—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
অভিজিৎ সেনের সাহিত্যকৃতির সঙ্গে যাঁরা পরিচিত তাঁরা জানেন, তিনি বরাবরই সমকালীন সাহিত্যের প্রচলধারার বাইরে এক স্বতন্ত্র লিখনশৈলীর সাধক। তাঁর কথাসাহিত্য আধু্নিকতার ছোঁয়াচবর্জিত প্রান্তিক মানুষের জীবনকথা। ভূমিহীন ধর্মহীন যাযাবর বাজিকরদের চলমান জীবননির্ভর উপন্যাস রহু চণ্ডালের হাড়-সহ বহু লেখাই তার প্রমাণ।
এই গ্রন্থটির নামকরণ যদিও একটি উপন্যাসের নামে, তবে তার সঙ্গে বইয়ে রয়েছে দশটি গল্পও। শেওলা ঢাকা দিঘির গভীরে শান্ত জলের মতো প্রতিটি আখ্যান যেন মনের গহিনে জমে থাকা স্ফটিকস্বচ্ছ স্মৃতির জলছবি। দেশভাগের ফলে শৈশবে ছিন্নমূল হওয়ার কষ্ট, হারানো মাটির প্রতি আকুতিই বেশির ভাগ গল্প ও উপন্যাসটির চালিকাশক্তি— প্রতিটি দেশান্তরি মানুষের অন্তরকথা।
উপন্যাসের আখ্যান আবর্তিত অদিতি, তার ভাই প্রশান্ত ও জ্ঞাতি ভাই প্রদ্যুম্নের চল্লিশ বছর আগে ফেলে আসা বরিশালের কেয়া গ্রাম দেখতে যাওয়া কেন্দ্র করে। দিল্লিতে বদলি হওয়া উচ্চপদস্থ আমলা স্বামী দিবাকরের সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অদিতি পাকাপাকি ভাবে ভাইয়ের কাছে চলে এসেছে। এর পাশাপাশি এসেছে পাচারচক্রের ফাঁদে পড়ে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হওয়া মাধুরী, আয়ার কাজ ছেড়ে নাচের দলে যোগ দেওয়া তার যমজ বোন জয়ার কথাও— গ্রামবাংলার নারীলাঞ্ছনার চলচ্ছবি রূপে। অদিতির দিদি সুদীপ্তা কলেজে পড়ার সময়ে জলে ডুবে আত্মহত্যা করার এক মাস পরেই তারা দেশ ছেড়েছিল; চল্লিশ বছর পরে হারানো ভিটেমাটি ফিরে দেখার আগ্রহের নেপথ্যে অগ্রজার আত্মহত্যার কারণ উদ্ঘাটনের বাসনাও হয়তো সুপ্ত ছিল অদিতির মনে।
গ্রামে পৌঁছে কৌতূহল নিরসনে, আশি বছরের ছোট-ঠাকুরদার সঙ্গে ‘লিভ টুগেদার’ করে থাকা বছর পঁচাত্তরের দাই কামার-ঝির শরণাপন্ন হন তিনি। তাঁর মুখেই শোনেন অপূর্ব রূপবান সৈয়দ আমেদের সঙ্গে সুদীপ্তার প্রেম ও গর্ভধারণের কথা। অদিতি দিদির একদা-প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করে, দিদির স্মৃতি-জড়ানো পুকুরঘাটে বসে প্রৌঢ় অকৃতদার মানুষটির সঙ্গে স্মৃতি হাতড়ে ফেরে। তবে সব ছাপিয়ে উপন্যাসটির মূল সুর ধরা পড়ে কামার-ঝির হাতে জন্ম নেওয়া দেলোয়ারের আন্তরিকতায়। দাই-মায়ের ডাকে মুসলমান দেলোয়ার ভারত থেকে আসা দাইমা-তুতো ভাইবোনকে রাত জেগে পাহারা দেয়, অল্প শীতে দুর্লভ খেজুরগুড় জোগাড় করে আনে। দেশভাগের পর হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়ার জন্য এই ‘গ্রাম্য’ মানুষটি যখন নিজেকে অপরাধী ঠাওরান, তখন শত প্ররোচনা ডিঙিয়ে হিন্দু-মুসলমানের অচ্ছেদ্য বন্ধনই চিরন্তন হয়ে ওঠে।
সবুজ শ্যাওলা ঢাকা জল
অভিজিৎ সেন
৩৫০.০০
দি অ্যান্টোনিম কালেকশনস
লেখক শৈশবে পূর্ব পাকিস্তানে, পরে কলকাতায় দাঙ্গার ভয়াবহতা দেখেছেন বলেই হয়তো তাঁর লেখায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই বার্তা আরও ঘন হয়ে এসেছে। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির ফল্গুধারার চমৎকার ছবি ‘সমাপতন’ গল্পটিও। বহুদিন পর ভারত থেকে বরিশালে দেশের বাড়ি দেখতে গিয়ে এয়ারপোর্টে অভিবাসন-কর্মী সাবিরের সঙ্গে পরিচয় হয় অনিমেষ মুখার্জির; গভীর রাতে আতান্তরে পড়া অনিমেষকে আত্মীয়জ্ঞানে স্বগৃহে আশ্রয় দেন সাবির। পরিচয় করান তাঁর হিন্দু স্ত্রী আরতির সঙ্গে, ঘটনাচক্রে যিনি অনিমেষেরই জ্ঞাতি কন্যা। ভিন্নধর্মের দু’টি মানুষের সুখী দাম্পত্য, ধর্ম বিষয়ে উদার মনোভাব, সর্বোপরি তাঁদের আতিথ্যে মুগ্ধ অনিমেষের উক্তি “হয়তো আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে বিদ্বেষ কমে আসবে দুই সম্প্রদায়ের”— বাঙালির চিরন্তন শুভবোধের প্রকাশ।
ব্যাঙ্কের কাজের সূত্রে উত্তরবঙ্গের দরিদ্র মুসলমান সমাজের দুর্দশা দেখেছেন লেখক, তা-ও ঘুরেফিরে এসেছে কয়েকটি গল্পে। ‘রূপবান আনসারির জীবন ও মৃত্যু’ গল্পটি নারী পাচারের চক্র, হতদরিদ্র মুসলমান পরিযায়ী জীবন এবং অভাবী মানুষের নিষ্ঠুরতার দলিল। রূপবানের স্বামী তার অজানতে ব্যাঙ্ক থেকে তার নামে ঋণ নিয়ে কাজের খোঁজে সস্ত্রীক গুজরাত যায়, সেখানে রূপবানকে বেশ্যালয়ে বিক্রি করে গ্রামে তার মৃত্যুসংবাদ রটিয়ে দেয়। কোনও ক্রমে পালিয়ে আসার পর, রূপবানকে চাপ দিতে থাকে ব্যাঙ্ক, ঋণশোধের জন্য। ভিটে বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে চাইলে সহমর্মী ব্যাঙ্ক অফিসার তাকে নিরস্ত করেন ও বোঝান, ঋণ শোধ না করলেও ব্যাঙ্ক কিছু করতে পারবে না। শেষে এডস সংক্রমণের খবরে বিচলিত রূপবান আত্মহত্যা করলে, কর্মচারী ইউনিয়নের রোষে পড়া অফিসারটি স্বস্তি পান, যা আসলে শহুরে মধ্যবিত্তের পলায়নপরতাই প্রকট করে। ‘ঘ্রাণ’ গল্পটিও দারিদ্র ও নিষ্ঠুরতার করুণ আখ্যান: এই গল্পে কুড়ি হাজার টাকায় ব্যাঙ্কে বন্ধক রাখা কেভিপি হাতানোর জন্য এক সময়ে ট্রেনের ডাকসাইটে হকার আশুরা বিবিকে তার স্বামী ক্ষতবিক্ষত করে এবং গ্যাংগ্রিনে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানো আশুরার মৃতপ্রায় শরীরটাকে তার সৎ ছেলে ট্রেনে ফেলে নেমে যায়।
‘চিলানি মায়ের গল্প’টি কিছুটা লোকজ বিশ্বাস-নির্ভর। বন্ধুর বাড়িতে বাংলাদেশি শাজাহান মণ্ডলের মুখে ঢিল মেরে বাজকুড়ুল পাখির মুখ থেকে শিকার করা মাছ কেড়ে নেওয়ার গল্প শুনে কথক মানুষের নিষ্ঠুরতায় ক্ষুণ্ণ হন। উষ্মাভরে তিনি চিলের মুখ থেকে মাছ ছিনিয়ে নেওয়ায় গল্প বলেন। মাছ হারিয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুরতে থাকা অভুক্ত চিল-মায়ের মৃত্যু, সেই শাপে কৃষকের একমাত্র ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যু-কাহিনি শাজাহানের দাদার মাছ কাড়ার বীরত্ব নস্যাৎ করে দেয়। শাজাহান তাঁর দাদার স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যু ও শেষে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বনের নেপথ্য কারণ উপলব্ধি করে নির্বাক হয়ে যায়। গল্পের এই সমাপতন হয়তো যুক্তিহীন সংস্কার, তবু চিল-মায়ের কান্না ও শৈশবের কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তে দেখা চিলানি মায়ের ব্রতের স্মৃতিমেদুরতা পাঠকের মন ছোঁয়। এ যেন লেখকের কলম নয়, হৃদয় থেকে উৎসারিত।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে