নির্ধারিত সময়ে রূপম ইসলামের সাউথ এন্ড পার্কের বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল পায়ের শুশ্রূষায় ব্যস্ত গায়ক। জানা গেল, সম্প্রতি একটি স্টেজ শোয়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। সেই অবস্থাতেও পুরোদমে শো করছেন তিনি। মনে করেন, মানুষের সমর্থনই তাঁর কাজের মোটিভেশন। যা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। সেই প্রসঙ্গেই শুরু হল সাক্ষাৎকার।

 

প্র: ২০ বছরে পা দেওয়ার পরেও ‘ফসিলস’ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছেই...

উ: হ্যাঁ। সেই জন্যই তো ইউটিউবের ন্যাশনাল ট্রেন্ডিংয়ে দু’নম্বরে পৌঁছতে পেরেছি। আমাদের জোরালো উপস্থিতির একটাই কারণ— ক্রমাগত গান তৈরি করা। ‘ফসিলস’-এর শো কিংবা ‘রূপম একক’— দু’ধরনের অনুষ্ঠানেই দর্শকের সঙ্গে আমি কানেক্ট করতে পারছি। সিডি তৈরি থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে যখন যেতে হল, সময় নিয়েছিলাম। তবে এখন প্রতি বছরই নতুন নতুন অ্যালবাম পাবেন শ্রোতারা। ভ্যালেন্টাইনস ডে-তেই বিশেষ গান ‘আমি তোমায় ভালবাসি’ মুক্তি পাবে। পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম রিলিজ হবে নববর্ষে। বছরের শেষে মুক্তি পাবে ‘ফসিলস সিক্স’। এখন থেকে প্রতি বছর দুটো করে অ্যালবাম রিলিজ করব। একক অনুষ্ঠানে অপ্রকাশিত গানগুলো গাওয়ার ফলে মুক্তির আগেই ‘মহানগরের কিনারে’, ‘আমি যাই’, ‘পাগল’-এর মতো আমার অনেক গানই জনপ্রিয়তার শিখরে। 

প্র: স্বতন্ত্র কৌশলই কি আপনাদের সাফল্যের চাবিকাঠি?

উ: প্রচারে নয়, প্রতিভায় বিশ্বাস করি। আপনি যদি ফসিলসের কাজের উৎকর্ষ মেনে নিয়ে কৌশলের কথা বলেন, তা হলে মেনে নিতে রাজি। আমার কাছে কৌশলের গুরুত্ব শুধুমাত্র বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য। আমার ভাল গানের অন্ত নেই। তাই সেগুলো প্রকাশের উপযুক্ত সময় নির্বাচনটাই হল কৌশল। অপেক্ষা করি, কোন সময়ে সঠিক যন্ত্রানুসঙ্গে পৌঁছতে পারব। কাজেই কৌশলের চেয়েও অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ‘ফসিলস’-এর বাড়তি সুবিধা হল, আমার গান লেখার ক্ষমতা। আমি হলাম গান লেখার মেশিন।

প্র: নিজেকে গীতিকার মনে করেন না কি কবি?

উ: আমার মধ্যে অবশ্যই কবিত্ব রয়েছে। কিন্তু আমার সৃষ্টি কবিতা নয়, গান। আমি লিখি, কম্পোজ করি, গানও গাই। তবে আমার ব্যান্ডের সদস্যরা ভীষণ খুঁতখুতে। সেটাই আমাদের উৎকর্ষ বাড়িয়েছে।

প্র: আপনার সমালোচক কে?

উ: আমি ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। কারণ, গান রিলিজের আগে পর্যন্ত নিজের ত্রুটি খুঁজি। অনেক বদল করি। আসলে কোনও গানের যথার্থ ইমপ্যাক্ট তৈরি না হলে মুক্তির জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয়।

প্র: তার মানে আপনি সময়ে বিশ্বাসী?

উ: কিছুটা। আমার প্রথম অ্যালবাম শুরুর দিকে না চললেও ‘ফসিলস’ বেরোনোর পরে জনপ্রিয়তার জন্য নির্মাতারা সেটা নতুন ভাবে রিলিজ করতে বাধ্য হয়েছিল। এখন শুনি, সেই অ্যালবাম বিক্রির নিরিখেও নজির তৈরি করেছে। হয়তো আমি সময়ের দিক থেকে এগিয়ে ছিলাম।

আরও পড়ুন: ওয়ারিনার এই ভিডিও দেখলে সলমনের মতো আপনিও বলবেন, ‘লড়কি মিল গয়ি’!

প্র: ফসিলসের শোয়েও তো আপনি খুবই এনার্জেটিক...

উ: এর উৎস ফসিলসের সঙ্গীরা। ওরা যে এনার্জিটা তৈরি করছে তার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে হবে তো! তবে নিজের কথাও বলা উচিত। আমার গানের ছত্রে ছত্রে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে বেঁচে থাকার এনার্জি। সেটা বের করা আনার দায়িত্ব তো একজন পারফর্মারের। সে দিক থেকে গায়ক রূপম প্রতিষ্ঠা দেয় সং রাইটার রূপমকে।

প্র: কিন্তু একক অনুষ্ঠানে তো আপনি একেবারে শান্ত...

উ: হ্যাঁ। ওখানে যন্ত্রসংগীতের মূর্চ্ছনা ফসিলসের মতো বিধ্বংসী নয়। আসলে ফসিলস হল আমার বহির্চেতনা। কিন্তু একক অভ্যন্তরীণ। 

প্র: ৪৫ বছর বয়সে পা দিলেন। বয়স বাড়ার কারণে কখনও ভয় হয় না?

উ: না। মিক জ্যাগার, ব্রুস স্প্রিংস্টিন তো এই বয়সেও স্বমহিমায় পারফর্ম করছেন। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতেও বুম্বাদা রয়েছেন। এঁরাই আমার অনুপ্রেরণা। তা ছাড়া আমি তো খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন করি। নিয়মিত শারীরচর্চাও করি।

প্র: নিন্দুকেরা বলেন, আপনি নাকি আত্মমগ্ন, অহংকারী...

উ: সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার সুবাদে আমি নির্মোহ ভাবে সত্যি কথা বলি। সত্যি কথা অনেকেই হজম করতে পারেন না। এটা ঠিক, পারফরম্যান্সের সময় মনে করি, আমিই শ্রেষ্ঠ। এটা না ভাবলে তো নিজের সেরাটা দিতে পারব না। তার পরেই আমি চলে আসি শিক্ষার্থীর মুডে। স্টলওয়র্টদের গান শুনি। নিজে নিজে ইউটিউব দেখে গিটার, পিয়ানো, মাউথঅর্গ্যান, ইউকুলেলে শিখেছি। আত্মমগ্ন হলে এগুলো পারতাম? আমার গানে আছে ‘আমি অতুলনীয়’। এর মানে হল, কারও সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়।

প্র: এ বার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। কাজের ব্যস্ততায় ছেলে রূপকে তো সে ভাবে সময় দিতে পারেন না...

উ: এটাই আমার সবচেয়ে অসহায়তার জায়গা। রূপ এখন সেন্ট জেমসে ক্লাস টু-তে পড়ে। ওর সঙ্গে আমার শেডিউল মেলে না। তাই মুখিয়ে থাকি, কবে ওকে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারব। তবে বাবা এবং সম্পর্ক নিয়ে অনেক গান লিখেছি। কারণ, ওকে আমি মিস করি। আবার
খুব ভালবাসিও। ছেলেকে ভালবাসার মাধ্যমে আমার বাবাকেও নতুন করে ভালবাসতে পেরেছি।