বীরগোবিন্দপুরের দক্ষিণা কালী: বীরগোবিন্দপুর গ্রামটি পুরীর মূল শহর থেকে বেশি দূরে নয়। এখানে অবস্থিত মন্দিরটি দক্ষিণা কালীর পীঠ হিসাবে পরিচিত। এটি পুরীর অন্যতম জাগ্রত শাক্ত মন্দির। প্রতি বছর কালীপুজোর সময় এখানে দেবীর বিশেষ আরাধনা করা হয়।
জগন্নাথের সঙ্গে মূর্তির সাদৃশ্য: এই মন্দিরের কালী মূর্তিটি দেখতে জগন্নাথ দেবের মতো! দেবীর কৃষ্ণকায় মুখমণ্ডল, বড় বড় চোখ এবং ঠোঁটের আকার জগন্নাথের বিগ্রহের মতো। এই সাদৃশ্য দেখে প্রথম বার অনেকেই চমকে ওঠেন। শুধু এই মন্দিরেই নয়, পুরীর আরও কয়েকটি কালী মূর্তিতে এই মিল দেখা যায়।
মূর্তির গঠন ও অলঙ্কার: দেবী হলেন চতুর্ভুজা বা চার হাতযুক্তা দক্ষিণা কালী। জগন্নাথের মতো মুখের গড়ন হলেও তাঁর লাল জিভ বাইরে বের করা। তাঁর হাতে অস্ত্র এবং গলায় মুণ্ডমালা রয়েছে। পদতলে মহাদেব শায়িত, যা দেবী কালীর চিরায়ত রূপ।
জগন্নাথ রূপে কালী (মিথ ও বিশ্বাস): পুরীর ভক্তদের বিশ্বাস, প্রভু জগন্নাথ লীলাবিলাসে গণদেবতা রূপে প্রকাশিত হন। ভক্ত তাঁকে যে রূপে কল্পনা করেন, তিনি সেই রূপেই ধরা দেন। এই কারণে কালী রূপে জগন্নাথের কল্পনা এখানে সম্ভব হয়েছে। ওড়িশায় কালীপুজোর সময় এমন জগন্নাথের মতো দেখতে একাধিক মূর্তি তৈরি হয়।
শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের সমন্বয়: শাস্ত্রে জগন্নাথের সঙ্গে দক্ষিণা কালীর যোগসূত্র স্পষ্ট। কালিকা পুরাণ-সহ একাধিক তন্ত্র পাঠে এই যোগের উল্লেখ আছে। এমনকী, বীজ মন্ত্রেও কালী ও জগন্নাথকে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে! এই মন্দির শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের এক অনন্য সমন্বয়ের প্রতীক।
মন্দিরের বিশেষত্ব ও রক্ষক দেবী: বীরগোবিন্দপুর গ্রামের এই মন্দিরটি সব চেয়ে প্রসিদ্ধ। মন্দিরের দেবী জগন্নাথ মন্দিরের রক্ষক হিসেবে পরিচিত। তিনি জগন্নাথ মন্দিরের হেঁশেলের বা রন্ধনশালাটির অভিভাবক। তাই পুরীর প্রধান রীতি নীতিতে দক্ষিণা কালীর বিশেষ স্থান রয়েছে।
জগন্নাথ এবং অন্যান্য দেব-দেবী: তন্ত্র মতে, শুধু জগন্নাথ নয়, তাঁর ভাই বলরামের সঙ্গেও উগ্রতারার যোগ আছে। তাঁদের বোন সুভদ্রার সঙ্গে ভুবনেশ্বরীর যোগও স্পষ্ট। কেউ কেউ মনে করেন, বীরগোবিন্দপুরের এই দক্ষিণা কালী মূর্তি সেই যোগসূত্র থেকেই অনুপ্রাণিত।
পুজোর পদ্ধতি ও প্রথা: জগন্নাথের মূর্তি দেখতে একই রকম হলেও পুজোর ধরনে পার্থক্য রয়েছে। জগন্নাথ দেবের পুজো সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে হয়। অন্য দিকে, বীরগোবিন্দপুরের দক্ষিণা কালীর পুজো হয় শাক্ত মতে। এখানে দেবীর প্রসাদে মাছ-মাংস দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
বার্ষিক আরাধনা: সারা বছর মন্দিরে দেবীর একটি কাঠামো রাখা থাকে এবং তাতে পুজো হয়। কার্তিক অমাবস্যায় (কালীপুজোয়) ঘটা করে বার্ষিক পুজোর আয়োজন করা হয়। সেই সময় বিশেষ মূর্তি আনা হয় মন্দিরে, যা জগন্নাথের মতো দেখতে। এই সময় হাজার হাজার ভক্ত মা কালীর আশীর্বাদ নিতে ভিড় করেন।
ভক্তদের বিশ্বাস ও ফলশ্রুতি: প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দক্ষিণা কালীর পুজো করলে স্বয়ং জগন্নাথ তুষ্ট হন। পুরীর ভক্তরা তাই জগন্নাথ দর্শনের পাশাপাশি এই মন্দিরও ঘুরে আসেন। দেবী কালী মহাবিদ্যার অংশ, তিনি কালের নিয়ন্ত্রক। এই সমন্বিত রূপ ভক্তদের মনে একাধারে শক্তি ও ভক্তির প্রেরণা জোগায়। (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।)