অন্তঃপুরের কথা শুনলেই যাদের জিভে জল এসে যায় তাদের জিভে জল স্বাগতম্। কারণ এ বইটি সব পাঠকের জন্য লেখা নিশ্চয়ই, তবু সাধারণ (হিন্দু) বাঙালি পাঠকের কাছে এক প্রান্তিক, অর্থাৎ মুসলমান অন্তঃপুরের কথা, শুধু মুসলমান অন্তঃপুরের নয়, সেই সুদূর সিলেটের কিছুটা গ্রামীণ মুসলমান অন্তঃপুরের কথা। ‘জিভে জল’ স্বাগতম্ এই জন্যে যে, এ হল ওই বিশেষ প্রতিবেশের মুসলমান অন্তঃপুরের রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়ার কথা, যে কথা পড়ে কারও জিভে জল না এলে এই চমৎকার বইটি দুঃখিত ও অপমানিত বোধ করবে। লেখিকা সিলেটের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, বহু দিন কলকাতার বাসিন্দা হয়ে আছেন, কিন্তু সিলেটের গ্রাম ও পিতৃকুলের জীবন ও রসনাবিলাসকে তিনি স্মৃতিতে অতিশয় মমতা নিয়ে বহন করে চলেছেন। এ বইটি সেই স্বাদু স্মৃতিকণ্ডূয়ন, ‘পদ’-এর রন্ধনশালার অর্থ ধরে ‘স্বাদু স্বাদু পদে পদে’ও বলা যায়। তাই এই বইটি খাদ্যপ্রেমী, কিছুটা সংস্কারহীন হিন্দু বাঙালি পাঠকের (সে রকম কিছু এই বাজারেও আছে আশা করি) কাছে রান্নাঘরের আশেপাশে ছোঁক ছোঁক করার এক নতুন আমন্ত্রণ তুলে ধরবে। এই সাধারণ নির্বাচনের মুহূর্তে ‘হিন্দু’ কথাটা বার বার উচ্চারণ করতে ভাল লাগে না, কিন্তু আমাদের পাঠকদের সীমাবদ্ধতাকে, এক বৃহৎ বাঙালি গোষ্ঠী সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতাকে আমরা একটু খোঁচা দেব বলেই কিছুটা জুলুমের মতো করে ওই শব্দটির ব্যবহার। প্রাতরাশ থেকে দিবা ও নৈশভোজন, প্রতিদিনকার খাবার থেকে বিবাহ ইত্যাদি উৎসবের আনুপূর্বিক খাদ্য, তৃপ্তিদায়ক খাদ্যগ্রহণের পর পান সেজে বাড়িয়ে দেওয়ার কথাও লেখিকা ভোলেননি। সেই সঙ্গে কেকের উপর আইসিং-এর মতো আছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, ছড়া, মেয়েলি গান থেকে নানা বিচিত্র খাদ্যের পদ্যবিবৃতি, যা সাহিত্য ও জীবনকে গভীর বন্ধনে জড়িয়ে নিয়েছে। আজকাল যাকে ‘সংস্কৃতি পাঠ’ বলে, এ বই যেন তারই এক রমণীয় নমুনা।

না, বইটি কোনও পাক-প্রণালী নয়, রেসিপি-তালিকাও নয়। বরং নিজেদের প্রিয় ও পছন্দসই, সময়োপযোগী ও উপলক্ষ-অনুযায়ী যাবতীয় খাদ্য প্রস্তুতের সমস্ত সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার বর্ণনা। যেমন

অতঃপর অন্তঃপুরে, সামরান হুদা। গাঙচিল, ৩৫০.০০

ধরুন খিচুড়ি জাতীয় পিয়ুরসালা (জিনিসটা খাইনি বলে তা খিচুড়ির চেয়ে অনেক বেশি লোভনীয় মনে হচ্ছে, ফলে ‘খিচুড়ি-জাতীয়’ বলে তার মানহানি করলাম কি না জানি না), যা সিলেটের ট্যাহানগরের জমিদারবাড়ির পরিচারিকা দারগিঝির মতো কেউ রাঁধতে পারত না বলে লেখিকা আমাদের জানান। তাতে, লেখিকা আমাদের আরও জানাচ্ছেন, শুকনো শিমের বিচি লাগে। কিন্তু এটুকু বলেই তিনি শেষ করছেন না। সেই শিমদানার ব্যাখ্যান আছে প্রায় আড়াই পৃষ্ঠা জুড়ে। পুরোটা এখানে উদ্ধার করতে ইচ্ছা হলেও উপায় নেই, বরং মোদ্দা কথাগুলি বলি। মাচায় শিমগাছ শুকিয়ে এলে সব শিম তোলা হয় না, বীজের জন্য বেশ কিছু শিমসুদ্ধ লতা রেখে দেওয়া হয়, নিচু মাচার অংশে। ‘‘পাতাগুলো যখন শুকিয়ে গিয়ে প্রায় মুচমুচে হয়ে যায়, হাতে নিয়ে কচলালে মিহি গুঁড়ো হয়ে যায়, তখন মাচা থেকে টেনে টেনে নামানো হয় শুকনো গাছ। শুকিয়ে বেত হয়ে যাওয়া ডাল থেকে থোকা থোকা শুকনো শিম নামিয়ে উঠোনে মেলে দেওয়া হয় আরও খানিকটা শুকোনোর জন্যে। খুব বেশি রোদ খাওয়াতে হয় না অবশ্য। শিমদানা গাছে থাকতেই থাকতেই হয়ে গিয়েছে শুকনো খটখটে।’’

কিন্তু এখানেই কি শিমদানার বৃত্তান্ত শেষ? পাঠক তা ভুলেও ভাববেন না। তারও পরে লেখিকা জানাচ্ছেন, ‘‘নানা রঙে চিত্রিত হয় শিমদানার শরীর। ওইটুকুনি একটা দানার গায়ে তিনটে চারটে করে রঙ। সাদা, কালো, খয়েরি, বাদামির ছোট্ট ছোট্ট ছোপ। চিত্রিত পাতলা খোসার ভিতর হালকা বাদামি রঙের দানা।... মাটির খোলায় একে একে ভেজে নিতে হয় চাল, মাসকলাইয়ের ডাল, শুকনো শিমদানা। ভাজার সময় খোলায় থাকে বালি। গরম বালিতে কয়েকগাছা সরু করে চিরে নেওয়া বাঁশের কাঠি দিয়ে সাধারণত নেড়ে নেড়ে ভাজা হয় চাল-ডাল বা শিমদানা।” এই হল অতিশয় খণ্ডিত উদ্ধৃতি। বাঁশের কাঠিগুলি যে চপ্স্টিকের মতো খানিকটা তা-ও লেখিকা আমাদের জানিয়ে দেন।

ভাবুন এক বার। পিয়ুরসালা রন্ধনের একটি মাত্র উপকরণ শিমদানা। তা কখন গাছ থেকে নামানো হবে, কী ভাবে শুকনো হবে, কী ভাবে ভাজা হবে, ছোটরা রান্নার আগেই তা কী ভাবে মুঠোভরে গরম গরম খেতে চাইবে তার সবিস্তার বর্ণনা। শেষে লেখিকার মন্তব্য “তো এই শিমদানা, ভাজা মাসের ডাল আদাবাটা, কাটা পেঁয়াজ-রসুন, ঘি আর জলির চালের নিজস্ব সোঁদা গন্ধ মিলে মিশে যে গন্ধটি ছাড়ে, তাতে আশে পাশের বাড়ির লোকজন এসে নাকি জানতে চাইত, দারগিঝি কিতা আইজ পিয়ুরসালা রানছো নি?”

শুধু কি পিয়ুরসালা? কত রকমের পিঠে! পাক্কন পিঠে, ফুলপিঠে, পোয়া পিঠে, চিতই পিঠে, চর্বির পিঠে, পিঠের মতোই ছিটা রুটি। তার গোলা কী ভাবে হবে, কাই কী ভাবে হবে। তা ছাড়া তাতে নাম লেখা হবে, নকশা কাটা হবে। “... হয় বর-কনের নাম লেখা বিশাল আকারের এক গোল একখাইন্যা পিঠা। সেই নামের আশেপাশে নকশার কী বাহার। ফুল লতা পাতা পাখি প্রজাপতি পালকি ঘোড়া কী নেই সেখানে!” যে হাঁস কেনা হল শরবত আলির কাছে থেকে, সেগুলি গ্রামের বিলের হাঁস হওয়া সত্ত্বেও শরবত আলি ‘অরিজিনাল সাইবেরিয়ান ডাক’ বলে অনেক বেশি দামে বিক্রি করে যায়। যে হাঁস সাংহাই থেকে উড়ে এসেছে বলে জানায় সে, তা বাড়িতে কদিনের মধ্যে পোষ মানিয়ে কেমন ওড়ে দেখতে গেলে কয়েক হাত উড়ে ধুপ করে মাটিতে পড়ে যায়। হাঁসমুরগি ছাড়াও ছিল কানি বগা, টগ বগা, ধনেশ আরও কত কী পাখি। বাদ যায়নি ময়মনসিংহের অষ্টগ্রামের পনিরের কথাও। কোরবানির ইদের পর বাসি মাংস দিয়ে তৈরি শিঙাড়ার কথা।

এই রকম আখ্যানের পর আখ্যান। আখ্যানের আগেপিছেমধ্যে ছড়া, গান, গীতিকা বা মঙ্গলকাব্যের টুকরো ছিটোনো। আছে নানা সরস পার্শ্ব-উপাখ্যান বাড়িতে যে কাঁঠালগাছটা আ-ফলা,  অর্থাৎ মোটেই কাঁঠাল ফলায় না, তার কাছে গিয়ে লেখিকার কাকা (‘চাচা’ লিখলে ক্ষতি কী ছিল?) “মাঝে মাঝেই দা-এর কোপ দেওয়ার অছিলায় গাছটাকে ভয় দেখাত, ‘কাঁঠাল দিবি কি দিবি না? কাইট্যা ফ্যালামু কইলাম।’ কিন্তু কাঁঠাল গাছ তাতে মোটেও ভয় পেত না, বছরের পর বছর সে অমনি ঠায় দাঁড়িয়েই থাকত। পাতা দিত, ছায়া দিত কিন্তু কাঁঠাল দিত না।” কাঁঠাল গাছের এই অসৌজন্য একটু ব্যতিক্রমী বলতে হবে। আমাদের বাড়ির কাঁঠালগাছের মায়াদয়া বেশি ছিল, তারা মাটির তলা থেকে কাঁঠাল ফলাতে শুরু করত।

কিছু ছাপার ভুল আছে, কিন্তু এর সজ্জা মুদ্রণ ও অলংকরণ বেশ ভাল। চমৎকার উপভোগ্য বই, তবে কিছু রান্নাঘর সংক্রান্ত ‘কিচেন হিউমার’ থাকলে হত। যেমন আমাদের মায়েদের কাছে শুনেছি, নতুন বউকে শাশুড়ি রান্নার নির্দেশ দিয়েছেন, ‘বেগুন-ডোবা’ জল দিতে হবে কড়াইয়ে। বউ যত জল দেয়, বেগুন আর ডোবে না। সে ঘোমটার মধ্যে চোখের জল ফেলতে থাকে।

তবু এই সুস্বাদু বইটি পড়া শুধু রান্নাকে পড়া নয়, স্মৃতিকে পড়া নয়, মাটিকে পড়া, দেশকে পড়া।

 

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য