অনেক ক্ষেত্রে দরপত্রে কম দর হাঁকিয়ে বরাত পাওয়ার পরে আর কাজেই নামেননি ঠিকাদার। কেউ কেউ আবার কাজ শুরু করার পরে হিসেব কষে ক্ষতির ভয়ে পিঠটান দিয়েছেন প্রকল্পের মাঝপথে। ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে রাস্তা বা সেতু তৈরির কাজ। ঠিকাদারদের উপরে আরও বেশি আর্থিক দায় চাপিয়ে তাঁদের এই পলায়ন-প্রবণতা রুখতে চাইছে রাজ্যের পূর্ত দফতর।

পূর্তকর্তাদের একাংশ চান, দরপত্র জমা দেওয়ার সময় ঠিকাদারকে ‘পারফরম্যান্স সিকিওরিটি’ হিসেবে প্রকল্প-মূল্যের পাঁচ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা গচ্ছিত রাখতে বাধ্য করুক সরকার। কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তা সরকারের ঘরে জমা থাকবে। কাজ শেষ না-করলে বা কাজ ফেলে পালালে সেই গচ্ছিত অর্থ খোয়াতে হবে। পূর্তকর্তারা মনে করছেন, এই নিয়ম চালু হলে ঠিকাদারের কাজ শেষ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। প্রকল্প রূপায়ণ নিশ্চিত করা যাবে। কেননা নিজেদের জমা রাখা টাকাই তখন হয়ে দাঁড়াবে ঠিকাদারদের মোক্ষম বেড়ি। লাভের টাকা ছাড়াও গচ্ছিত টাকা উদ্ধারের তাগিদও কাজ শেষ করতে বাধ্য করবে তাঁদের।

নবান্নের এক কর্তা বলেন, ‘‘এখন দরপত্র জমা দেওয়া সময় ‘আর্নেস্ট মানি’ হিসেবে প্রকল্প-মূল্যের দুই শতাংশ টাকা সরকারের ঘরে জমা রাখতে হয়। এর ফলে মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দিলেও ঠিকাদারের খুব একটা ক্ষতি হয় না। অনেকে আবার দরপত্রের প্রক্রিয়া ভন্ডুল করতে অস্বাভাবিক কম দরে টেন্ডার জমা দেন। এ-সব রুখতেই গচ্ছিত টাকার পরিমাণ বাড়ানোর কথা চলছে।’’ বেশি টাকা জমা রেখে এই ধরনের অপপ্রয়াস ঠেকানো যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় দুই শতাংশ আর্নেস্ট মানি রেখেই পাঁচ শতাংশ পারফরম্যান্স সিকিওরিটি চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় পূর্ত মন্ত্রকে এই নিয়ম চালু আছে।

কিন্তু জমা টাকার অঙ্ক বাড়িয়েও লাভ কতটা হবে, তা নিয়ে সন্দিহান ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, ছোটখাটো কাজ বাদ দিলে রাস্তা, সেতু বা ভবন তৈরির বরাত দিতে গত কয়েক বছরে বহু ক্ষেত্রে একাধিক বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এমনও হয়েছে, দু’মাস অপেক্ষা করার পরে কোনও ঠিকাদার সাড়া না-দেওয়ায় প্রকল্প-মূল্য কমিয়ে ফের দরপত্র ডাকা হয়েছে। এর পরে যদি গচ্ছিত টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয়, তা হলে আদৌ ঠিকাদার মিলবে কি না— সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

পূর্ত সূত্রের খবর, গত বছর পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তার কাজ শুরুর সাত মাসের মাথায় ঠিকাদার হাত গুটিয়ে নেন। সরকার কৈফিয়ত তলব করলে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ঠিকাদার জানান, দরপত্রে তিনি কম দর দিয়েছিলেন। ফলে কাজ করলে তাঁর লাভ তো হবেই না, উল্টে ক্ষতি বাড়বে। সম্প্রতি হাসনাবাদে একটি সেতুর সংযোগকারী রাস্তা তৈরির বরাত পাওয়া এক ঠিকাদার নিয়োগকারী সংস্থাকে জানান, ব্যাঙ্ক ঋণ দিচ্ছে না। তাই তাঁর পক্ষে আর কোনও মতেই কাজে এগোনো সম্ভব নয়। বাধ্য হয়েই পূর্ত দফতরকে নতুন করে ঠিকাদার খুঁজতে হয়েছে।

কাজের বরাত পাওয়ার জন্য সংস্থার পক্ষে ভুয়ো শংসাপত্র পেশ করলে কিংবা দরপত্রে ভুল তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে— ২০১৫ সালে এই মর্মে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল পূর্ত দফতর। তার ভিত্তিতে ইঞ্জিনিয়ারিং-ইন-চিফকে মাথায় রেখে একটি কমিটিও তৈরি করা হয়। ‘‘কমিটির কড়াকড়িতে ভুল তথ্য দেওয়ার প্রবণতা কমছে। আশা করা হচ্ছে, ‘পারফরম্যান্স সিকিওরিটি’ জমা রাখতে হলে সেটা আরও কমবে,’’ বলছেন এক পূর্তকর্তা।