প রনে জমকালো স্যুটের কেতা। প্রৌঢ় গাড়ি থেকে নামছেন স্খলিত পদক্ষেপে। তাঁর সঙ্গীরা যেন যমদূত। দেখলেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। তারাই ধরে রেখেছে ভদ্রলোককে, কোনও মতে ধরে-ধরে এনে তাঁকে প্রকাণ্ড শোরুমের চেয়ারে বসিয়ে দিলে। কর্তার সাঙ্গোপাঙ্গদের হাতে উঁচিয়ে ধরা চোখ জুড়োনো সামগ্রীটি তবু ঝিকিয়ে উঠছে। চেয়ারে বসে ভদ্রলোক সে দিকে নির্দেশ করলেন। তার পর বললেন, ‘এটা নিতেই হবে তোমায়।’ বক্তার সঙ্গীদের চেহারা দেখে মুখে রা-টি কাড়ার সাহস হয় না টেবিলের ও-পারের লোকটির। খানিক বেসামাল প্রৌঢ় জড়িয়ে-জড়িয়েই বলেন, ‘ভুলে যেও না, তোমার দোকানের সঙ্গে আমাদের কয়েক পুরুষের সম্পর্ক। আমি কোনও না শুনতে এত দূর থেকে আসিনি।’

সোনা-রুপোর কাজ করা বাহারি নকশার সেই বিলিতি কোম্পানির বন্দুকখানা অতএব মাথা পেতে নিতে হল। বিনিময়ে ক্যাশবাক্স থেকে কাঁপা-কাঁপা হাতে মোটা টাকা বের করে দেন তরুণ দোকানকর্তা। বন্দুক হস্তান্তরের সময়ে রাজাসাহেব তৃপ্ত ভঙ্গিতে বরাভয়ের মুদ্রা ফুটিয়ে তোলেন। ঢাউস অস্টিন গাড়ি ফের স্টার্ট নেয়।

গল্পটা এখানেই শেষ নয়। পর দিন সকালেই সেই সাবেক নেটিভ জমিদারির নায়েবের ফের একই জায়গায় পদার্পণ। পুরো টাকাটা সঙ্গে করে এনেছেন। চাপা স্বরে বললেন, ‘রাজাসাহেবের মাথার ঠিক নেই। নিত্যনতুন মদ-মেয়েমানুষে ডুবে থাকা, এস্টেটেরও ভাঁড়ে মা ভবানী।’ মোদ্দা কথা, ‘বন্দুক ফেরত দিন। নগদ ফেরত দিচ্ছি।’ দোকানের কর্তাটি কথা বাড়ান না। রাজার ধন ফিরিয়ে দেন।

এ সব ঘটনা সেই আধা শতক আগের গপ্পো বটে! জমিদারি প্রথা তখন উবে যাব-যাব করছে। তবু সংশ্লিষ্ট চরিত্রটি কে, কোন এস্টেটের রাজা, তা আজও ফাঁস করবেন না কলকাতার দুই শতকের প্রাচীন বন্দুক-বিপণির কর্তা। ব্যবসার এথিক্স বলে একটা কথা আছে না! রাইটার্স বিল্ডিংয়ের কোনাকুনি, ডালহৌসি স্কোয়ারের সাবেক নরসিংহ দাঁ-এর দোকানে গল্পটা শোনা গেল।

সেই বন্দুক তার মালিকের কাছে ফিরে গিয়েছিল তখনকার মতো। তবে জমিদার-রাজপুরুষ থেকে সায়েবসুবো, নবাব-বাদশার অজস্র দুর্লভ সম্পত্তি এখন গচ্ছিত এই সব প্রায়ান্ধকার দোকানঘরের গোমড়ামুখো শোকেস-এ।

ধর্মতলার একেলে লেনিন সরণির মুখের এ টি দ’-এ ভারী ফটক ঠেলে ঢুকলেও বহু যুগ আগের সিপিয়া-আভা জগৎ। দেওয়ালে হরিণের শিঙের কারুকাজ, দু’ধারে ঢাউস আলমারির মাঝে রাশভারী এক দোহারা বৃদ্ধ। শোরুম যাঁর নামাঙ্কিত, সেই আশুতোষ দাঁ-এর উত্তরপুরুষ অনুপ দাঁ। কার্শিয়াংয়ের সাহেবি স্কুলের প্রাক্তনী কাটা-কাটা ইংরিজিতে ‘থ্রি ডব্লিউ’য়ের গল্প শোনাবেন।

না, ক্রিকেটের নয়, জীবনের তিন ডব্লিউ। ওয়াইন, উইমেন আর ওয়েপন। তিনটি বিনা সে কালের পুরুষমানুষ অচল। তবে এই তিনের পিছনে আরও এক ডব্লিউয়ের ছায়া। একেবারে ‘ক্যাপিটাল লেটার’-এর ডব্লিউ— ওয়েল্‌থ। অন্যতম ডব্লিউ ‘ওয়েপন’-এর সৌজন্যেই বাঁকুড়ার কোতুলপুরের গন্ধবণিক ঘরের নরসিংহ দাঁ একদিন ‘নারসিং দ’ হয়ে উঠলেন। তাঁর মেজপুত্তুর আশুতোষ দাঁ হলেন, এ টি দ’। তত দিনে তাঁরা জোড়াসাঁকোয় থিতু। নানা কিসিমের সুগন্ধি, সোরা-গন্ধকের কারবার থেকে কয়লাখনির বারুদ গোত্রের ‘ব্লাস্টিং পাউডার’ সরবরাহের কাজ শুরু করেছিলেন দাঁয়েরা। বারুদ এলে, বন্দুক আর কী করেই বা দূরে থাকে। এই দাঁ পরিবার অচিরেই হয়ে উঠলেন ‘বাঙ্গালার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বন্দুকওয়ালা’। সেটা কোম্পানির আমল। নরসিংহ দাঁ ও আশুতোষ দাঁয়ের নামে দোকান ছড়িয়ে পড়তে থাকে— হাওড়া, রানিগঞ্জ, রাঁচি, জামশেদপুরে।

সে দিনও ধর্মতলার এ টি দ’য়ে পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে এক তাড়া পুরনো পোস্টকার্ড বেরোল। তাতে দোকানের ভাঁড়ারের ফিরিস্তি। সম্ভ্রান্ত খদ্দেরদের কাছে পাঠানোর ছাপানো ক্যাটালগ। সেখানেই লেখা, প্রতিষ্ঠা ১৮৩৪। অবিভক্ত ভারতে বিলেতের বিখ্যাত এলি কোম্পানির টোটার নাকি একমেবাদ্বিতীয়ম ডিস্ট্রিবিউটার এই দাঁয়েরাই। এখনও তার কয়েকটা খোল পড়ে আছে। টোটা অবশ্য কালকের কথা। তারও আগে মাজ্‌ল-লোডিং গাদা বন্দুকেরও ছড়াছড়ি। মস্ত দু’নলা তুলতেই হাত টনটন। ব্যারেলের মুখ দিয়ে বারুদ ঠেসে ফায়ার করতে হতো।

শোকেসে ইউরোপ-আমেরিকার দেশ ধরে-ধরে লেবেল সেঁটে সাজানো বন্দুক-ভাঁড়ার। বন্দুক, রিভলভার, রাইফেলের সঙ্গে বিচিত্র তরোয়ালেরও সম্ভার। বাহারি অভিজাত ছড়িটি দেখলে বাইরে থেকে কিছু বোঝার জো নেই। মাটি থেকে উঠিয়ে চটজলদি ছিপি খুলতেই বন্দুকের নল চোখে চোখ রাখে। ছিপিতে ছদ্মবেশ। মাটিতে ঠুকঠুকিয়ে হাঁটার সময়ে ধুলো এড়াতে ছিপিতেই ব্যারেলের সুরক্ষা। পিছনে ট্রিগার, গুলি ভরার বন্দোবস্ত। সেই গুলি আর মেলে না। ছড়ির মালিকও বহু যুগ হল, জীবনের পরপারে।

এও এক উলট পুরাণ! সে-কালে সাবেক নেটিভ স্টেটের কেউ অর্ডার দিয়ে নতুন একটা গান বা পিস্তল করালেও নিমেষে খবর হয়ে যেত। তক্ষুনি পাশের কোনও নেটিভ রাজার লোক এসে বায়না ধরবে, আমাদেরও ঠিক তেমনটি চাই। ওরা রুপোর কাজ করা গান নিলে, পাল্টা জবাব দিতে এদেরও সোনার কাজ করা হাতিয়ার চাই। রাজসম্পত্তির এমন বহু শিল্পকর্ম এখন এই শোরুমেই বাণপ্রস্থে।

হাতি বিশারদ ধৃতিকান্ত লাহিড়ীর স্ত্রী শীলা লাহিড়ী চৌধুরী হাসেন, ‘এ সবই পারিবারিক গয়নার মতো। পরা যায় না, ঘরে রাখতে ভয় হয়, আবার ফেলে দেব, তাও ভাবতে পারি না!’ সাবেক কলকাতার মল্লিক বাড়ি, লাহা বাড়ি, পোস্তা-পাথুরেঘাটার বহু অভিজাত ঘরের পারিবারিক বন্দুকের ‘বৃদ্ধাশ্রম’ এখন নরসিংহ দাঁ-আশুতোষ দাঁয়ের দোকান। দাঁ-বাবুরা দফায় দফায় বন্দুক পালিশ করিয়ে বা দরকার মাফিক মেরামতে তা যত্নে রাখেন। লাইসেন্সধারীরা ইহলোকে থাকলে এই সম্পত্তি সামলানোর ভাড়া দেন নিয়মিত। বন্দুক অনাথ হলে সরকারি অনুমতি নিয়ে তার পরিচর্যা করেন দাঁয়েরাই।

ধৃতিকান্তবাবুর হাতি শিকারের বহুশ্রুত ৪৭০ ডাবল ব্যারেল গানটি এখন এ টি দ’য়ের শোরুমেই বিশ্রামরত। পুত্র দীপকান্তের নামে লাইসেন্স করিয়ে রাখা। তবে শীলার ভারী আদরের ১৬ বোরের শটগানখানা। সেটি তাঁর মায়ের বন্দুক। বাবা কিরণচন্দ্র রায় মধ্যপ্রদেশে ব্রিটিশ আমলের ফরেস্ট সার্ভিস অফিসার। রুগ্‌ণ বা মানুষখেকো বাঘ মারতেও তাঁকে কত বার বন্দুক হাতে নিতে হয়েছে। শীলার মায়ের জন্য ১৬ বোর শটগানখানা উনিই স্পেশাল অর্ডারে বিলেতের ম্যান্টন কোম্পানি থেকে তৈরি করিয়েছিলেন। যিনি বন্দুক চালাবেন, একেবারে তাঁর মাপমত তৈরি।

অস্ত্রবিপণি: ওপরে নরসিংহ দাঁ, নীচে এ.টি. দাঁ। দুটি দোকানই ধর্মতলার অফিসপাড়ায়।

আলমারি ঠাসা এই ইতিহাসের টানেই সে-দিন এসেছেন বন্দুকপাগল এক দল ডাচ সাহেব। নেট থেকে খোঁজখবর করে কলকাতায় এসে পথ চিনে ধর্মতলার এটি দ’য়ে হাজির। প্রত্যেকে মাথায় ছ’ফিট। দামাস্কাস ব্যারেলের পেল্লায় রাইফেল্ড গানটি ধরে তাঁদেরও হাত কেঁপে ওঠে।

‘বি কেয়ারফুল! ফোর বোর। দিস ইজ দ্য হেভিয়েস্ট। বহু মিউজিয়মেও সহজে এ জিনিস দেখতে পাবে না।’— বন্দুকবাড়ির কুলপতি ঈষৎ ছোট্টখাট্ট বাহাত্তুরে অনুপবাবু সাহেবদের ক্লাস নেন। তখন ইন্ডিয়া ও আফ্রিকা ছাড়া আর কোথাও নাকি চার বোরের এই ওজনদার বন্দুকের লাইসেন্স মিলত না। কারণ, হাতি ও গন্ডারের একমাত্র এ তল্লাটেই বিচরণ। রামায়ণের হরধনু বোধহয় এমনই ছিল। অনুপবাবু বলেন, ‘কাঁধে রেখে মারলে কলার বোন সরে যাবে। এ বন্দুক গাছে বেঁধে রেখে চালাতে হতো।’ সেই সঙ্গে খুব কাছ থেকে অব্যর্থ টিপে পাগলা হাতি মারার অপরিসীম মনের জোর আর সাহসের দরকার তো বলাই বাহুল্য।

‘এমন বন্দুক দেখতে আমি দশ কিলোমিটার হাঁটতে পারি!,’ সহাস্যে বলেন কলকাতার প্রবীণ বন্দুক বিশারদ অমিতাভ কারকুন।

তবে ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’র সময়ে সত্যজিৎ রায়ের অবশ্য দাঁয়ের সব ক’টা শোরুম তন্নতন্ন করেও বন্দুক পছন্দ হয়নি। কিন্তু ওয়াজিদ আলি শাহ (আমজাদ খান) বা জেনারেল উট্রাম (রিচার্ড অ্যাটেনবরো)-এর তরবারির জন্য কলকাতার বাইরে পা রাখার কথা এক বারও ভাবতে হয়নি তাঁকে।

ছবিতে ওয়াজিদ আলি শাহের সঙ্গে প্রায় অঙ্গাঙ্গি সোনার জলের কাজ করা সোর্ডটা ঢুকলেই চোখে পড়বে এটি দ’য়ের শোকেসে। আর ঝিনুকের কারুকাজ করা উট্রাম সাহেবের ‘মাদার অব পার্ল’ সোর্ড রয়েছে নারসিং দ’য়ে। দাঁ-বাবুরা বলেন, এ সব জিনিস পালিশ না করলেও জং ধরে না।

বনেদিয়ানা:
উপরে  হাতলওয়ালা লাঠিটি ভ্রম মাত্র। ওটি আসলে বন্দুকের খাপ। বাঁ দিকে বিভিন্ন আমলের  ‘মাজল লোডিং’ দুই বন্দুক। এগুলির মুখে বারুদ ঠেসে ট্রিগারে চাপ দিতে হত।

তখনকার বহু ছবিতেই স্ক্রিন জুড়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকারে এই দাঁয়েদের নাম। অনুপবাবুর ছোট ভাই অশোকবাবু, তাঁদের দাদা-খুড়ো-ভাই-ভাইপোরা একদা বহু শুটিঙেই হাজির হয়েছেন। ‘প্রণয়পাশা’-র সুচিত্রা সেনের জন্য ওয়েবলি আর কোল্ট— জোড়া রিভলভার নিয়ে যেতে হয়েছিল। সেটে ঢুকে ভিড় দেখে রাশভারী ম্যাডাম কিঞ্চিৎ বিরক্ত, পরে অস্ত্র সরবরাহকারীদের চিনতে পেরে সসম্ভ্রমে তাঁদের মেশিন নিয়ে বাছাই করেন। দুটোর ওজন, আদল পরখ করে কোল্ট পছন্দ করেছিলেন ম্যাডাম। এর পরে সৌমিত্রের সঙ্গে ঝগড়া, ধস্তাধস্তির সেই বিখ্যাত দৃশ্যে সুচিত্রার হাত থেকে গুলি ছুটে যাওয়ার মুহূর্ত। তারও আগে ‘সব্যসাচী’! হঠাৎ পুলিশ এসে পড়ায় ঘরের লাইট ভেঙে উত্তমকুমারের পালানোর দৃশ্যে  দাঁ-বাড়ির ছেলেই গুলি ছুড়ে ‘বাল্ব’ ভেঙেছিলেন।

আর ‘দো আনজানে’-র শুটিঙে ঘরের মধ্যে অমিতাভ বচ্চনের গুলি করে আয়না ভাঙার দৃশ্যটিতে আসলে গুলি চালান অশোকবাবু। গ্র্যান্ড হোটেলের ঘরে শ্যুটিং। ‘অমিতাভ ফল্‌স ফায়ার করলেন। আর আমি এক টেকে গুলি করে আয়না ভেঙে দিলাম’, সগর্বে বলেন অশোকবাবু।

বন্দুক রিপেয়ারিংয়ে ভুটানের রাজপরিবার আজও কলকাতার এই দুই দোকানের দ্বারস্থ হয়। বন্দুক-বিপণিতে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি বন্ধ সেই ’৮০-র দশক থেকে। অর্ডিন্যান্স কারখানার বন্দুক-টন্দুকে ব্যাঙ্ক-অফিসের সিকিউরিটির বন্দোবস্ত হয়। কিন্তু দাঁ-বিশ্বাস-ভঞ্জদের মতো বন্দুক-বিপণি শুধু টোটা আমদানি করতে পারে।  যে যুগের যা নিয়ম!

দাঁ-বাড়ির দুর্গোৎসবে এখনও উইনচেস্টার কোম্পানির পুঁচকে ১৭ ইঞ্চির কামান দেগেই সন্ধিপুজোর সূচনা। সমকাল ও ইতিহাস তখন মিলেমিশে একাকার।

ছবি: শুভেন্দু চাকী