খিদিরপুর অরফানগঞ্জ মার্কেটের ভিতর ডাঁই করা ময়লার স্তূপের পাশে উবু হয়ে বসে বিড়বিড় করতেন তিনি। নাম জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘আব্দুল্লাহ।’ লম্বা-কালো-রোগা। বছর ৫২ হবে। ময়লা, শুকনো শরীর, রুখুশুখু চুলে জটা, এক চিলতে নোংরা-ছেঁড়া কাপড় পরা। বাজারে ফেলে দেওয়া পচা সবজি, পোকা-ধরা ফল ঘেঁটে খেতেন। বৃষ্টি এলে কুকুরদের সঙ্গেই কোনও একটা দোকানের চালার নীচে গুটিসুটি পাকিয়ে পড়ে থাকতেন। সেটা ২০০৭ সাল।

ওই বাজারেই মহম্মদ নিহালের ‘এন স্টোর’। বেশ বড় মুদিখানার দোকান। দিব্যি চলে। মাঝেমধ্যে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে আব্দুল্লাহ দোকানের সামনে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। বিক্রিবাটা, খদ্দেরের ভিড় সামলানোর ফাঁকে তাঁর দিকে চোখ পড়লে মনটা খারাপ হয়ে যায় নিহালের। কোনও দিন একটু পাউরুটি, মুড়ি, বিস্কুট-চা, বাড়ি থেকে আনা পরোটা হাতে দেন। আব্দুল্লাহ নিঃশব্দে খেয়ে নেন। নিহাল নতুন লুঙ্গি আর গেঞ্জিও কিনে দিয়েছিলেন তাঁর জন্য।

ঠিক তার পরের বছর গরমের সময় চেতলার একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ঈশ্বর সঙ্কল্প’ অরফানগঞ্জ বাজারের পাশে বিশেষ শিবির করল। আশপাশের এলাকার সহায়হীন, পথবাসী মানসিক রোগীদের খুঁজে এনে শিবিরে মন-চিকিৎসকদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হল। আব্দুল্লাহও সেই দলে ছিলেন। এর দিন কয়েক পর, দুজন স্বেচ্ছাসেবক এসে হাজির নিহালের মুদিখানায়। ‘সবাই বলল আপনার দোকানে আব্দুল্লাহচাচা রোজ আসেন। আপনি খাবার দেন, চা খাওয়ান। আপনার আর একটু সাহায্যের দরকার আমাদের। আপনি রাজি হলে হয়তো আব্দুল্লাহকে সুস্থ করতে পারব আমরা সবাই মিলে!’

কী করতে হবে? আব্দুল্লাহকে ডাক্তারবাবুরা যে ওষুধ দিয়েছেন তা কিনে দিয়ে যাবেন ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীরা। দিনে দু’বার খাবারের সঙ্গে আব্দুল্লাহকে সেই ওষুধ খাওয়ানোর ভার নিতে হবে নিহালকে! নিহাল আদৌ ওষুধ দিচ্ছেন না কি অন্য কিছু খাওয়াচ্ছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাই ডাক্তারবাবুর প্রেসক্রিপশনও দিয়ে যাওয়া হবে নিহালের কাছে।

রাজি না-হওয়ার সম্ভাবনাই নিরানব্বই শতাংশ ছিল। কোথাকার কে ঠিক নেই। এমন ঝামেলা কেউ নেয়! বিনা স্বার্থে আজকালকার দিনে যেচে অসুস্থ প্রিয়জনের দায়িত্বই লোকে নেয় না তো রাস্তায় পড়ে থাকা ‘পাগল’ কোন ছার! কিন্তু মানুষের মন আশ্চর্য জিনিস! পঞ্চাশ পার করা মহম্মদ নিহাল রাজি হতে কোনও সময় নেননি।

প্রথম-প্রথম সহজে ওষুধ খেতে চাননি আব্দুল্লাহ। ফেলে দিয়েছেন। তখন চায়ের সঙ্গে ওষুধ গুলে খাওয়ানো শুরু করলেন নিহাল। স্বেচ্ছাসেবকেরা বলে গিয়েছিলেন, ওষুধ শুরুর পর কিছু দিন খুব ঘুম পাবে। তাই দোকানের ছোট গুদামের এক দিক সাফসুতরো করে আব্দুল্লাহর শোওয়ার জায়গা করে দিলেন।

তিন মাসের মধ্যে আব্দুল্লাহ পুরো বদলে গেলেন। কথা বললেন, নিজে চেয়ে ওষুধ খেলেন। তার পর এক দিন নিহালকে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কেঁদে ফেললেন। অতীত টুকরো-টুকরো মনে পড়েছে তাঁর। আসল নাম সুরেশ গোবিন্দ কাম্বলে। মহারাষ্ট্রের সাংগলি-তে থাকতেন। সেখানে একটা হাসপাতালে এক্স-রে টেকনিশিয়ান ছিলেন। তার পর মানসিক অসুস্থতার জন্য কী ভাবে যেন হারিয়ে যান।

আর বাড়ি ফিরতে চাননি সুরেশ ওরফে আব্দুল্লাহ। তাঁর নতুন নামে, নতুন পরিচয়ে থেকে গিয়েছেন নিহালের সঙ্গেই। গত ছ’বছর নিহালের মুদির দোকানেই কাজ করছেন, রাতে দোকানেই থাকেন। মাইনে নিতে চান না। জামাকাপড়-খাবারদাবার সব নিহাল দেন, এবং এখনও রোজ নিজের হাতে ওষুধ খাওয়ান। অগস্ট মাসের এক বৃষ্টির দুপুরে সেই দোকানে বসেই কথা হচ্ছিল নিহালভাই আর আব্দুল্লাহচাচা-র সঙ্গে। নিজের হাতে চা করে নিয়ে এলেন আব্দুল্লাহ। তার পর মহম্মদ নিহালের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে লাজুক হেসে নিচু গলায় বললেন, ‘পৃথিবীতে ইনিই এখন আমার একমাত্র আত্মীয়, আমার সব। ওঁর ধর্মও এখন আমার। মরলে এঁর কাছেই মরব।’

কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগে। রূপকথা মনে হয়। অজ্ঞাতকুলশীল, রাস্তায় পড়ে থাকা উলোঝুলো পাগলের জন্য এ যুগে কেউ এতটা করে? করে লাভ কী?

ডাল মাপতে-মাপতে নিহাল বলেন, ‘লাভ-লোকসান অত ভাবিনি। যে দায়িত্ব বোঝে না তার কথা ছেড়ে দিন। পয়সাওয়ালা ছেলে থাকতে মা রাস্তায় ভিক্ষে করে, এমনও আছে। আমি শুধু বুঝি, মানুষ হয়ে মানুষের জন্য কিছু না করলে আমার নমাজ সফল হবে না। আল্লা সবাইকে সাহায্যের সুযোগ দেন না। তুমি যদি ১০০ টাকা রোজগার করো তা হলে তার থেকে অন্তত ১০ টাকা অসহায় মানুষের জন্য খরচ করো। এটা আমার নীতি।’ আর একটু থেমে বললেন, ‘একটা অসুস্থ মানুষ একটু সাহায্যে চোখের সামনে ভাল হয়ে গেল, এটা যে কী অসাধারণ একটা অনুভূতি তা আপনাকে বোঝাতে পারব না।’

মানবচরিত্রের এই ম্যাজিকের জন্যই বোধহয় চারপাশে থাকা মানুষের ভিতর থেকে মানসিক রোগীদের জন্য ‘কেয়ারগিভার’ খুঁজে বার করার এই ‘মডেল’ গত ছ-সাত বছর যাবৎ কলকাতায় এতটা সফল। বিদেশ থেকে প্রতি বছর অনেকে আসেন এই কাজের গতিপ্রকৃতি বুঝতে। রাস্তায় পড়ে থাকা মানসিক রোগগ্রস্ত, অর্ধোন্মাদ কাউকে মরার জন্য ছেড়ে দেওয়া হল না বা তাঁকে তুলে নিয়ে কোনও পরিষেবাহীন সরকারি মানসিক হাসপাতালে বা কোনও শোচনীয় ভবঘুরে হোমে তিলে তিলে মরার জন্য পুরে দেওয়া হল না। বরং সমাজে সুস্থ মানুষের মধ্যে রেখে সহানুভূতিশীল, অনাত্মীয় কিছু মানুষের মাধ্যমে তাঁকে সুস্থ করা হল। পুনর্বাসন দেওয়া হল।

পুরোপুরি মানুষের বিবেক, শুভবুদ্ধি, সহমর্মিতার উপর ভরসা করে গড়ে ওঠা মডেল। আত্মকেন্দ্রিকতার এমন ভরভরন্ত রাজত্বে সেই মডেল মুখ থুবড়ে পড়তেই পারত, কিন্তু পড়েনি! খিদিরপুরেরই সার্কুলার গার্ডেনের ফুটপাতে রবীন্দ্র সাউ আর অরুণ সাহার সঙ্গে সুধাকর গোপাল রোখরে-কে দেখে, বড় দীন লাগছিল নিজেকে।

সেটাও ২০০৭-’০৮ সালের কথা। রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে ঘুরতেন সুধাকর, নর্দমার মধ্যে ঢুকে শুয়ে থাকতেন, নোংরা খেতেন। যা হয়, ছেলে-ছোকরারা পাগল বলে লাঠি দিয়ে খোঁচাত, ঢিল মারত। তিনি থান ইট নিয়ে তেড়ে যেতেন। ফুটপাতের যে দিকটা বেশি ক্ষণ শুয়ে থাকতেন, সেখানেই লটারির টিকিট আর সিগারেটের স্টল ছিল রবীন্দ্র সাউয়ের, ঠিক তার পাশে বাচ্চাদের জামাকাপড়ের স্টল অরুণ সাহার। সেই সময় সুধাকরের নাম-পরিচয় কিছুই জানতেন না তাঁরা। কিন্তু মন খারাপ হয়ে যেত তাঁকে দেখে। রোজ খেতে দিতেন। তাঁর ঘা-গুলোয় ওষুধ লাগিয়ে দিতেন। সুধাকর কী বুঝতেন কে জানে, কিন্তু তাঁদের কখনওই তাড়া করতেন না।

এক দিন এলাকায় শিবির করে আরও কয়েক জন মানসিক রোগীর সঙ্গে সুধাকরকে ডাক্তার দেখান স্বেচ্ছাসেবকেরা। তার পর একই ভাবে ওষুধ হাতে হাজির হন রবীন্দ্র আর অরুণের কাছে।

‘খাবারের সঙ্গে রোজ দুটো করে ওষুধ দেবেন মানুষটাকে? তা হলে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন উনি।’ রাজি হয়েছিলেন রবীন্দ্র আর অরুণও। চায়ের সঙ্গে, বিস্কুটের সঙ্গে, আর সুধাকর এগ রোল খেতে ভালবাসতেন বলে এগ রোলের মধ্যে মিশিয়ে ওষুধ খাওয়াতেন।

পাঁচ মাসের মধ্যে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন সুধাকর। নিজের নাম বলতে পেরেছিলেন, জানিয়েছিলেন বাড়ি কানপুরে। সেখানে বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন। কিন্তু আব্দুল্লাহের মতো তিনিও বাড়ি যেতে চাননি। থেকে গিয়েছিলেন কলকাতার ফুটপাতে পাওয়া এই দুই নতুন আত্মীয়ের কাছে। আত্মীয় নয় তো কী? সেই যে বার পুলিশের গাড়ি এসে সুধাকরকে তুলে ভবঘুরে হোমে নিয়ে চলে গেল, পাগলের মতো দৌড়োদৌড়ি করে তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিলেন রবীন্দ্র আর অরুণ। এখন তাঁদের স্টলেই রাতে ঘুমোন সুধাকর। সারা সপ্তাহ হেস্টিংস থানায় বাগান করার কাজ জোগাড় করে দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। থানাতে ফুল ফোটান আর সকাল-বিকেল খাবার পান। শনি-রবিবার ছুটি। সে দিন সুধাকরের খাবার আসে অরুণ সাহার বাড়ি থেকে। নিজের হাতে রেঁধে দেন তাঁর মা।

কেন এত করেন রাস্তার এক উন্মাদের জন্য? নিজেদেরই টানাটানির সংসার, তা হলে এত দায়িত্ব নেওয়ার দরকার কী? স্বল্পবাক রবীন্দ্র মুখ নিচু করে বলেন, ‘মানুষ হয়ে আর একটা মানুষের জন্য এইটুকু করব না? সামান্য ওষুধ খাওয়াতে পারব না?’ আর অরুণ চাঁচাছোলা গলায় বলেন, ‘করতে তো হবেই। মায়া পড়ে যায় যে। মানুষটা দেখতে দেখতে বদ্ধ পাগল থেকে একদম ভাল হয়ে গেল, ভাবতে নিজেরই কেমন ভাল লাগে!’

এটাই কি তা হলে ‘মিউচুয়াল এড’? বিখ্যাত পারস্পরিক সহযোগিতা তত্ত্ব? যার কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন সাবেক রাশিয়ার স্বঘোষিত অ্যানার্কিস্ট পিটার ক্রোপোটকিন? বলেছিলেন, শুধু প্রতিযোগিতা নয়, কোনও প্রজাতির মধ্যে এই সহযোগিতাই সমাজের উন্নতির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ফ্যাক্টর। এটাই অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এটা মানুষের ভিতরে থাকা একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, যার স্ফুরণের জন্য কোনও সরকারি প্রচেষ্টার দরকার নেই।

একের পর এক মানুষগুলোর সঙ্গে আলাপ করতে করতে একটা উপলব্ধি হচ্ছিল, এই সহযোগিতার স্রোত কিন্তু বইছে মূলত নিম্নবর্গের, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র, তথাকথিত অল্পশিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে। তাঁরাই অনুভব করছেন অসুস্থ, সহায়হীন মানুষের অসহায়তা, যন্ত্রণা। তথাকথিত সুবিধাপ্রাপ্ত, ধনিবর্গ এই সহযোগিতা তত্ত্বের বাইরে। লাভ-লোকসান, অসূয়া, স্বার্থপরতার কোটর ছেড়ে তাঁরা বের হতে পারেননি। কিন্তু প্রতিনিয়ত জীবন চালাতে নিজেদের দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় বলেই হয়তো নিম্নবর্গের মানুষেরা আর একটি বিপর্যস্ত মানুষের হাত ধরার তাগিদ পাচ্ছেন। সেই সাহায্যে বিপদগ্রস্ত মানুষটি সুস্থ হলে ভাল তো লাগছেই, একটা তৃপ্তি তো পাচ্ছেনই, সঙ্গে হয়তো তাঁদের নিজেদের মনে হচ্ছে, তাঁরাও পারবেন সব প্রতিকূলতা ঠেলে এগিয়ে যেতে। তাঁর থেকেও খারাপ অবস্থায় থাকা মানুষটি যদি একটু সাহায্যে জীবনে ফিরতে পারেন তা হলে তাঁর না-পারার কিছু নেই।

তপন দাসের কথাই ধরুন। চেতলা লেডিজ পার্কের ধারে তপনবাবুর চায়ের স্টল। কতই বা রোজগার মাস গেলে? কেউ তো তপনদাকে বাধ্য করেননি উন্মাদ তারকের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। তাঁর দোকানের পাশে ফুটপাতে পড়ে থাকতেন তারক। মাছি ভনভন করত নোংরা শরীরে। রোজ খাবারের সঙ্গে ওষুধ খাইয়ে সেই তারককে সুস্থ করে ফেলেছেন তপনবাবু। এখন তাঁর দোকানেই কাজ করেন তারক।

চারু মার্কেটের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী গৌরী বাগ আলাদা করে বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে এসে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ তাতে মিশিয়ে খাওয়াতেন রাস্তার ‘পাগলি’ খুকু হালদারকে। বলেন, ‘আজ আমার যদি এই রকম হত আর আমাকে সবাই ফেলে দিত তা হলে আমার কেমন লাগত? রোজ অফিস যাওয়ার সময় খুকুদিকে দেখে আমার খুব কষ্ট হত। তাই ফেলে দিতে পারলাম না।’ খুকু এখন সুস্থ হয়ে নিজে সাফাইকর্মীর কাজ করেন।

ঢাকুরিয়া মধুসূদন মঞ্চের উলটো দিকে চায়ের দোকানের মালিক সঞ্জয় দাস ওষুধ খাইয়ে সুস্থ করে তুলেছেন ব্রিজের ধারে উলঙ্গ হয়ে বসে থাকা বাপিকে। বেশি চিনি দিয়ে চা খেতে ভালবাসতেন বাপি। সেই রকম চা বানিয়ে তার মধ্যে ওষুধ গুঁঁড়িয়ে মিশিয়ে দিতেন সঞ্জয়। এখন সেই বাপি ওই এলাকায় রিকশা চালিয়ে রোজগার করছেন। সঞ্জয়ের কথায়, ‘হয়তো ও আমার নিজের কেউ নয়, কিন্তু মানুষ তো। চোখের সামনে দেখছি জন্তুর থেকেও খারাপ জীবন কাটাচ্ছে। সহ্য করা যায় না। কোনও বিশাল ঝক্কি তো নয়। এইটুকু করতে না পারলে আর মানুষ কী হলাম?’

একাধিক মনোবিদের ব্যাখ্যায়, রাস্তাঘাটে যে মানসিক রোগাক্রান্তদের দেখা যায় তাঁদের বেশির ভাগ স্কিৎজোফ্রেনিয়া রোগের শিকার। এতে আক্রান্ত হলে সাধারণত বাড়ির লোক বা কাছের লোকেদের প্রতি সন্দেহ জাগে, তাঁদের শত্রু মনে হয়। এঁরা তাঁদের কাছে যেতে চান না, তাঁদের হাত থেকে খাবার বা ওষুধ খেতে চান না। বরঞ্চ অনাত্মীয়, অপরিচিতদের কাছে এঁরা স্বছন্দ। ফলে অনাত্মীয় কেয়ারগিভার’দের থেকে ওষুধ খেয়ে দ্রুত সুস্থও হন। তা ছাড়া, অসুস্থতা ধরা পড়ার পরেই এঁদের অধিকাংশই নিজের বাড়িতে অবহেলিত হন। তাতে রোগ সারার সম্ভাবনা আরও কমে। অন্য দিকে পথের একেবারে অপরিচিত কিছু মানুষের থেকে পরিচর্যার পাশাপাশি তাঁরা পেয়ে যান খাঁটি সাহচর্য আর নিখাদ ভালবাসা, যা সুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে বিশল্যকরণীর কাজ করে।

শুনতে শুনতে বার বার মনে হচ্ছিল বেলজিয়ামের গিল (Geel) শহরের ঐতিহাসিক ‘কমিউনিটি কেয়ার’-এর কথা। পৃথিবীর এই একটি শহরের বাসিন্দারা নিজেদের পরিবারে মানসিক রোগগ্রস্তদের ‘দত্তক’ রাখেন! তাঁদের দায়িত্ব নেন। আজ থেকে নয়, লিখিত দলিল-দস্তাবেজ অনুযায়ী ১২৫৫ সাল থেকে এটা চলছে! প্রথম দিকে আশপাশের মানসিক হাসপাতাল থেকে রোগীদের সারা দিনের জন্য এই সব পরিবারের কাছে ছেড়ে দেওয়া হত, রাতে তাঁরা হাসপাতালে ফিরে ঘুমোতেন। উদ্দেশ্য ছিল, সুস্থ মানুষের মধ্যে রেখে অসুস্থদের দ্রুত স্বাভাবিক করা। ক্রমশ রাতে ফেরাটাও বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের এক জন হয়েই তাঁরা কাটাতে থাকেন। বাড়িতে, খেত-খামারে, বাজারে, দোকানে কাজ করেন। এলাকার ফুটবল টিমে, নাটকের দলে যোগ দেন। কেউ তাঁদের দিকে আঙুল তুলে ‘পাগল’ বলে ব্রাত্য করে রাখেন না। হেয় করেন না। সারা পৃথিবী থেকে মানসিক রোগের চিকিৎসকেরা এই অভিনব মডেল দেখতে গিল-এ আসেন।

রেকর্ড বলছে, ১৯৪০ সালেও গিল-এ বিভিন্ন পরিবারে আশ্রিত ছিলেন তিন হাজারের বেশি মানসিক রোগী। সংখ্যাটা এখন কমলেও এখনও প্রায় ৬০০ মানসিক রোগী এই ভাবে পরিবারের এক জন হয়ে কাটাচ্ছেন। এঁদের ভরণপোষণের জন্য পরিবারগুলিকে ভাতা দেয় সরকার। অর্থাৎ যে কাজটা মহম্মদ নিহাল বা অরুণ সাহা-রা বিক্ষিপ্ত ভাবে কলকাতায় বসে করছেন, তা বহু বহু বছর আগে গণহারে শুরু করে দিয়েছিলেন গিলের বাসিন্দারা। তাঁদের উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়ে এগিয়ে এসেছে সে দেশের সরকারও।

আচ্ছা,আমাদের দেশে পাড়ার ক্লাবগুলো হামেশাই গাদা টাকা খরচ করে রক্তদান শিবির, ফুটবল ম্যাচ, নানাকণ্ঠী সহযোগে বিচিত্রানুষ্ঠান, গণবিবাহ, দুর্গাপুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, রাখিবন্ধন, বস্ত্রদান ইত্যাদি-প্রভৃতি করে চলেছে। রাস্তায় অর্ধনগ্ন হয়ে, ময়লা খেয়ে পড়ে থাকা এই রকম অন্তত কিছু মানসিক অসুস্থ ব্যক্তির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কি তারা নিতে পারে না? পাড়াগত ভাবেও এই কাজ করা যায়। এলাকার মানুষ ভাগাভাগি করে সেই মানুষটাকে নিয়মিত একটু খাবার, একটু ওষুধ দিলেন। পাড়ার এক কোণে মাথা গোঁজার একটা জায়গা করে দিলেন। তার পর তিনি একটু সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁকে পাড়ার রাতপাহারার কাজ দেওয়া যেতে পারে, বা দোকানে, হোটেলে, বাড়িতে কাজ দেওয়া যেতে পারে। মানসিক রোগীদের চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সরকারি পরিকাঠামো এ দেশে এখনও শোচনীয়। কোটি-কোটি মানুষের দেশে সেই পরিকাঠামো তৈরিও সহজ নয়। তা ছাড়া সব কিছুর জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকাটাও কাজের কথা নয়। ২০২৫ সালের মধ্যে মানসিক রোগ গোটা বিশ্বে মহামারীর রূপ নিতে চলেছে। আমরা, এই মুহূর্তে সুস্থ মানুষেরাও বিপদের বাইরে নই। কার কখন কী হবে কেউ জানে না। মহম্মদ নিহাল বা গৌরীদি’দের মতো মানুষের সংখ্যা বাড়লে আমাদের সকলের ভাল। আরও ভাল আমরা সকলেই নিজেদের মধ্যে নিহাল বা গৌরীদিকে জাগিয়ে নিতে পারলে।

 

parijat_ban@yahoo.co.in