ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ডানা ছাঁটতে কড়া ব্যবস্থা সেবি-র

ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাঙ্কঋণ খেলাপ করায় রাশ টানতে কড়া ব্যবস্থা নিল সেবি। বিজয় মাল্যের ৯ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্কঋণ বাকি রেখে ভারত ছাড়ার ঘটনার জেরেই সেবি তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নিল বলে মনে করছেন ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে মাল্য কাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, দেশে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা দুর্বল।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০১৬ ০৩:২৫
Share:

ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাঙ্কঋণ খেলাপ করায় রাশ টানতে কড়া ব্যবস্থা নিল সেবি। বিজয় মাল্যের ৯ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্কঋণ বাকি রেখে ভারত ছাড়ার ঘটনার জেরেই সেবি তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নিল বলে মনে করছেন ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে মাল্য কাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, দেশে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা দুর্বল।

Advertisement

এ বার থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যে-সমস্ত সংস্থা বা ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির তকমা দেবে, তাদের কাউকে শেয়ার বা বন্ডের বাজার থেকে টাকা তুলতে দেওয়া হবে না। এত দিন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট সংস্থার ব্যাঙ্কঋণ পাওয়া বন্ধ করত রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এ বার যাতে ওই সব সংস্থা শেয়ার বা বন্ডের বাজার থেকেও মূলধন সংগ্রহ করতে না-পারে তার ব্যবস্থা করল সেবি। পাশাপাশি, নিজের সংস্থা তো বটেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসাবে ঘোষিত কোনও ব্যক্তি শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত অন্য কোনও সংস্থার পরিচালনভারও হাতে নিতে পারবেন না। সেটির পরিচালন পর্ষদের সদস্যও থাকতে পারবেন না। শনিবার সেবি-র পরিচালন পর্ষদের বৈঠকের পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইউ কে সিন্‌হা এ কথা জানিয়ে বলেন, বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পরেই নতুন নিয়ম চালু হবে। পরিচালন পর্ষদের ওই বৈঠকে যোগ দেন স্বয়ং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। বৈঠকের পরেই সেবি চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের কাছে এই সব সিদ্ধান্তের কথা জানান।

ঋণখেলাপি সংস্থা ও ব্যক্তিদের ডানা ছেঁটে তাদের বাগে আনতে সেবি-র নির্দেশের তালিকায় আরও বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সেগুলি হল:

Advertisement

•কোনও মিউচুয়াল ফান্ড চালু করতে পারবে না ওই ব্যক্তি বা সংস্থা

• শেয়ার ব্রোকারেজ সংস্থা খোলার অনুমতি মিলবে না

Advertisement

• নতুন সংস্থা খোলার জন্য রেজিস্ট্রেশন মঞ্জুর হবে না। এ জন্য ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার পার্সন’ হিসাবে যোগ্যতা অর্জনের নিয়ম সংশোধন করা হবে।

মূলত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসাবে ঘোষিত কিংফিশার এয়ারলাইন্সের মালিক এবং ইউবি গোষ্ঠীর কর্ণধার বিজয় মাল্যের মতো শিল্পপতিদের কথা মাথায় রেখেই সেবি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করছে মূলধন বাজার মহল। প্রবীণ শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞ অজিত দে বলেন, ‘‘এই সিদ্ধান্ত আরও আগে নিলে ভাল হত। সেবি-র সিদ্ধান্ত যাতে সঠিক ভাবে কার্যকর হয়, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সেবি-র কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।’’ তবে বর্তমানে ঋণখেলাপি ঘোষিত সংস্থার ইতিমধ্যেই বাজারে ছাড়া শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে সেবি-র নতুন নিয়ম কোনও বাধা সৃষ্টি করবে না।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে অবশ্য সেবি নিষেধাজ্ঞা আনেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর। যেমন,

প্রথমত, বাজারে শেয়ার ছাড়তে না-পারলেও প্রোমোটার-সহ বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের কাছে রাইটস ইস্যু, প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বা প্রেফারেন্সিয়াল অ্যালটমেন্ট-এর মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করা যাবে। ঋণখেলাপিরা যাতে ইচ্ছা করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থায় নিজেরা নতুন মূলধন বিনিয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্যই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সংস্থার সাধারণ ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডাদের স্বার্থরক্ষার কথা মাথায় রেখেই এই ব্যবস্থা সেবি নিয়েছে বলে মত মূলধনী বাজার মহলের।

দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট সংস্থা যদি অধিগ্রহণের পথে যায়, তা হলে ঋণখেলাপি ঘোষিত হলেও ওই সংস্থার প্রোমোটার, ডিরেক্টররা সংস্থা হাতে নেওয়ার জন্য দামের প্রতিযোগিতায় (কম্পিটিং অফার) অংশ নিতে পারবেন।

প্রসঙ্গত, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সংজ্ঞা অনুযায়ীই ব্যাঙ্ক কোনও ঋণগহীতাকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঘোষণা করে থাকে। যতক্ষণ কোনও ব্যাঙ্ক সেই ঘোষণা না-করছে, ততক্ষন কাউকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির শ্রেণিতে ফেলা যায় না। যে-সব ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক কাউকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঘোষণা করতে পারে সেগুলি হল:

১) সাধারণত কোনও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়ার পরে যদি দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট সংস্থার যথেষ্ট নগদ আয় এবং নিট সম্পদের পরিমাণ ভাল থাকা সত্ত্বেও তারা ঋণ মেটাচ্ছে না, তখনই নির্দিষ্ট সময় পরে সেই সংস্থা, তার প্রোমোটার ইত্যাদিকে এই তকমা দেয় ব্যাঙ্ক।

২) ঋণ নেওয়া সংস্থা থেকে অন্য সংস্থায় টাকা যদি এমন ভাবে সরানো হয়, যাতে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট সংস্থার আর্থিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

৩) ঋণের শর্ত ভঙ্গ করে সংস্থাটির তরফে সম্পত্তি কেনা হয়।

৪) ব্যাঙ্কের কাছে বন্ধক রাখা স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ সরিয়া ফেলা।

৫) ওই সম্পদ বিক্রি করার ব্যাপারে ব্যাঙ্কের কাছে ভুয়ো রেকর্ড দাখিল করা।

সেবি-র নতুন নিয়ম যদিও আপাতত দেশ ছাড়া বিজয় মাল্যের ৯,০০০ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ না-মেটানোর প্রেক্ষাপটেই নেওয়া হয়েছে, এগুলি সব ঋণখেলাপির কাছেই কড়া বার্তা দেবে বলে মনে করছে মূলধনী বাজার মহল।

ইউবি গোষ্ঠীর ইউনাইটেড স্পিরিটস ব্রিটেনের সংস্থা ডিয়াজিওর হাতে চলে যাওয়ার পরে দীর্ঘ সময় টালবাহানা করে মাল্য সম্প্রতি ইউনাইটেড স্পিরিটসের চেয়ারম্যান পদ থেকে বাধ্য হয়ে ইস্তফা দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু তিনি এখনও ইউবি গোষ্ঠীর বেশ কিছু সংস্থার পরিচালন পর্ষদে রয়েছেন। এই অবস্থায় সেবি-র নতুন নিয়ম বিজয় মাল্যকে তাঁর শিল্প সাম্রাজ্য থেকে সরাতে বিশেষ কার্যকরী হবে বলে মনে করছেন ভারতের মূলধনী বাজারের অনেকেই।

বিএসই-র শেয়ার ইস্যু। বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ বা বিএসই যাতে কর্পোরেট সংস্থা হিসেবে স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত হতে পারে, তার জন্য নীতিগত ভাবে সায় দিল সেবি। সে ক্ষেত্রে বিএসই-র নিজস্ব শেয়ার প্রথম বাজারে আসবে ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে। তবে বিএসই-কে তার শেয়ার নথিভুক্ত করতে হবে অন্য স্বীকৃত স্টক এক্সচেঞ্জে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement