।

অভিযোগ, অর্থমন্ত্রী যে সংস্থাকে শিল্পোন্নয়ন নিগমের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য সওয়াল করেছিলেন, সেই একই সংস্থাকে নিয়ম ভেঙে তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের কাজ পাইয়ে দিতে চেয়েছিল নবান্নের শীর্ষ মহল। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এই দফতরের দায়িত্বে। আর এ ক্ষেত্রেও বাধা আর এক আমলা। তথ্য-সংস্কৃতি সচিব অত্রি ভট্টাচার্য।

সরকারি কাজের প্রচার চালানোর পরিকল্পনা তৈরির জন্য লোকসভা ভোটে তৃণমূল প্রার্থী, গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে মাথায় রেখে একটি কমিটি গড়েছেন মমতা। তাতে রাখা হয়েছে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতাকেও। যাঁর হাতে থাকা লেক মলকে নিয়মবিরুদ্ধ ভাবে কর ছাড় দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কলকাতা পুরসভা। যাঁর সংস্থায় কর ফাঁকি ধরার জন্য অভিযান চালিয়েও নবান্নের শীর্ষ মহলের নির্দেশে মাঝ পথে ফিরে আসতে হয়েছিল অর্থ দফতরের আধিকারিকদের। প্রচার-সংস্থাবাছাইয়ের জন্য যে টেন্ডার কমিটি গড়েছেন মমতা, তাতেও আছেন ইন্দ্রনীল এবং শ্রীকান্ত। নজিরবিহীন ভাবে এই দুই কমিটিতেই তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের কর্তারা রয়েছেন এঁদের অধীনে। 

দফতর সূত্রে খবর, প্রচার-সংস্থা বাছাইয়ের জন্য টেন্ডার কমিটি দরপত্র খোলার আগেই ওই বিশেষ সংস্থাকে কাজ পাইয়ে দিতে নবান্নের শীর্ষ মহল থেকে চাপ দেওয়া শুরু হয়। এটা জানতে পেরে বেঁকে বসেন অত্রিবাবু। দরপত্রে প্রচার কাজের বিবরণ এবং লক্ষ্য ঠিক ভাবে বলা নেই এই কারণ দেখিয়ে গত ১৬ নভেম্বর দরপত্র বাতিল করে দেন তিনি। এ জন্য অত্রিবাবুর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে অনেকে নালিশ করেন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। অত্রিবাবু কিন্তু অনড়। তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের কর্তাদের বক্তব্য, পুরনো দরপত্র তো বাতিল করা হয়েছেই, নির্দিষ্ট ভাবে নিয়ম-নীতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে দরপত্র চেয়ে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হবে না।

টেন্ডার কমিটির চেয়ারম্যান ইন্দ্রনীল সেনের অবশ্য দাবি, “আমি কমিটির বৈঠকে যাইনি, কোথাও সই-ও করিনি। ফলে কী হয়েছে বলতে পারব না।” কিন্তু কমিটির চেয়ারম্যান হয়েও তিনি কিছু জানেন না কেন? ইন্দ্রনীলের জবাব, “কী ভাবে প্রচার-সংস্থা বাছাই হবে, তার মধ্যে আমি থাকতে চাই না। কমিটির বাকি সদস্যরাই এই কাজ করবেন।”

অনেকের মতে, বাকি সদস্য বলতে শ্রীকান্তকে বোঝাতে চেয়েছেন ইন্দ্রনীল। শ্রীকান্তের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএসের জবাব দেননি। 

আর যাঁকে ঘিরে এই চাঞ্চল্য, সেই অত্রিবাবুর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, “সব ঠিকই চলছে।” অত্রিবাবুর ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন বিচারপতি, বাবা ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল। এ হেন পারিবারিক ঐতিহ্যের মানুষকে চাপ দিয়ে নিয়মবিরুদ্ধ কাজ করানো যাবে না। সে জন্য যদি তাঁকে স্টেট গেজেটিয়ারের সম্পাদক পদে বদলি করা হয় তাতেও তাঁর আপত্তি নেই।

তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের এক অফিসার জানান, মুখ্যমন্ত্রীর মর্জি মেনে কাজ করতে আপত্তি করায় বছর দেড়েক আগে তৎকালীন তথ্য-সংস্কৃতি সচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে স্টেট গেজেটিয়ারের সম্পাদক পদে বদলি করে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় গোড়ার দিকে তাঁকে সরকারি গাড়ি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এখন তিনি সুন্দরবন উন্নয়ন দফতরের সচিব। নবান্নের শীর্ষ মহলের ইচ্ছার বিরোধিতা করার জের হিসেবে অত্রিবাবুকেও তথ্যসচিবের পদ থেকে সরানো হতে পারে বলে প্রশাসনিক মহলে গুঞ্জন।

নবান্ন সূত্রের খবর, সম্প্রতি বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে অত্রিবাবুর সঙ্গে সরকারের শীর্ষ মহলের খিটিমিটি চলছিল। যেমন, এখন সরকারি বিজ্ঞাপন বানায় একটি বেসরকারি সংস্থা। কোন সংবাদমাধ্যমে কী ভাবে বিজ্ঞাপন যাবে তাও ঠিক করে ওই সংস্থাই। অথচ এই সংক্রান্ত সরকারি আদেশনামা নেই। এ নিয়েই অত্রিবাবু নানা ভাবে সরকারকে সতর্ক করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। বরং উষ্মা বেড়েছে শীর্ষ মহলের।