বোম্বাই প্রদেশের ডাকসাইটে ব্যবসায়ী যমনদাস দ্বারকাদাসের ডিনার পার্টিতেই মোক্ষম মুহূর্তটা এসেছিল।

তিরিশের দশকের মাঝামাঝি। তখনও ভারত ব্রিটিশ শাসনে, বোম্বাই নাম বদলে মুম্বই হয়নি। দ্বারকাদাসের পার্টিতে সে দিন এসেছিলেন কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু। রুশ মেয়ে ইউজেনিয়া পিটারসন-এর সঙ্গে সে দিনই তাঁর প্রথম আলাপ।

ইউজেনিয়া বোম্বাইয়ের চেক কনসুলেটে কমার্শিয়াল অ্যাটাশে জাঁ স্ট্রাকাটি-র স্ত্রী। কিন্তু এই রুশ মহিলা ভারতীয় ঢঙে শাড়ি পরেন, বছর কয়েক আগেও অ্যানি বেসান্ত, জিড্ডু কৃষ্ণমূর্তিদের থিয়োসফিস্ট শিবিরে যাতায়াত করতেন। আত্মার অমরত্ব, ভারতীয় দর্শন ইত্যাদি নিয়ে কথা হত। বোম্বাইয়ের এক প্রযোজক ইউজেনিয়াকে ‘অ্যারাবিয়ান নাইট’ নামে এক সিনেমার নায়িকাও বানিয়েছিলেন। ভদ্রঘরের শিক্ষিত মেয়েরা এখনও সিনেমায় নামতে চায় না, বিদেশিনীরাই নায়িকা হিসাবে একমাত্র ভরসা। ফলে, নির্বাক সিনেমার এই যুগে রুবি মেয়ার্সকে ‘সুলোচনা’ বা রেনি স্মিথকে ‘সীতা দেবী’ নামে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়। প্রযোজক ইউজেনিয়ার নামটাও তাই বদলে দিলেন: ইন্দিরা দেবী। তাঁর বিপরীতে লাহৌর থেকে আসা নতুন এক নায়ক। পৃথ্বীরাজ কপূর।

সিনেমাটা হিট করেছিল, কিন্তু ইন্দিরা দেবী ছায়াছবির জগতে আর থাকতে চাননি। আরও পাঁচটা বিষয়ে তাঁর প্রবল উৎসাহ। থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির সমাবেশ সেরে কলকাতা গিয়েছিলেন। সেখানে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাকা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইউজেনিয়ার আলাপ করে দিয়েছিলেন। নিজে জন্মসূত্রে রুশ, স্বামী চেক। ফলে ব্রিটিশ শাসকদের মতো নাক-উঁচু মনোভাব ইউজেনিয়া ওরফে ইন্দিরা দেবীর নেই। সরোজিনী নাইডু থেকে অনেক ভারতীয়ই তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জওহরলাল নেহরুর বক্তৃতাও দু-এক বার শুনেছেন, কিন্তু সরাসরি আলাপ হয়নি।

আলাপটা হল যমনদাসের দেওয়া  নৈশভোজে। ‘আপনাকে  ব্রিটিশরা অনেক বার জেলে পাঠিয়েছে, না?’ জিজ্ঞেস করলেন ইউজেনিয়া।

‘পাঁচ বার,’ হাসলেন নেহরু।

‘একটা কথা জানতে চাই। বারংবার জেলে গিয়েও আপনি ক্লান্ত হন না। উলটে ব্রিটিশ জমানার বিরুদ্ধে ফের দ্বিগুণ উৎসাহে লড়ে যান। এই মেন্টাল স্ট্রেংথ কোত্থেকে আসে?’

‘যোগ,’ নেহরু ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘আমি রোজ শীর্ষাসন করি।’

যোগ নিয়ে ভাসা-ভাসা ধারণা ইউজেনিয়ার ছিল। ভারতীয় যোগীরা বিশ্বাসের বলে রোগ সারিয়ে দেন, অলৌকিক খেলা দেখাতে পারেন, ইত্যাদি। কিন্তু শীর্ষাসন শব্দটা সে দিনই প্রথম শুনলেন তিনি।

এই ঘটনার সত্তর বছর পরে, ২০০২ সালে ১০২ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস শহরে ইন্দিরা দেবী যখন মারা গেলেন, তখনও তাঁর ঘরে সাদা শেরওয়ানি ও গাঁধী টুপি-পরা জওহরলালের ছবি।

তত দিনে গঙ্গায় অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ভারত স্বাধীন হয়েছে, জওহরলাল, তাঁর কন্যা ও দৌহিত্র, সকলে মারা গিয়েছেন। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ, সোভিয়েত রাশিয়ার পতন— অনেক কিছুই দেখে ফেলেছে পৃথিবী। ইউজেনিয়া তথা ইন্দিরা দেবীও ঘুরেছেন দিক থেকে দিগন্তে। কখনও বোমা-বিধ্বস্ত সাংহাইয়ে চিয়াং কাই শেকের বাড়িতে। কখনও বা বেভারলি হিলসে গ্রেটা গার্বো, গ্লোরিয়া সোয়ানসন থেকে শুরু করে কসমেটিক্স টাইকুন এলিজাবেথ আরডেনকে পদ্মাসনে বসতে শিখিয়েছেন, ক্রেমলিনে রুশ নেতাদের শিখিয়েছেন শলভাসন।

এরই মধ্যে নিজের নাম থেকে মাঝখানের i-টি ছেঁটে দিয়েছেন। ‘ইন্দ্রা দেবী’ নামেই আমেরিকায় বেরিয়েছে তাঁর লেখা ‘ফরএভার ইয়ং, ফরএভার হেলদি’, ‘ইয়োগা ফর আমেরিকানস’ ইত্যাদি হটকেক। পঞ্চাশের দশকে সে সব বই বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে ফরাসি, জার্মান ও স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ। আজ যে বারাক ওবামা থেকে ভ্লাদিমির পুতিন, তাবড় তাবড় রাষ্ট্রনেতা থেকে হলিউডের গ্ল্যামার-নায়িকারা সকলেই যোগাসনে আগ্রহী, তা ইন্দ্রা দেবীর অবদান। তিনিই বিশ্বে ভারতীয় যোগের প্রথম ব্র্যান্ড-অ্যাম্বাসাডর।

নেহরু দিকচিহ্ন দেখিয়েছিলেন, কিন্তু তিরিশের দশকে সেই পরাধীন ভারতে পথ খুঁজে নিতে হয়েছিল ইন্দ্রা দেবীকেই। শীর্ষাসনের কথা জানার পরই তিনি হাজির হলেন বোম্বাইয়ে কুবলয়ানন্দের যোগ হেল্থ সেন্টারে।

দোতলা বাড়ি। কুবলয়ানন্দ সেখানে ছাত্রদের যোগাভ্যাস ও শারীরশিক্ষা দেন। বরোদায় অরবিন্দ ঘোষ, বোম্বাইয়ে বালগঙ্গাধর তিলক তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভদ্রলোকের সাদা বাবরি চুল ও পুরুষ্টু সাদা গোঁফ দেখে প্রথম দর্শনে আর্থার কোয়েসলার-এর মনে হয়েছিল, ‘এক্কেবারে আইনস্টাইন’।

উনিশ শতকে স্বামী বিবেকানন্দ শরীরচর্চাকে প্রাধান্য-দেওয়া  হঠযোগকে পাত্তা দেননি। কিন্তু বিশ শতকের গোড়ার দিকে পরাধীন দেশের তরুণদের লৌহসবল পেশি আর ইস্পাতকঠিন স্নায়ুর অধিকারী করার জন্য কুবলয়ানন্দ শরীরচর্চার এই হঠযোগে আনলেন নতুন দিশা। কুস্তির ‘দণ্ড’ বা ‘ডন বৈঠক’ থেকে ‘সূর্য নমস্কার’, সবই তিনি একটু বদলে ঢুকিয়ে নিলেন তাঁর শারীরশিক্ষায়। সূর্য নমস্কার আদতে কোনও ট্রাডিশনাল যোগভঙ্গি নয়।

কুবলয়ানন্দ প্রথমে শেখালেন পশ্চিমোত্থানাসন। পা দুটো সামনে ছড়িয়ে মাথা হেঁট করে ব্যায়াম। তার পর সোজা হয়ে শুয়ে জোড়া পা তুলে মাথার পিছনে এনে হলাসন। ইউজেনিয়া কিছুতেই পারছেন না, প্রথম দু’দিন সারা শরীর ব্যথায় টনটন করেছে।

ব্যথা বেশি দিন সহ্য করতে হল না। ১৯৩৬ সালের শুরুতেই চেকোস্লোভাকিয়া ইউজেনিয়ার স্বামী স্ট্রাকাটি-কে দেশে ডেকে পাঠাল। তাঁকে চিন-এ বদলি করা হবে। স্বামীর সঙ্গে ইউরোপে ফিরে গেলেন ইউজেনিয়া। সেখানেই হাতে এল রাজকীয় বিয়ের আমন্ত্রণপত্র। মহীশূরের যুবরাজের বিয়ে। কূটনীতিকের স্ত্রী, একদা নায়িকা, সোশালাইট ইউজেনিয়া সেই বিয়েতে যোগ দিতে ফের ভারতে।  তিনি জানেন, এই মহীশূরের প্রাসাদেই যোগ শেখান কৃষ্ণমাচার্য!

ব্রাহ্মণসন্তান কৃষ্ণমাচার্য মহীশূর, বারাণসীতে শাস্ত্রশিক্ষা করেছেন। বালক বয়সে যোগের প্রাচীন ঋষি নাথমুনিকে স্বপ্নে দেখে গ্রাম থেকে তিনশো মাইল দূরে আলওয়ার তিরুনগরীতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে এক জনকে নাথমুনি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে তিনি নদীর ধারে একটি আমবাগান দেখিয়ে দেন। পরিশ্রান্ত বালক বাগানে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। নাথমুনি তাঁকে স্বপ্নে ফের দেখা দেন, ‘যোগরহস্য’ নামে একটি লুপ্ত গ্রন্থ পড়িয়ে দেন। কৃষ্ণমাচার্য ঘুম থেকে উঠে টের পান, পুরো গ্রন্থই তাঁর স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে। পরে তিব্বত চলে গিয়েছিলেন। সেখানে রামমোহন ব্রহ্মচারী নামে এক গুহাবাসী যোগী তাঁকে আর একটি লুপ্ত গ্রন্থ পড়ান, তিন হাজার রকম আসন শেখান। তার পর দেশে ফিরে বিয়ে-থা করে সংসারী হতে বলেন। ইন্দ্রা দেবীর ইচ্ছে, মহীশূর প্রাসাদে গিয়ে এই সুযোগে কৃষ্ণমাচার্যের কাছেই যোগ শিখতে হবে।

রাজার অতিথি সোশালাইট মহিলা তাই সটান গিয়ে হাজির হলেন যোগশালায়। কৃষ্ণমাচার্য অতিথিকে বসতে বললেন। কিন্তু যখনই ইউজেনিয়া তাঁর উদ্দেশ্য পেড়ে বসলেন, কৃষ্ণমাচার্য নারাজ, ‘এখানে সবাই ছেলে। মেয়েদের শেখাই না, বিদেশিনী দূর অস্ত।’

অবশেষে স্বয়ং রাজার অনুরোধে চিঁড়ে ভিজল। কৃষ্ণমাচার্য তবু গাঁইগুঁই করছেন, ‘এত শক্ত যোগাভ্যাসে আসা কেন? সবই শখ মেটানোর ব্যাপার না কি? যা হোক, চিনি, ময়দা বারণ। মশলাদার খাবার নয়। সূর্যোদয়ের আগে উঠে দু’ঘণ্টা আসন অভ্যাস করতে হবে। রাজবাড়িতে বিয়ে-থা যা-ই হোক, সূর্যাস্তের দু’ঘণ্টা আগে ডিনার। আর রাত সাড়ে ন’টায় ঘুম। দেখুন, শখ কত দিন টিকিয়ে রাখতে পারেন!’ কৃষ্ণমাচার্যের শ্যালক ও শিষ্য বি কে এস আয়েঙ্গারও পরে বলেছিলেন, তাঁদের গুরুদেব সব সময় মেজাজ খিঁচড়ে-দেওয়া কথা বলতেন, আসন না পারলে মেরে গা হাত-পা ব্যথা করে দিতেন।

দিনের পর দিন শর্তগুলি নিঃশব্দে মেনে গিয়েছেন ইউজেনিয়া। তাঁর সিরিয়াসনেস দেখে কয়েক সপ্তাহ পরে নরম হলেন গুরু। কৃষ্ণমাচার্যের জীবনে নাথমুনি, তিব্বতের সন্ন্যাসী ইত্যাদি যত অলৌকিক গল্পই থাকুক না কেন, তিনিই আধুনিক যোগশিক্ষার পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম আসনগুলিকে বেসিক, অ্যাডভান্সড ইত্যাদি ভাগে ভাগ করেন। নিজে বৈষ্ণব এবং শিখাধারী ব্রাহ্মণ হয়েও যোগকে করে তুলেছিলেন সেকুলার। ছাত্রদের বলতেন, ‘ধ্যানের সময় নিজের ঈশ্বরের কথা ভাবতে পারছ না? বেশ, মা-বাবার কথা ভাবো।’

আরও পড়ুন:প্রেসিডেন্টের বস্ত্রহরণ

কৃষ্ণমাচার্য ইউজেনিয়াকে একে একে শেখালেন পদ্মাসন, ধনুরাসন। শেষে শীর্ষাসন। অতঃপর শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রাণায়াম। প্রশিক্ষণের শেষ দিকে ছাত্রীকে বললেন, ‘এ বার বিদেশিদের যোগ শেখাও।’

পদ্মাসনে বসে আছেন ইন্দ্রা দেবী। 

ইউজেনিয়া হতবাক, ‘আমি’!

‘হ্যাঁ, তুমিই পারবে।’

আসনভঙ্গি, শ্বাসপ্রশ্বাস, পেশিকে বিশ্রাম দেওয়ার কায়দাকানুন— সব কিছুই এর পর থেকে একটা ছোট্ট ডায়রিতে লিখতে শুরু করেছেন ইউজেনিয়া। যে ব্রাহ্মণ এক দিন এক নারীকে যোগশিক্ষা দিতে চাননি, তাঁর প্রেরণাতেই বেরিয়ে এলেন যোগের বিদেশিনী দূত।

১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে সাংহাই বন্দরে যে দিন ইউজেনিয়ার জাহাজ ভিড়ছে, হু-হু ঠান্ডা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। কিন্তু শহরটি চমৎকার। জার্মান পাড়ার বেকারি, ফরাসি পাড়ার রেস্তোরাঁ ইউরোপকেও লজ্জা দেয়। শহরের ২০ বর্গকিমির মধ্যে ১২ বর্গ কিমি বিদেশি— ব্রিটিশ, ফরাসি, জার্মান, মার্কিনদের অধিকারে। একশো বছর আগে আফিং যুদ্ধের পর থেকে এই ব্যবস্থা।

সুখ বেশি দিন সইল না। ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, স্ট্রাকাটির দেশ চেকোস্লোভাকিয়া জার্মান অধিকারে। সাংহাইতে তিনি এখন রাষ্ট্রহীন একটি দেশের দূতাবাসের কর্মী মাত্র।

ইউজেনিয়া যোগাসন শেখাতে নামলেন। প্রথমে একটা জিমে ক্লাস হত, ক্রমে ছাত্রসংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এক ছাত্র সাংহাইতে মাদাম চিয়াং কাইশেক-এর বাড়িটি ভাড়া করে তাঁকে দেয়। চিয়াংরা তখন বহু দূরে চাংকিং শহরে প্রাদেশিক রাজধানী তৈরি করে আছেন। ‘রিল্যাক্সড, স্টিফ হয়ো না,’ ক্লাসে শেখান ইউজেনিয়া।

সাংহাইয়ের আকাশে ইতিমধ্যে জাপানিদের এয়ার রেড শুরু হয়ে গিয়েছে। পার্ল হারবারে বোমা ফেলেছে, সাংহাইকেও নিজেদের কবজায় আনতে চায় তারা। ব্রিটিশ, মার্কিন দূতাবাসে যারা এত দিন দামি রোল্স রয়েস বা পোর্শেতে যাতায়াত করত, তাদের বাহন আজ সাইকেল। জাপানিদের নির্দেশ, জাপানি নম্বরপ্লেট ছাড়া অন্য গাড়ি রাস্তায় থাকবে না। ‘জাপানিরা যে ভাবে ছোট সেলে গুঁতোগুঁতি করে সবাইকে বসিয়ে রাখত, ভাগ্যিস পদ্মাসনে বসার অভ্যাস ছিল,’ পরে বলেছিল ইউজেনিয়ার এক সাংহাইবাসী ছাত্র।

যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু ইউজেনিয়া ভারতকে ভোলেননি। চিনে তখন ব্রিটিশ ভারতের প্রতিনিধি কেপিএস মেনন। সেই মহীশূর প্রাসাদ থেকেই তিনি ও ইউজেনিয়া পরস্পরের পরিচিত। ইউজেনিয়া শুনেছেন, বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। তাই তিনি নিজেই মঞ্চে নাচবেন। সাংহাইতে চ্যারিটি শো করে বাংলার সাহায্যে টাকা তুলবেন। ‘ইট ব্রট ইন আ লট অব মানি ইন রিলিফ ফান্ড,’ পরে লিখেছিলেন কেপিএস মেনন।

মেনন আরও একটি কাজ করেছিলেন। ইউজেনিয়া তত দিনে বুঝতে পারছেন, স্ট্রাকাটির সঙ্গে তাঁর বিয়ে প্রায় শেষ। সাংহাইয়ের বাসিন্দা এক রুশ কম্পোজারের সঙ্গে তত দিনে তাঁর প্রেম। কিন্তু যোগ মানে তো একই সঙ্গে ভালবাসা এবং আসক্তিতে জড়িয়ে না পড়া। স্বামী ও প্রেমিক দুজনকে ছেড়েই ফেরা যায় না ভারতে? আর এক নতুন জীবনে?

মেননের হস্তক্ষেপেই ভিসা পেয়ে ১৯৪৬ সালে ফের ভারতে এলেন ইউজেনিয়া। এ বার তাঁর ঠিকানা হিমালয়। হৃষীকেশ থেকে একটু দূরে টিহরির রাজবাড়ি। এখানেই লেখা হল তাঁর প্রথম বই, ‘যোগা: টেকনিক অব হেল্থ অ্যান্ড হ্যাপিনেস।’

বই লিখতে লিখতেই ইউজেনিয়া শুনেছিলেন, হৃষীকেশের এক  যোগীর কথা। কিন্তু আশ্রমে গেলে সেই যোগী সটান বলে দিলেন, ‘আমি এখন নিজের লেখায় ব্যস্ত। গুরুগিরি করতে পারব না।’ ইউজেনিয়া এতে দমে যাওয়ার পাত্রী নন। রোজ আশ্রমে যেতে শুরু করলেন। ফের কৃষ্ণমাচার্যের মতো ঘটনা। সন্ন্যাসী যোগ শেখাতে রাজি হলেন। আত্মজীবনীতে ইউজেনিয়া সন্ন্যাসীর নাম দেননি।  গবেষকদের ধারণা, ইনিই হৃষীকেশের স্বামী শিবানন্দ।

এর পর ভারত ছেড়েও একাকী বেরিয়ে গেলেন ইউজেনিয়া। পরের বছর ১৯৪৭ সালে তাঁর স্টপ ওভার আমেরিকা। লস অ্যাঞ্জেলেস। এখানে তাঁর যোগ স্টুডিয়োতে আসেন অলডাস হাক্সলে, গ্রেটা গার্বো, গ্লোরিয়া সোয়ানসন। কসমেটিক্স-টাইকুন এলিজাবেথ আর্ডেনও তাঁর কাছে যোগ শেখেন। ইউজেনিয়া তাঁদের বলেন, যোগ একই সঙ্গে ব্যায়াম ও রিল্যাক্সেশনের এক বিশেষ পদ্ধতি। ওজন কমাতে, অনিদ্রা সারাতে, মুখ থেকে বার্ধক্যের ছোপ দূর করতে যোগ খুব কার্যক্ষম।

অ্যালেন গিন্সবার্গ, জর্জ হ্যারিসন ও হিপিদের শান্তি খুঁজতে ভারতে আসা পরের ঘটনা। আমেরিকায় যোগের প্রথম ঢেউ আছড়ে পড়েছিল ধনাঢ্য, বিখ্যাত ও গ্ল্যামারাস মহিলাদের তটে। মেরিলিন মনরো, জেনিফার জোন্সও তখন ইউজেনিয়া তথা ইন্দ্রা দেবীর যোগ স্টুডিয়োতে অপেক্ষা করেন। ধনী নায়িকাদের খেয়ালি ফ্যাশন? কিন্তু পঞ্চাশের দশকের আমেরিকা মানে শুধু হলিউড, মেরিলিন মনরো নয়। আরও অনেক কিছু। এক দিকে সুপারমার্কেট, কনজিউমার বুম, অন্য দিকে পরমাণু বোমায় যে কোনও মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার চিন্তা। হার্ভার্ডের বায়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক হান্স সেলি সে সময়েই জানাচ্ছেন, সারা ক্ষণ টেনশনে থাকলে শরীরে কিছু হরমোন ক্ষরণের মাত্রা বাড়ে। তাতে দেহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাটা বোঝাতে পদার্থবিজ্ঞান থেকে একটি শব্দও ধার করেছেন তিনি: স্ট্রেস। ‘নতুন ছাত্রছাত্রীদের যখনই জিজ্ঞাসা করতাম, কেন যোগ শিখতে চাও, একটাই উত্তর পেতাম। সারা ক্ষণ স্ট্রেস, নার্ভের আর কিছু নেই,’ লিখছেন ইন্দ্রা দেবী। টেনশন ও তজ্জনিত রোগ থেকে বাঁচতে রামদেব আজ যে যোগাসনের কথা বলেন, ৫০ বছর আগেই হলিউডে সে সব বলে গিয়েছেন ইউজেনিয়া।

ইউজেনিয়া নামটা এখন অতীত। স্ট্রাকাটির সঙ্গে আইনসঙ্গত বিচ্ছেদ হয়নি ঠিকই, কিন্তু আমেরিকায় এসে সিগফ্রিড নাউর নামে এক জার্মান ডাক্তারকে বিয়ে করেছেন ইউজেনিয়া। তাঁর আমেরিকান পাসপোর্টে এখন জ্বলজ্বল করে নতুন নাম:ইন্দ্রা দেবী।

সোভিয়েত রাশিয়াতেও গিয়েছেন তিনি। ১৯৬০ সালের জুন মাসে খবর: ‘ক্রেমলিনে শীর্ষাসন। সোভিয়েত নেতাদের যোগ শেখাচ্ছেন হলিউডের ইন্দ্রা দেবী।’ ঘটনার পিছনে তাঁর সেই পুরনো বন্ধু। কেপিএস মেনন। তখন তিনি সোভিয়েত রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত। মেননের সাহায্যেই তাঁর সোভিয়েত রাশিয়ায় ভিসাপ্রাপ্তি। তার পর ইতিহাস। ক্রেমলিনের হলে এক নারী হঠযোগ নিয়ে বলছেন, সামনে তাবড় সোভিয়েত নেতারা। এ দৃশ্য পৃথিবী এক বারই দেখেছে।

শীর্ষাসনরত জওহরলাল নেহরু।

তাঁর শেষ জীবনটা কেটেছিল লাতিন আমেরিকায়। আর্জেন্তিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে। পুত্তাপার্থির সাইবাবার এক ভক্তের আমন্ত্রণে সেখানে পাকাপাকি ভাবে গিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে।

সাইবাবার ভক্ত হয়েছিলেন ষাটের দশকে। রাশিয়া সফর সেরে ফের ভারতে এসেছিলেন ইন্দ্রা দেবী, পুত্তাপার্থি তখন ছোট্ট শহর। আজকের মতো বিশাল হাসপাতাল, স্টেডিয়াম, এয়ারপোর্ট, কিছু নেই। আছেন তরুণ সাইবাবা, নিজেকে তিনি ঈশ্বর ঘোষণা করেছেন। সেখানে গিয়ে ইউজেনিয়া সাইবাবাকে মুখ থেকে শিবলিঙ্গ বের করতে ও হাত ঘুরিয়ে বিভূতি দান করতে দেখেন। লহমায় হয়ে গেলেন ঈশ্বরের ভক্ত।

গুরু-শিষ্যার সম্পর্কে চিড়ও ধরেছিল। ইন্দ্রা দেবী এক সময় পাকাপাকি ভাবে পুত্তাপার্থিতে থাকার কথা ভেবেছিলেন, সম্ভব হয়নি। তাঁর স্বামী নাউর তখন সেরিব্রাল স্ট্রোকে অসুস্থ, তাঁকে নিয়েই ভারতে এসেছিলেন ইন্দ্রা দেবী।

স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই ইন্দ্রা দেবী আর্জেন্টিনায়। ১৯৮৮ সালে এ দেশে এসেছিলেন গুরু কৃষ্ণমাচার্যের ১০০ বছরের জন্মদিনে। কৃষ্ণমাচার্য তখনও বেঁচে, গুরু-শিষ্যা দুজনে মিলে ‘অসতো মা সদ্‌গময়ো’ আবৃত্তি করেছিলেন।

২৫ এপ্রিল, ২০০২। ১০৩ বছরের মাতাজি টের পাচ্ছেন, তাঁর শরীর আর দিচ্ছে না। বছর পাঁচেক আগে, এক বার ভারতে যাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে পায়ে চোট পান। কালবিলম্ব না করে ফের বুয়েনস আইরেসে প্রত্যাবর্তন। সে ছয় বছর আগের কথা।

চোখে দেখেন না, সকালে বুয়েনস আইরেসের বাড়ির বারান্দায় বসে গান শোনেন আর পাখিদের খাওয়ান। স্মৃতিও আস্তে আস্তে লোপ পাচ্ছে। সাংহাই? কোথায় সেটি? আচ্ছা, তাঁর স্বামী সিগফ্রিডকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন না, ‘ইন্দ্রা দেবীর সঙ্গে জীবনটা ঠিক কেমন?’ সিগফ্রিড সত্যি ওই উত্তরটা দিয়েছিলেন, ‘ইন্দ্রা দেবী? তিনি তো সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ান।’ রসিকতা করেছিল? নাকি সেরিব্রাল স্ট্রোকে শয্যাশায়ী থাকতে থাকতে এ রকমই অভিমানী হয়ে গিয়েছিল?

আজ যে আর্জেন্টিনা থেকে পানামা, উরুগুয়ে সর্বত্র তাঁর ছাত্রছাত্রীদের তৈরি যোগের স্কুল, এটা দেখলেও অভিমানে মুখ ফিরিয়ে থাকত সিগফ্রিড? আর তাঁর প্রথম স্বামী স্ট্রাকাটি! মুম্বইয়ের বল ডান্স, সাংহাইয়ে বিমানহানা…. কিছুই আর মনে পড়ছে
না কেন?

সে দিন বিকেলেই নিউজ এজেন্সি মারফত খবরটা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। মাতাজি ইন্দ্রা দেবী আর নেই। খবরে ছিল প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানও। তাঁরা জানিয়েছিলেন, শেষ শয্যায় যোগীর মতোই প্রশান্ত দেখাচ্ছিল তাঁকে।