—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
এই বই পড়তে পড়তে মন চলে যায় বাংলার সেই গানের জগতে, যেখানে শরচ্চন্দ্র শীল সংগৃহীত ও প্রকাশিত বাঈজী সঙ্গীত বইয়ে সঙ্কলিত হতে পারে রবীন্দ্রনাথের মায়ার খেলা-র গান ‘ভালবেসে যদি সুখ নাহি...’। চমকে ওঠার মতো আরও একটি খবর হল, এই বাঈজী সঙ্গীত প্রকাশিত হয়েছে ১৯২৯ সালে। রবীন্দ্রনাথ তখন গুরুদেব বলে সুপ্রতিষ্ঠিত। বেশ্যা সঙ্গীত বলে আর একটি বইতেও শ্রীধর কথক, গোপাল উড়়ে, গিরিশ ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানও সঙ্কলিত হতে পেরেছে। নুটবেহারী মজুমদার সংগৃহীত ও প্রকাশিত এই বইটির প্রকাশকাল ১৯১১ সাল।
সেকালে হয়তো অনেকেই এই বইগুলোর খোঁজ জানতেন, কিন্তু অন্তত বর্তমান আলোচকের কাছে, এমন খবর প্রথম বারের মতো তুলে দিলেন দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলার মঞ্চগানের প্রতি আবেগঘন ভালবাসায় অসাধ্য সাধন করার গুণে। এই বই প্রধানত এক সঙ্গীত-সংগ্রাহকের অভিজ্ঞতার লিপিবদ্ধ রূপ। মেট্রো রেল-পূর্ববর্তী সেই কলকাতায় সিঁথির মোড় থেকে আধা ঠিকানামাত্র সঙ্গে নিয়ে গোপালনগরের গলি, সেখান থেকে একটি নাম মাত্র সম্বল করে ডালহৌসির পুকুরের ধারের দোকানে হানা দিয়ে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় দিনের চেষ্টায় লেখক সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত বাঙ্গালীর গান। প্রথমে উল্লেখ করা দুটো বই তিনি সংগ্রহ করেছিলেন রোজকার অভ্যাসে সুবর্ণরেখা বইয়ের দোকানে হানা দিতে দিতে আচমকাই। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বইয়ের দোকানে চোখ আটকে গেলে মরিয়া হয়ে সংগ্রহ করছেন সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা। কখনও নিজগুণে উপহার পেয়েছেন থিয়েটার সঙ্গীত। জীবন্ত হয়ে ওঠেন থিয়েটারের এক অনামী নেপথ্য শিল্পী ছিদেদা, যিনি লেখককে উপহার দিয়েছিলেন ঝাঁঝ। যে বই যেন, লেখকের মনে হয়, বাংলা মঞ্চগানের রিলে রেসের একটি ব্যাটন।
এমনই যাঁর সংগ্রহ, তিনি সাবলীল ভাষায় অনায়াস দক্ষতায় রচনা করে গিয়েছেন বাংলা রঙ্গমঞ্চের এক রকম ইতিহাসই। তার শুরু যথারীতি ১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর। সেই কাল্পনিক সংবদলেই ঢুকে পড়ল গান। ভারতচন্দ্রের লেখা। অনেকটা এ ভাবে বলা যেতে পারে, ভারতচন্দ্রের হাত ধরেই বাংলার রঙ্গমঞ্চে গানের একটা স্থায়ী স্থান তৈরি হয়ে গেল। দেবজিত্ উল্লেখ করেছেন, লিয়েবেদেফ রাশিয়ার ‘স্কোমোরখ্’ দলের প্রযোজনার কথা মাথায় রেখেই এবং ‘বাংলায় প্রচলিত বিনোদন মাধ্যমের ঐতিহ্য’কে উপেক্ষা করতে না চেয়ে গানের গুরুত্ব বুঝেছিলেন। সম্ভবত যে কারণেই, অনেক পরে গিরিশচন্দ্র ঘোষ ‘মেঘনাদবধ’-এর নাট্যরূপে পর্যন্ত নিজের লেখা গান জুড়ে দিয়েছিলেন। তা যে মানানসইও হয়ে গিয়েছিল, তা গিরিশচন্দ্রের প্রতিভার দান।
বাঙালির গান থেকে থিয়েটারের ঝাঁঝ
দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায়
৪০০.০০
ধ্রুবপদ
ইতিহাসের খাতিরেই এই বইতে লিয়েবেদেফের পরে একের পর এক প্রসঙ্গ আসে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের নাটক ও অভিনয়, নটীর পূজা-র প্রসঙ্গ বিস্তারিত ভাবে আলোচিত। রঙ্গমঞ্চে নানা ধরনের মানুষই আসেন। তাই আলোচনার শিরদাঁড়া যদি রঙ্গমঞ্চ ও তার গান হয়, তা হলে একটি বিরাট সময়, যখন সমাজে উথালপাথাল চলছে, তার নানা কথা স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে। তাই কেশবচন্দ্র সেনের নাটক সম্পর্কে অভিমত যেমন কথাপ্রসঙ্গে আসে, সেই সঙ্গেই আলোচিত হয় কী ভাবে রামকৃষ্ণ ও সারদা-সংস্পর্শে ‘লোকশিক্ষার তথা জীবনশিক্ষার নতুন আধার হয়ে উঠল বঙ্গরঙ্গমঞ্চ’। এই অংশটি থেকেই বইটি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। এমন অনেক কথা দেবজিত্ বলে চলেছেন, যা সাধারণ ভাবে বাঙালি খুব একটা খেয়াল করে না। বিনোদিনীর শ্রীচৈতন্যরূপে অভিনয় এবং তাতে রামকৃষ্ণের পরম সন্তোষের কথা আমরা প্রায় সকলেই জানি, কিন্তু সারদাদেবী যে গিরিশের চৈতন্য-লীলা-র গান অন্তরঙ্গ পরিসরে গাইতে ভালবাসতেন, সে খবর লেখক দিয়েছেন। বিল্বমঙ্গল দেখে সারদা ‘পাথরপ্রতিমা’ হয়ে গিয়েছিলেন। দেবজিত্ জানাচ্ছেন, এই নাটকটি সারদা দু’বার দেখেছেন। এমন বহু তথ্য রয়েছে। তাই যাঁরা রঙ্গমঞ্চের চেয়ে ঠাকুর পরিবার বা রামকৃষ্ণ-সারদার প্রতি বেশি উৎসাহী, এই বই তাঁদেরও নিরাশ করবে না।
এর পরেই আসে গিরিশচন্দ্র সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা। এখানেও একই কথা বলতে হয়। সধবার একাদশী-র নিমচাঁদ থেকে শুরু করে গিরিশের অসাধারণ সব চরিত্রের কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু নাটকের প্রয়োজনে বঙ্কিমচন্দ্রের কথা যে গিরিশ পাল্টে দিয়েছিলেন, তা জানাচ্ছেন লেখক। বয়সে অনেক ছোট হলেও গিরিশচন্দ্রকে বিবেকানন্দ ‘জিসি’ বলে ডাকতেন। ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতেন। নাটকের গানের ভাষা নিয়ে দু’জনের আলোচনা দু’জনের চরিত্রকে পরিষ্কার ফুটিয়ে তোলে।
স্টার থিয়েটার, বিনোদিনী, তিনকড়ি থেকে শরৎচন্দ্র, অমরেন্দ্রনাথ, কৃষ্ণচন্দ্র, দিলীপকুমার— নানা প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন লেখক। বাংলা রঙ্গমঞ্চ ও তার গান নিয়ে যাঁরা গবেষণা করছেন তাঁদের যেমন উপকার হবে, তেমনই সাধারণ পাঠকেরও কৌতূহল মিটবে। নজরুলের হারানো গানের কথাও উল্লিখিত হয়েছে। তবে অমরেন্দ্রনাথ দত্ত যে বিদেশি দ্রব্য বয়কট করার পক্ষে হ’ল কি নাটকের প্রস্তাবনায় ‘বাঙ্গালা ধুতি পরিপাটী, বিলাতি চাল দাও খতম’ বলে একটি গান জুড়েছিলেন, সেটির এবং এ ধরনের আরও কিছু গানের উল্লেখ থাকলে বাংলা রঙ্গমঞ্চের গানের সঙ্গে বাংলার রাজনীতির সংযোগের কথাটি আরও জোর পেত। বইটি থেকে একটা বড় সময়ের বাংলা ভাষার সঙ্গে পাঠকের নিবিড় পরিচয় হয়। এই সব গানে এমন অনেক শব্দ রয়েছে যা হারিয়ে গিয়েছে। সাধারণ রঙ্গমঞ্চ সমকালের ভাষাকেই নির্ভর করে গানের ভাষা তৈরি করে, তাই একটি বিশেষ সময়ের বাঙালির ভাষার একটি রূপের খোঁজও বইটির সূত্রে মেলে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে