কেন্দ্রীয় প্রকল্পে ঠাঁই হয়নি প্রথম দফায়

কৃষিপণ্যের নেট-বাজারে নেই রাজ্য

কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজারকে ইন্টারনেটের সুতোয় বাঁধার পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্র। যাতে নিজেদের পণ্য সরাসরি অনলাইনে বিক্রি করতে পারেন কৃষকরা। রেহাই মেলে ফড়েদের হাত থেকে। কিন্তু এই পরিকল্পিত নেট-বাজারে প্রথম দফায় ঠাঁই পেল না পশ্চিমবঙ্গ। গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, তেলঙ্গানা ও ঝাড়খণ্ড থাকলেও, তালিকায় নাম নেই এই রাজ্যের।

Advertisement

গার্গী গুহঠাকুরতা

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০১৬ ০৩:০৪
Share:

কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজারকে ইন্টারনেটের সুতোয় বাঁধার পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্র। যাতে নিজেদের পণ্য সরাসরি অনলাইনে বিক্রি করতে পারেন কৃষকরা। রেহাই মেলে ফড়েদের হাত থেকে। কিন্তু এই পরিকল্পিত নেট-বাজারে প্রথম দফায় ঠাঁই পেল না পশ্চিমবঙ্গ। গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, তেলঙ্গানা ও ঝাড়খণ্ড থাকলেও, তালিকায় নাম নেই এই রাজ্যের।

Advertisement

কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রের খবর, প্রকল্পটিতে জায়গা করে নেওয়ার জন্য বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি রাজ্য। তা ছাড়া, নেট-বাজারে ব্যবসা করতে কৃষি বিপণন (এগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট কমিটি বা এপিএমসি) আইনে যে রদবদল প্রয়োজন, এত দিনে তা-ও করে উঠতে তারা সক্রিয় হয়নি বলে কৃষি মন্ত্রক সূত্রের খবর। ভোটের সময় অবশ্য এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চায়নি রাজ্য সরকার।

কৃষি নেট-বাজারে প্রথম তালিকায় থাকার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষুব্ধ শিল্পমহল। তাদের প্রশ্ন, যে সরকার কৃষকস্বার্থ রক্ষার যুক্তিতে শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে নারাজ, এ বিষয়ে তারা আগ্রহ দেখাল না কেন? কেনই বা এত দিন ধরে নাড়াচাড়ার পরেও প্রয়োজনীয় বদল আনা গেল না সংশ্লিষ্ট আইনে? এমনকী এর ফলে ই-গভর্ন্যান্স নিয়ে রাজ্যের লাগাতার সাফল্য দাবিও ফের প্রশ্নের মুখে পড়ল বলে মনে করছেন তারা।

Advertisement

ন্যাশনাল এগ্রিকালচার মার্কেট (ন্যাম) প্রকল্পের প্রথম পর্বে ঠাঁই পাওয়া আট রাজ্যে ৫৮৫টি কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজারকে (মান্ডি) এক সূত্রে বাঁধবে নেট প্রযুক্তি। সে ক্ষেত্রে ফড়েদের এড়িয়ে লাভের টাকা সরাসরি ঘরে তুলতে পারবেন কৃষকরা। তার উপর এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে রাজ্যের কার্যত কোনও খরচও নেই। প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো জোগানোর খরচ দেবে কেন্দ্র। প্রতি মান্ডির জন্য বরাদ্দের অঙ্ক ৩০ লক্ষ টাকা। চাল, গম, পেঁয়াজ, হলুদ, ছোলার ডাল-সহ মোট ২৫টি কৃষিপণ্য কেনা-বেচা হবে এই নেট-বাজারে।

সেই কারণেই গোড়া থেকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে না-পারায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ স্থানীয় শিল্পমহল। এক শিল্পকর্তার কথায়, ‘‘শিল্প নেই। কৃষিও সুযোগ হারাচ্ছে। তা হলে উন্নয়ন কোথায়?’’ জাতীয় স্তরের বণিকসভার এক সদস্যের গলায় পুরনো তিক্ততা। তিনি বলেন, ‘‘কৃষকস্বার্থের কথা বলে যারা টাটাকে তাড়িয়েছিল, তারা চাষিদের জন্য এমন সোনার সুযোগ হাতছাড়া করল!’’

Advertisement

ক্ষোভ এত দিন ধরে কৃষি বিপণন আইন সংশোধন করার বিষয়ে তৃণমূল সরকারের টালবাহানা নিয়েও। এ বিষয়ে গত পাঁচ বছরে এক পা এগিয়ে দু’পা পিছিয়েছে রাজ্য। ২০১৩ সালে বিধানসভায় ওই আইন সংশোধনের প্রস্তাব এনেও পিছিয়ে যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বিরোধিতা এসেছিল শাসক দলের মধ্যে থেকেই। তারপর দু’বছরেরও বেশি সময় গড়িয়েছে। কিন্তু সেই আইন সংশোধন নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি রাজ্য।

সংশ্লিষ্ট কর্পোরেট দুনিয়ার মতে, এই গড়িমসি বাদ সেধেছে কৃষি ক্ষেত্রে বিনিয়োগে। তাদের দাবি, শুধু ফলন ভাল হলেই চলে না। ফসল কাটার পরে তা সংরক্ষণ ও বিপণনের ঘাটতি থেকেই গিয়েছে। যা পূরণ করতে বর্তমান আইন বদলানো জরুরি বলে মনে করছে শিল্প মহল।

সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কৃষিপণ্য উৎপাদক হিসেবে এগিয়ে থাকলেও, বিপণনে বরাবরই পিছিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যে কৃষি বিপণনে বিভিন্ন স্তর থাকায় বিক্রির মাত্র ১৫% কৃষকদের হাতে পৌঁছয়। মধ্যবর্তী প্রক্রিয়া ও ফড়েরা নিয়ে যায় ৮৫%। যার মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি।

এই পরিস্থিতি পাল্টাতে কৃষি বিপণন আইন বদলানো নিয়ে বারবার কথা হয়েছে। কিন্তু সে বিষয়ে জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। বাম জমানায় রাজনৈতিক টানাপড়েনের জেরে আইন সংশোধন করা যায়নি। যার মাসুল গুনে থমকে গিয়েছে খুচরো ব্যবসায় মোটা বিনিয়োগ। এপিএমসি-লাইসেন্স না-পাওয়ায় এ রাজ্যে খুচরো ব্যবসার মূল পরিকল্পনাই ভেস্তে গিয়েছিল রিলায়্যান্সের। পরে কয়েকটি বিপণি চালু হলেও, কৃষিপণ্য কেনা ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা নিয়ে আর এগোয়নি মুকেশ অম্বানীর সংস্থা।

আঙুল উঠছে ই-গভর্ন্যান্স নিয়ে রাজ্যের গর্বের ঘোষণার দিকেও। নিজের ও সরকারের বার্তা আম-দরবারে পৌঁছে দিতে এখানে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর পছন্দ ফেসবুক আর টুইটার। প্রায় সব বণিকসভার মঞ্চে রাজ্যকে তুলে ধরতে শিল্প তথা অর্থমন্ত্রীর হাতিয়ার ই-গভর্ন্যান্স। অথচ নেট দুনিয়ায় পুরোদস্তুর পা চালাতে কারা কতটা তৈরি, সম্প্রতি তা মাপতে গিয়ে সেই পশ্চিমবঙ্গেরই ঠাঁই হয়েছিল একেবারে শেষ সারিতে! ২১টি বড় রাজ্যের মধ্যে ১৭ নম্বরে।

নেটের সুবিধা কাজে লাগাতে কে কতটা তৈরি (ইন্টারনেট রেডি), তা খতিয়ে দেখে ওই রিপোর্ট তৈরি করেছিল ইন্টারনেট অ্যান্ড মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (আইএএমএআই)। সেখানে দেখা হয়েছিল, কোথায় ইন্টারনেট-পরিকাঠামো কেমন, নেট মারফত সরকারি পরিষেবা, নেট-জগতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ইত্যাদি। কৃষিপণ্যের নেট-বাজারে জায়গা করে নিতেও দরকার ঝকঝকে ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা। তাই সেখানে রাজ্যের এমন ঔদাসিন্য তাদের ই-গভর্ন্যান্সের সাফল্য নিয়ে ঢক্কানিনাদে ফের প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিল বলে মনে করছেন অনেকে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement