সকাল সাড়ে আটটা। খালসা আশ্রমের বৃন্দাবন দাস বাবাজি এ গলি ও গলি পার হয়ে, রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গোরু সরিয়ে, বাঁদরের উৎপাত উপেক্ষা করে আমাদের নিয়ে চলেছেন বাঁকেবিহারিজীর মন্দিরে। কিন্তু এত বেলা করে কেন? বাবাজি হেসে বললেন, “আরে সারা রাত্তির প্রেম করে বিহারিজী ক্লান্ত। আটটার আগে ঘুম থেকে ওঠেন না।”

খানিক পর বৃন্দাবনের মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে কয়েক হাজার দর্শনার্থীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে মূর্তি পর্দা দিয়ে ঢাকা। কী ব্যাপার? “বেশিক্ষণ দেখলে হয় আপনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন, না হয় বিহারিজী আপনার প্রেমে পড়ে যাবে। তাই থেকে থেকে পর্দা সরান হয়। কিছুক্ষণ দর্শনের পর আবার ঠাকুর ঢেকে দেবে। একে ‘ঝাঁকি দর্শন’ বলে।

হেসে বললাম, “বলেন কী!”

বললেন, “তবে আর বলছি কী! আগে এ অবস্থা ছিল না। তখন সারাক্ষণ ঠাকুর দেখা যেত। ওই তাকিয়ে থেকে থেকেই রাজস্থানের এক রাজকন্যে বিপত্তি বাঁধিয়েছিল। ঠাকুর এমন প্রেমে পড়ল যে, চলল সে মেয়ের পিছু পিছু রাজস্থান। সে অনেক সাধ্যসাধনা করে তবে আবার তাঁকে বৃন্দাবনে ফেরান হয়। সেই থেকে ব্রজবাসীরা আর রিস্ক নেন না।”

আরও পড়ুন, দ্বীপের নাম হেনরি

পর্দার দিকে তাকিয়ে আছি। সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ভক্তকুল অস্থির। হঠাৎ হইচই! মণ্ডপ জুড়ে লোক চেঁচাচ্ছে, “রাধে রাধে! শ্যাম কি পেয়ারি–রাধে রাধে! দর্শন দে দে–রাধে রাধে! ব্রজ কী ছোঁড়ি–রাধে রাধে!” বাবাজিও দু’হাত তুলে “রাধে রাধে।”

পর্দা সরে গেল। দেখলাম বাঁশি হাতে রাজবেশে বাঁকেবিহারি দাঁড়িয়ে। প্রবাদ বলে, তানসেনের গুরু স্বামী হরিদাসজীর হাতে সাক্ষাৎ বাঁকেবিহারিজীই নিজের এই মূর্তি তুলে দিয়েছিলেন। এ হরিদাসের সেবিত বিগ্রহ।

সব হল। কিন্তু প্রশ্নটা মনে তখনও খচখচ করছে। মন্দির থেকে বেরিয়ে বাবাজিকে জিগ্যেস করলাম, “দেখাতে নিয়ে গেলেন কৃষ্ণকে আর চেঁচালেন ‘রাধে রাধে’ বলে?”

ভদ্রলোক অবাক, “বোঝো কাণ্ড, আপনি দেখছি কিছুই বোঝেন না। আরে বৃন্দাবন রাধাভূমি মশাই। এ রাধাবন। এখানে রাধা আগে, তারপর গিয়ে আপনার বিহারিজী। শ্যামসুন্দর এখানে মন্দিরে সেবিত...রাধারানি ব্রজের হৃদয়ে।”

আরও পড়ুন, সুগন্ধী সৌন্দর্যে মোড়া গঙ্গাপারের শহর ফলতা

থমকে গেলাম। বলে কী! তাই কি ব্রজের অলিগলিতে হাঁটলে আস্তে আস্তে বাঁশির শব্দ ছাপিয়ে নূপুরের আওয়াজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে?

আমি তো ভেবেছিলাম ‘মন্দির’-এ গিয়ে প্যাকেট করা প্রসাদ চড়িয়ে খানিক ভজন আর কীর্তন করে চাট্টি পুণ্যি করব। কিন্তু এ যে দেখছি ভক্তির যোগ ছাপিয়ে প্রেমের গুণ এগিয়ে যাচ্ছে। নাকি রাধারানির প্রতি ভক্তিযোগ একটু বেশি?

মন্দিরের বাইরের সকালবেলার কলরব, ঘণ্টার শব্দ, খুলে রাখা চপ্পলের ভিড়, টিকি বাঁধা পুরুত, নাকে তিলকসেবা করা ভিখিরি, বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ, কাঁখে-কোলে বাচ্চার চাঞ্চল্য, লস্যির দোকানের হাঁকডাক, সরু গলি, তাতে ডাঁই করে একপাশে ফেলে রাখা গতকালের ফুল-তুলসিপাতা আর তালপাতার ঠোঙা, ঝাড়ুদারের ঝাঁটার ‘মশমশ’ শব্দ— আর এ সব ছাপিয়ে দেবদেবীর ছবি রাখা এক ঘুপচি দোকান থেকে ভেসে আসা ক্যাসেটের গান, “রাধে রাধে হি সরকার।”

বৃন্দাবনের সেবাকুঞ্জ। — নিজস্ব চিত্র।

বিপিন পণ্ডিত আমার হাত ধরে ভিড় ঠেলে গলির মুখের দিকে নিয়ে চলেছেন। হেসে বললেন, “প্রেমের জোয়ার ভাই, ভেসে গেলে সামলানো মুশকিল।” গলির মুখে পৌঁছে রাস্তার বাঁ দিক দেখিয়ে বললেন, “এ পথ ধরে একটু গেলেই সেবাকুঞ্জ। আপনি ‘কৃষ্ণরাধা’ বলেন না ‘রাধাকৃষ্ণ’ বলেন, সেটা ভাবতে ভাবতে চলে যান। দেখবেন কে আগে আর কে পরে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আপনার বৃন্দাবন ভ্রমণ আনন্দময় হোক।”

তুলসিপাতা দিয়ে যে ভ্রমণ শুরু করতে চেয়েছিলাম, তাতে এ ভাবে কদমগাছ এসে পড়বে ভাবিনি। শুনে এসেছিলাম ‘লীলাক্ষেত্র’। তাই যদি হয়, তবে তো ‘লীলাময়’-এর মাহাত্মই অধিক হওয়ার কথা। কিন্তু বাবাজি যে বললেন...

চৈত্রের রোদ্দুরে বৃন্দাবন এক মিঠে সর্বনাশ হয়ে ধরা দিচ্ছিল, আস্তে আস্তে!

বাঁকেবিহারি মন্দিরকে বাঁ পাশে রেখে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে পাঁচ মিনিট হাঁটলে সেবাকুঞ্জ। এক বাগান, তার চারপাশে পরিক্রমার পথ আর একধারে এক মন্দির, যাতে যুগলবিগ্রহ শোভিত। সে মূর্তিতে দেখি কৃষ্ণ রাধার হাঁটু ছুঁয়ে আছেন। কী ব্যাপার? পুরোহিত পিন্টু মহারাজ বলছেন, “মহারাসের পর রাধারানির পায়ে খুব ব্যথা। তিনি কৃষ্ণকে বলছেন, ‘আমি আর হাঁটতে পারব না। তুমি আমায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাবস্থা কর।’ শ্যাম তখন রাধাকে কোলে করে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। আর এইস্থানে রাধারানির পা টিপে দিয়েছিলেন। সাক্ষাৎ গিরিধারী রাধার পদসেবা করেছিলেন এখানে, তাই এই বাগান সেবাকুঞ্জ।”

বৃন্দাবনের প্রকৃতি। — নিজস্ব চিত্র।

বসে ভাবছি। মহারাজ বললেন, “কীসের চিন্তা? বলুন ‘রাধে রাধে’।”

সে না হয় বললাম, কিন্তু ভক্তিমার্গ ছাপিয়ে এই যে বড় সাধারণ প্রেমমার্গ এগিয়ে যাচ্ছে থেকে থেকে, এ ভারি চমৎকার লাগছে যে! আর মহাভারতের প্রবাদপুরুষকে যিনি এ ভাবে ছাপিয়ে যান বার বার, তাঁর প্রতি এ কী অনুভব করছি— প্রেম, ভক্তি না সখ্য?

আমার ভ্রমণ উঠেছে মাথায়। ব্রজের দর্শনীয় স্থানগুলোকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এক, কৃষ্ণ যে যে জায়গায় অসুরনিধন করেছিলেন। দুই, যে যে স্থানে গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের সাধকেরা সাধনা করেছিলেন (এখানে মনে রাখা দরকার, আমাদের চৈতন্যদেব তথা তাঁর ছয় গোঁসাই না থাকলে আজ ব্রজভূমি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হত। ইতিহাস বলছে, ১০১৮ সালে মহম্মদ গজনী মথুরাতে যে আক্রমণটা করেছিলেন, তাতে শুধু লুঠপাট নয়, মন্দির ধ্বংসও রীতিমতো সামিল ছিল। ঐতিহাসিক তারিখি জামিনা বলছেন, একশোরও বেশি উট লেগেছিল মথুরার সম্পদ নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারপর ফিরোজা খান জুঘালাক চোদ্দোশো শতকের শেষভাগে মথুরা আক্রমণ করেন। শেষে সিকান্দার লোধি ১৫০০ সালে ফের ব্রজে লুঠপাট চালান। ভাগ্যিস মহাপ্রভু ১৫১৪ সালে ব্রজে এসেছিলেন)। আর তিন, যে যে স্থানে রাই আর শ্যাম প্রেম করেছিলেন। অথচ সব ছাপিয়ে এই তিন নম্বরই মনমাঝে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। ভক্তি, বৈরাগ্য, সাধনা সব শিকেয় তুলে বহু পথিক আজ এ নগরে খুনসুটির আনাচ-কানাচ খুঁজে ফেরে।

এখানে একটা ব্যাপার বলি। এই যে থেকে থেকে ‘ব্রজ-ব্রজ’ করছি, এই ব্রজ কিন্তু শুধু বৃন্দাবন নয়। প্রায় চুরাশি ক্রোশ জায়গা জুড়ে মহাপ্রভু ব্রজমণ্ডল আবিষ্কার করেছিলেন। তাতে আজকের দিনে আংশিক ভাবে তিনটে রাজ্য— উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা আর রাজস্থান এসে মিশেছে। এই সম্পূর্ণ জায়গাটি ব্রজমণ্ডল– মহাপ্রভুর খোঁজে কৃষ্ণের ছেলেবেলার লীলাক্ষেত্র। এর মধ্যে অন্যতম বৃন্দাবন। এ ছাড়া রয়েছে মথুরা, নন্দগ্রাম, গোকুল, যাবোট (রাধারানির শ্বশুরবাড়ি) ও আরও ছোটখাটো অনেক জায়গা।

যাই হোক, ফিরে আসি পদসেবায়। পদসেবা কৃষ্ণ শুধু সেবাকুঞ্জে করেননি। মহাকাব্য বাসুদেবকে দিয়ে ঋষিকুলের পাদপ্রক্ষালন করিয়েছে পাণ্ডবদের অশ্বমেধ যজ্ঞাগারে। তখনকার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরুষোত্তমের এহেন কাজ ‘সাধু সাধু’ রবও তুলেছিল। কিন্তু সে মাহাত্ম তো দেখছি স্মৃতির অতলে। মনমাঝে সেবাকুঞ্জর এই নিপাট প্রেম বড় বেশি জ্বলজ্বল করছে।

আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলাম, এখানে পুরুষোত্তম কৃষ্ণকে গীতার শ্লোক দিয়ে চেনার লোক কম। তার চেয়ে ভাগবতের পংক্তি ব্রজবাসীর অনেক কাছের। এখানে তিনি জগৎ নাথ পরে, আগে রাইয়ের প্রেমিক। আর তাই নিয়ে চারিপাশে মিঠে সমালোচনা। এ নগরীতে প্রেমের প্রতিটা স্তরে এক কৃষ্ণ যুবককে হার মানতে হয়েছে, থেকে থেকে প্রিয়ার মানভঞ্জন করতে হয়েছে এবং প্রতি পদে বুঝিয়ে দিতে হয়েছে যে, ‘তুমি বিনা গতি নেই’।

নিধুবন। — নিজস্ব চিত্র।

আর এই ‘তুমি বিনা গতি নেই’ গোছের প্রেমেই বৃন্দাবন মোড়া।

চণ্ডীদাসের কাব্যে পড়েছিলাম রাধা দু’হাত তুলে কৃষ্ণের প্রতি আকুতি জানিয়েছেন। ইস্কুলে বাংলা ক্লাসে মাস্টারমশাই বলেছিলেন, এহেন দু’হাত তুলে প্রার্থনা জানানোর মানে সম্পূর্ণ সমর্পণ। এখানে এসে ইস্তক দেখছি ‘সমর্পণ’টা একই আছে, শুধু ভূমিকায় অদলবদল হয়ে গেছে। এই সরু অলিগলি-লাঞ্ছিত নগরে, অমুক গোয়ালার বাড়ির পেছন দিয়ে, মাধুকরিতে বেরোন বৈষ্ণবদের ভিড় ঠেলে, থরে থরে সাজান মন্দির পার হয়ে, আনাচে-কানাচে, পুকুরপাড়ে, বাগানে— সর্বত্র শ্যাম রাইয়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন অনায়াসে অতি আনন্দে।

রাই শ্যামের আগে, এ মানতে বিশেষ কষ্ট হয় না। অবাক লাগে সেইখানটাতে যেখানে দেখি, শ্যাম রাইয়ের পরে! আর মজা লাগে সেই সেই জায়গায়, যেখানে বরসানার ফর্সা মেয়েটা নন্দগ্রামের কালো ছেলেটাকে প্রেমে রীতিমতো নাকানি-চোবানি খাওয়ায়।

এ নগরজুড়ে সমর্পণের আঁচ ছড়িয়ে। কখনও ফেরিওয়ালার বাঁশিতে সে আঁচ, কখনও এ রাস্তা সে রাস্তা পার হয়ে নগরের উত্তরে এসে রাধাদামোদর মন্দিরকে পাশে রেখে লোটনকুঞ্জে তার বিবরণ। গল্পে মোড়া শহরে লোটনকুঞ্জ আরও এক গল্প নিয়ে বসে। কৃষ্ণবিরহে রাই এইস্থানে নাকি ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়েছিলেন। রাইয়ের সে ‘গড়াগড়ি’ বৃথা যায়নি। শ্যামকে এসে রীতিমতো ‘কুঞ্জমধ্যে প্রবেশ পূর্বক দর্শন প্রদানান্তে বিলাসাদি’ করতে হয়েছিল। তাই এ জায়গার নাম লোটনকুঞ্জ।

স্থানমাহাত্মে বেশ বোঝা যায়, ব্রজের ওই যুগল কিশোরকিশোরীর চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে বিশেষ অতৃপ্তি নেই। বর্তমানে লোটনকুঞ্জে নিতাই-গৌর বিগ্রহের আরাধনা হয়। অপেক্ষাকৃত জায়গাটা নিরিবিলি। চারপাশে ব্রজবাসীদের দালান, কারোর বাড়ির তুলসীতলা তো কারোর গোয়াল। কোথাও ঝুপড়ি চায়ের দোকান তো কোথাও সরু গলিপথ। লুকিয়ে প্রেম করবার পক্ষে আদর্শ। আর কেউ তাড়া দিলে এ গলি ও গলি বেয়ে সোজা যমুনার তীরে পালান যায়।

সেই পালিয়ে যাওয়ার গলিপথ ধরে দৌড়লে যমুনাপুলিন। সামনে বড় রাস্তা। পাশে শৃঙ্গারবট।

এখানে বাচ্চারা ঝুড়িতে করে ফুল বিক্রি করে। “পাঁচ রুপিয়া এক টোকরি,” মন্দির দেখিয়ে বলে, “শাম-কে লিয়ে লে যাও, রাই-কে লিয়ে লে যাও।”

বট তো বুঝলাম, কিন্তু শৃঙ্গারবট কী? না, এখানে কানহাইয়া প্রেমিকার মানভঞ্জন করার উদ্দেশ্যে নিজের হাতে তাঁর শৃঙ্গার রচনা করেছিলেন। রাসরজনীতে যে বটগাছের নীচে বসে শ্যাম রাইকে সাজিয়েছিলেন, সেই গাছ শৃঙ্গারবট নামে এখনও পূজিত। ইমলিতলা থেকে একটু হাঁটলেই সে বট। চৈত্রের রোদ্দুরে বড় উজ্জ্বল সে জায়গা। হবে না? প্রেমের প্রকট সাক্ষী যে।

এহেন প্রকট প্রেম নিয়ে বেশ রসেবশে আছে বৃন্দাবন। শৃঙ্গারবটের কাছেই ঝাড়ুমণ্ডল। কী ব্যাপার? এক ভাঁড় চা হাতে দিয়ে দোকানি বলে, “নন্দগ্রামের সেই কালো ছোঁড়া বড় চালাকি করতে গেছিল। আমাদের রাইকে উত্যক্ত করতে রাসস্থলী থেকে পালিয়ে এখানে চলে আসে। আর যায় কোথা। শেষে রানির মানভঞ্জন করতে হয়েছিল একটু দূরে, ওই ওপাশে– যমুনাপাড়ে। গোবিন্দঘাটে বসে।” কথকঠাকুরকে তাই এখানে গান বাঁধতে হয়েছে:

“খুঁজিতে খুঁজিতে কৃষ্ণ এইস্থানে আসিয়া।

রাধার সঙ্গে মিলন হইল রঙ্গিয়া।।

সেইজন্য গোবিন্দঘাট সর্বলোকে বলে।

কামনা থাকিলে মনে দর্শনেতে ফলে।।”

 

এ যে দেখছি বড় মিঠে লড়াই। তাতে মেয়েটার জিত, আর ছেলেটার হার। বোঝার জন যদিও ভালমতোই বোঝে যে এ হারেই জিত।

তবে প্রেমের প্রেক্ষাপটে এ হারজিতের খেলাও পাল্টেছে কখনও কখনও। আদিবদ্রী ঘাটের দক্ষিণে সেই যে যেখান দিয়ে যমুনার কালো জল বয়ে যায়, সেই রাজঘাট বলে, ওহে না হে না! শুধু কিশোরীই জ্বালায়নি ছোঁড়াকে, তোমার শ্যামও বড় একটা শান্ত ছিল না বাপু।

ঘাটের বাঁধানো বেদীতে বসে সাড়ে তিন হাজার বছর পিছোলে তবে বোঝা যায় যে রাই কৃষ্ণকে শুধু মনে নেয়নি, মেনেও নিয়েছিল, ‘তা সে যতই কালো হোক...’। স্বরূপদাস বাবাজি চুরাশি ক্রোশ ব্রজমণ্ডল গ্রন্থে লিখছেন, “কোন একদিন শ্রীমতী রাধারাণী মথুরার বাজারে সখীগণ সঙ্গে দুধ, দই, মাখন ইত্যাদি বিক্রি করিবার জন্য যমুনার তটে আগমন করিয়া যমুনা পার হইবার জন্য কোন সাধন খুঁজে পাইতেছেন না। এমতাবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নাবিক সাজিয়া যমুনার ঘাটে উপস্থিত হইলেন।” তারপর শুরু দরাদরি। মাঝি ষোলো আনার কমে কিছুতেই যাবে না। অগত্যা রাই তাই হাতে দিয়ে উঠে পড়ল নৌকোয়। বিক্রি উঠল মাথায়। কী ব্যাপার? না মাঝযমুনায় এসে মাঝি বলে, “ও সব আর বিক্রির দরকার নেই। আমিই খেয়ে নিই। কি বল মেয়ে?” বলে কী? মাঝি মাঝদরিয়ায় এই বুঝি ডোবাল সব। এ যে চেনা চেনা ঠেকে, “ওমা! তুমি?” সেই নদীতে ছোট্ট এক নৌকোয় মুখোমুখি বসে সমর্পণ। হাসিমুখে নিজের হাতে মাখন খাইয়ে দিয়েছিলেন শ্যামকে। কে জানত তখন, এ আবদারও এক কালে ইতিহাস হবে। তাতে কেউ খুঁজে পাবে ভক্তিযোগ, কেউ বা কবির কল্পনা। আর আমার মতো অল্পবুদ্ধির যাত্রী অবাক হয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাববে, “পেটে পেটে এত?”

ঘোর লেগে আসছিল। বৃন্দাবনের পরতে পরতে বড় আধুনিক প্রেমের ছবি। আর তাতে নূপুর আর বাঁশির যুগলবন্দি। কোন ঘরানার বন্দিশে এ তান বাজছে, তা ভাবতে ভাবতে কখন রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছি নিজেও জানি না। চমক লাগে তিন মাত্রার তিহাইতে, “রাধে রাধে রাধে!”

চমকে দেখি এক রিকশাওয়ালা পাশ চাইছে। মুখে রানির নাম। হেসে সরে এলাম। আমায় হাসতে দেখে এক স্থানীয় বৃদ্ধ বললেন, “বৃন্দাবনের রিকশাতে ভেঁপু পাবেন না। এখানে ‘রাধে রাধে’ই হর্ন।”