বহু অপরাধের কিনারার পিছনে রয়েছে তাঁর হাতযশ। বহু ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’-কে চেনানোয় রয়েছে ভূমিকা। তবে তিনি পুলিশ বা গোয়েন্দা নন। পুলিশের কোনও সূত্র বা চর-ও নন। তিনি এক জন শিল্পী। পোর্ট্রেট পার্লে-র দক্ষ আঁকিয়ে। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা শুনে ঝটপট এঁকে ফেলতে পারেন সন্দেহভাজনের মুখাবয়বের ছবি। সেই ছবি ধরে এগিয়ে এই রাজ্য তো বটেই, ভিন্‌ রাজ্যের পুলিশ, সিবিআই, আধা সামরিক বাহিনী এবং সেনা গোয়েন্দারা রহস্যের জট খুলতে পেরেছেন। অথচ তাঁরই এখন চরম দুর্দশা। তীব্র অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন ওই শিল্পী, বেলুড়ের বাসিন্দা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।

পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে রামলোচন সায়র স্ট্রিটে দেবাশিসবাবুর এক চিলতে দরমার ঘরে টালির চালের ফাঁক দিয়ে ঢুকছে সূর্যের আলো। বর্ষায় ভরসা প্লাস্টিকের চাদর। পরিবারের কারও অসুখ হলে হাত পাততে হয় অন্যের কাছে।

সময়ে সময়ে দেবাশিসবাবুর সাহায্য পেয়ে পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী ও সেনাকর্তারা তাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন, দরাজ প্রশংসা করেছেন, আদর-আপ্যায়ন করেছেন, শংসাপত্র দিয়েছেন, কাজ পিছু পারিশ্রমিক দিয়েছেন, অর্থের বিনিময়ে প্রশিক্ষণ দিতে ডেকেছেন— এ সবই ঠিক। তবে গত শতাব্দীর নয়ের দশক থেকে এই কাজ করে এলেও আজ পর্যন্ত চাকরি পাননি ওই শিল্পী।

তা ছাড়া, এখন নিত্যনতুন প্রযুক্তিতে সন্দেহভাজনদের পোর্ট্রেট পার্লে আঁকানোর কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে তাঁর কাজ কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। দেবাশিসবাবুর কাছেই কাজ শিখে বেশ কয়েক জন শিল্পী এখন স্থায়ী চাকরি পেয়ে টাকা রোজগার করছেন। বেলুড়ের প্রবীণ শিল্পীর অভিমান, ‘‘আজ বোধহয় আমাকে আর কারও মনে নেই।’’

বহু সময়ে দেবাশিসবাবু কিন্তু তাঁর কাজের প্রশংসা পেয়েছেন রাজ্য পুলিশের বর্তমান ডিজি সুরজিৎ করপুরকায়স্থ, কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার, বর্তমানে এডিজি (প্রশিক্ষণ) সৌমেন মিত্রের মতো আইপিএস অফিসারদের কাছ থেকে। অসম ও বিহারের তাব়়ড় পুলিশকর্তা, ফোর্ট উইলিয়ামের সেনা অফিসারদের কাজেও সহায়তা করেছেন এই শিল্পী।

সল্টলেকের কলেজছাত্রী রোমা ঝাওয়ার অপহরণ, অসমে সরকারি ইঞ্জিনিয়ার হত্যাকা‌ণ্ড, জয়পুরে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন জঙ্গি গোষ্ঠীর ঘটানো বিস্ফোরণের তদন্তে অগ্রগতির পিছনে বেলুড়ের শিল্পী দেবাশিসবাবুর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা পুলিশ ও গোয়েন্দা অফিসারেরা একবাক্যে স্বীকার করেন। একদা ‘জঙ্গলমহলের ত্রাস’ মাওবাদী জাগরী বাস্কে, গুরুচরণ কিস্কু, মঙ্গল মুর্মুদের ফোটোগ্রাফ পুলিশের হাতে আসার আগেই প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা শুনে দেবাশিসবাবু তাঁদের ছবি এঁকেছিলেন। শিল্পীর সাফল্যের টুপিতে রয়েছে অসংখ্য পালক। কলকাতায় আমেরিকান সেন্টারের সামনে জঙ্গি হামলা, খাদিম-কর্তা অপহরণ, অরুণাচল প্রদেশে সাংসদ খুন, সিঙ্গুরে তাপসী মালিক হত্যাকাণ্ড, অসমের বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণের তদন্তে ছবি এঁকে কার্যকর ভূমিকা নেন তিনি।

বেলুড়ের ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের ঘুপচি ঘরে কম্পিউটার নিয়েই সারাক্ষণ নাড়াচাড়া। আগে হাতে আঁকতেন, এখন কম্পিউটারে। পাশে থাকা মোবাইল বেজে উঠলে ধরার পর বেশির ভাগ সময়ে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘‘স্যার... স্যার... ইয়েস স্যার’’! জুনিয়র পুলিশকর্মী যে ভাবে সিনিয়রকে সম্বোধন করেন। পুলিশের সঙ্গে এত ওঠাবসা, মেলামেশার সুবাদে তাঁদের আপনজন হয়েছেন। তবু পুলিশ বা আধা
সামরিক বাহিনীর এক জন হয়ে উঠতে পারেননি দেবাশিসবাবু।

বছর পাঁচেক আগে শ্লীলতাহানি থেকে বাঁচতে এক তরুণী চলন্ত ট্রেন থেকে বেলুড় স্টেশনের কাছে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। দেবাশিসের আঁকা ছবির সাহায্যেই অভিযুক্তকে ধরে রেল পুলিশ। দেবাশিসবাবু জানান, সেই সময়ে ওই তরুণীর দাদার মোবাইলে ফোন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন মুখ্যমন্ত্রী দেবাশিসবাবুকে যে কোনও প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তা হলে? দেবাশিসবাবু বলেন, ‘‘আমি নগণ্য শিল্পী। তাই ওঁর কাছে পৌঁছতে পারিনি।’’

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের প্রশংসা রাজ্যের যে সব পুলিশকর্তা করেন, তাঁদের এক জন ওই শিল্পীর এখনকার অবস্থা শুনে বললেন, ‘‘সে কী! দেবাশিস ভাল মানুষ, যথেষ্ট কাজের। এখনও চাকরি পায়নি জেনে অবাক লাগছে। দেখছি, কী করা যায় ওর জন্য।’’ শিল্পী দেবাশিস বলেন, ‘‘আমি সাহায্য চাইছি না। আমি আমার কাজের স্বীকৃতি চাইছি। আর আগামী প্রজন্মকে ভাল কিছু শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’’