“এও কি সম্ভব?” সুরমা-চর্চিত চোখ দুটো বিস্ফারিত করেন সুলতান। “এমন আজব তবকত কে কবে শুনেছে?” “না জাহাঁপনা, কেউ শোনেনি।” খসরু মাথা নাড়েন।— “একজন শাহজাদা মসনদের ন্যায্য সিংহাসনের অধিকার স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছেন, দুনিয়ার সবচেয়ে শানদার সাম্রাজ্য শাসনের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন কেবলমাত্র একটি সুদূর প্রান্তিক প্রদেশে থেকে যাবেন বলে, এমন কথা সত্যিই কোনও কুরসিনামায় লেখা নেই।”
সুলতান হলেন জালালউদ্দিন খিলজি। বলছেন সুফি সাধক কবি আমির খসরু। প্রান্তিক প্রদেশ হল বাংলা নামের এই দেশ। লিখছেন পরিমল ভট্টাচার্য তাঁর উপন্যাস, সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা নামক এক নতুন মহাভারতে। এই ভারত বাংলা। বাংলার মহাকথন এই উপন্যাস। বাংলার প্রায় বিস্মৃত এক জনপদের কাহিনি লিখতে লিখতে তিনি যেন দেখিয়ে দিলেন, সাতগাঁ, দিনেমার ডাঙা, ওলন্দাজডাঙা, কোয়াসঁভিল, আদিরামবাটির কাহিনিও এক মহাভারত। এবং এই মহাভারতের কাহিনি শুনুন সকলে, মি লেডি, শুনুন উচ্ছিন্ন এক শিকড়ের কাহিনি। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা আসলে হল স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পার করেও বাঙালির আবার শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার ভয়ের কাহিনি। ট্রাইবুনালে আপনি কী বলবেন, আপনার জাতিগত পরিচয়, আপনার শিকড়ের এবং শিকড়চ্যুত হওয়ার কাহিনি। যে বাংলায় এসে কেউ ফেরত যেতে চায় না, সেই বাংলার এমন এক জাদুকরী টান, সেই টানে বাংলায় ভাগ্যান্বেষণে এসে থেকে যায়। দখল করতে এসে থেকে যায়। সেই বাংলা যা ভাগ হয়ে বাঙালি এক বার হারিয়েছে শিকড়। আর এক বার কাঁপছে ভয়ে উদ্বেগে।
উপন্যাস শেষ হয় না যদি তা ইতিহাস, জনপদ ও জীবনের কথা লিখে যেতে চায়। এই উপন্যাস তা হয়েছে। যে কাহিনি লিখেছেন তিনি অন্তিমে তা আরম্ভ, শেষ কোথায় এই মহাভারতকথায়, জানি না। ২০২৬-এ যা ঘটে গেছে, তা যেন আগাম জেনেছেন লেখক। যে ঘটনা অসমে ঘটেছিল, লেখক তা লিখেছেন হুগলির সেই প্রাচীন জনপদের পটভূমিতে। পাঠের পর সুধী পাঠক বলতেন, অলীক কাহিনি। এমন কি হতে পারে? উপন্যাসের কল্পিত আখ্যান এ ভাবে বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াবে, ভাবাই ছিল অসম্ভব। কিন্তু বহু বছর ধরে অনুপ্রবেশ নিয়ে রাষ্ট্রের নানা আশঙ্কার কথা শুনতে শুনতে, উদ্বেগ কম ছিল না। ব্যক্তিগত ভাবে, এই পর্চা-দলিল, ‘এভিডেন্স’ খুঁজতে এক সময় কম ছোটাছুটি করিনি। তার পরেও ভয় কাটেনি। ডকুমেন্ট, এভিডেন্স চাই। নো টেল, এভিডেন্স।
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা
পরিমল ভট্টাচার্য
৮৭৫.০০
অবভাস
সাতগাঁর ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস সেখানে কিছুই না। যা স্মৃতিতে আছে, যা লিখিত ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া তেরোটি প্রাচীন পুঁথির মতো যা হারিয়ে গেছে তাকে দিয়ে কিছুই প্রমাণ হয় না। বিচারক মহিলা বলছেন, নো টেল, এভিডেন্স। এই কাগজ চাই, এভিডেন্স চাই-এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে এই উপন্যাস আমাদের শোনায় আদিরামবাটির সাতপুরুষের কাহিনি। রামাই পণ্ডিত থেকে সিদ্ধার্থ— সিধু অবধি, দু’শো বছরেরও ইতিহাস, তারও আগের কয়েকশো বছরের ইতিহাস। সাতগাঁ, কোয়াসঁভিল, ওলন্দাজডাঙা, চাঁদেরডাঙা, দিনেমারডাঙার ইতিহাস। ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার, ইংরেজ সকলের আধিপত্যের কাহিনি। উপনিবেশ গড়ে তোলার কাহিনি। সেই উপনিবেশে বিদেশিদের বাস করার কাহিনি হয়তো অবিকল নয়, কল্পিত, কিন্তু তা সাহিত্যের সত্য।
উপন্যাস আরম্ভই হয় সেই নিবেদন নিয়ে, “একটি পোস্টকার্ড দিয়েই আমাকে নির্বাসন দিতে পারেন না। পোস্টকার্ড কোনও দেশ নয়।” পোস্টকার্ডটি এসেছিল রথীনের বিবাহের সময়। রথীনের শ্বশুরবাড়ি সাতগাঁ, আদিরামবাটি। তারা নিষ্ঠাবান বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ। শিউলির বিয়ের জন্য পাত্রের পাঁচপুরুষের পরিচয় চাই। রথীনরা সিলেটের মানুষ। সিলেট-শ্রীহট্ট এমন এক অঞ্চল, যার নৌকাটি কখনও অসম, কখনও ঘুরে বাংলার তীরে এসে ভিড়েছে। শেষে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর গণভোটে গেল ইস্ট বেঙ্গল— পূর্ব পাকিস্তানে। রথীনের এক দিদি ছবি আসতে পারেনি, নিখোঁজ হয়েছিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সে আসে সীমান্তের এ-পারে রথীনদের কাছে। তার স্বামী তনভীর নিহত হয়েছিল খানসেনার হাতে। রথীনের বিয়ের দিন সকালে লালকালিতে লেখা পোস্টকার্ড এসেছিল। প্রেরক যিনি তিনি কতকাল আগে মারা গেছেন। এই অসামান্য ম্যাজিক আছে এই উপন্যাস জুড়ে। যেমন শিউলি, বসন্ত, হেমন্তর মা সরোজার বাপের বাড়ি রাধানগর থেকে ঠিক দুপুরে ‘খুকি খুকি’ ডাকতে ডাকতে এল মনু খুড়ো। হাতে একটি ত্রিকোণাকৃতির স্ফটিক। বৃদ্ধা সরোজা বলে, তার ছেলেমেয়ের কি এ-সব নিয়ে খেলার বয়স আছে! সরোজা তার ক্ষমতার জাদু দিয়ে পরে জানল, মনু খুড়ো বহুদিন গত হয়েছেন।
লেখকের কলমে এই জাদু বিশ্বাস্য করে তোলার ক্ষমতা আছে। এই ভাবেই হিমালয় থেকে আসে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে ওষুধ, পরে দেখা গেল যেখানে চিঠি যায়, যে চিঠি পায় তার সঙ্গে রামপ্রাণের কোনও সম্পর্ক নেই। রামপ্রাণ অদৃশ্য, কিন্তু তাঁর কাছে চিঠি যায়। সবই সাতগাঁয়ের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস। তার উপরেই জাতীয় নাগরিকপঞ্জি। রামপ্রাণের ইচ্ছায় রথীনের পরিবার সিলেটের গ্রামে রয়ে যাওয়া তাদের কুলপুরোহিতের কাছে তাদের বংশলতিকা চেয়ে পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিল। বিয়ের দিন সকালে ইস্ট বেঙ্গল থেকে উত্তর এল। সেই পোস্টকার্ড দিয়েই অভিযোগ করা হল রথীনের পুত্র বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায় অনুপ্রবেশকারী, তাদের পাঁচপুরুষ ভিনদেশের অধিবাসী। উপন্যাস এই অনুপ্রবেশের। বাংলার ইতিহাসে কত জাতি এসেছে, রয়ে গেছে ভালবেসে, এর জলহাওয়ার গুণেই তারা রয়ে যায় গোটা সাম্রাজ্যের সিংহাসনের মায়া ত্যাগ করে। এই যে বাংলার ইতিহাস, সেই ইতিহাসের লোকজন নিয়ে এই উপন্যাস। তাদের কথাই সাবুদ।
লেখক ইতিহাসের চরিত্রগুলিকে ঈষৎ অদলবদল করে নিয়েছেন। সেই সব চরিত্রকে কল্পিত চরিত্র করে তুলে সেই বিবরণ বিচারকের নিকট পেশ করছেন, লিখনের শৈলীতে তা ইতিহাসপাঠ হয়ে উঠেছে। এইটিই জাতীয় নাগরিকপঞ্জির বিপরীতে বাঙালির একমাত্র সাবুদ। এই নাগরিকপঞ্জি, এসআইআর, সবই বাঙালির উপরে পরীক্ষিত। অন্য প্রদেশে সীমান্ত নেই, অন্য প্রদেশের মানুষ শিকড় হারায়নি, সুতরাং এসআইআর, এনআরসি-সমর্থক ব্যক্তির সেই সব অঞ্চলের উদাহরণ এখানে খাটে না। বাপ্পাকে কৈশোরে (১৯৭১ সাল হবে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল) কত বার শুনতে হয়েছে কাঁটাতারের দাগ আছে তার পিঠে, মানে রিফিউজি। বসন্তমামার পুত্র কানাই বলেছে তার বাবা পোস্টকার্ড জমিদার। এখানে উল্লেখ্য, ভারত সীমান্তে কাঁটাতার লাগায় ১৯৮৯ নাগাদ। দেশভাগের পরও বহু দিন সীমান্ত ছিল অবাধ।
উপন্যাসে রসগোল্লা আবিষ্কারক হল ওড়িশার জাজপুরের পাচক গোবর্ধন, কিন্তু ইতিহাস তো নবীনচন্দ্র দাসের কথা বলে। উপন্যাসের সেই অসামান্য চরিত্র ওড়িশাজাত পাচক অন্য কিছু আবিষ্কার করতেই পারে, রসগোল্লা নয়। এ রকম কিছু কিছু ভ্রান্তি রয়েছে— টালার জলট্যাঙ্কি ১৯১১-য় চালু হয়, বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৯৪-এ প্রয়াত হন; নভেল-লিখিয়ে কাঁটালপাড়ার রাজমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গ করা পাগলরামের টালার জলট্যাঙ্কির জল তখন পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু লেখক যেমন পেরেছেন মৃত মনু খুড়োকে নিয়ে আসতে, সিলেট থেকে বংশলতিকা নিয়ে আসতে, সে-ভাবেই আসত। কিন্তু এ-সব সামান্য অনুযোগ। বঙ্কিম স্বনামে এখানে নেই। আছেন রাজমোহন চট্টোপাধ্যায় হয়ে। উপন্যাস-লিখিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। কাঁটালপাড়ায় বাড়ি। সুতরাং পাগলরাম তো সরাসরি বঙ্কিমের সাহচর্যে নেই, ছিলেন রাজমোহনের সখা হয়ে। এই হল উপন্যাসের আঙ্গিক। এবং তা অভিনব। তা হলে টালার জলাধার বাদ দিয়ে অলীক কোনও জলাধার হতে পারত। এই সব ইতিহাস বা কল্পনা নিয়ে উপন্যাস। যা সত্য অথবা সত্য নয়। মনু খুড়ো কিংবা কাশীতে নির্বাসন নেওয়া রামপ্রাণের পাঠানো ওষুধের মতোই সত্য। যে ভ্রান্তির কথা বলছি, তা উপন্যাসের মূল কথায় পৌঁছতে কোনও দেওয়াল তোলে না।
তিনি বাংলার ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস, জনপদের ইতিহাস, বাংলাভাষার শিকড় সব সাবুদ নিয়ে এনআরসি-র মুখোমুখি হয়েছেন। উপন্যাসে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এসেছেন বাংলাভাষার আদিরূপের সন্ধানে। কত রকম চরিত্র। ফরাসি কবি, ইংরেজ থেকে দাসী হয়ে ভেসে যাওয়া মান্দাসী থেকে কথা-বলা পাখি অ্যান্টনি পর্যন্ত। বসন্তর স্ত্রী নতুন বৌ পুতুল নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিল, তার সঙ্গে নানা দেশের পুতুলগুলিও বুড়ো-বুড়ি হয়ে যেতে থাকে। ইতিহাসের যে কাহিনি আছে এখানে, তাতে বাস্তবতা ও কল্পনা মিলেমিশে গেছে। যেমন মার্টিন’স রেল। সপ্তগ্রামের পথে তা বাস্তবে ছিল না বটে, কিন্তু লেখকের এই নির্মাণ মুগ্ধ করে। উপন্যাসে কোথাও কোথাও অতিকথন আছে, পড়েই মনে হয়েছে, থাকলে ক্ষতি কী, কত মানুষ কত জনপদের সঙ্গে তাও থাকুক। শ্রীচৈতন্যের মৃত্যুরহস্য জানতে গিয়ে রামাই পণ্ডিত নিহত হন। এই হত্যার কারণ এবং হত্যাকারী অদৃশ্য থেকে যায়। ইঙ্গিত স্পষ্ট। ফলে যে কাহিনি অতিরিক্ত মনে হয়েছে, এই উপন্যাসে তা থাকতেই পারে। ইতিহাস যে সমকালের সঙ্গে জুড়ে প্রলয় ঘটাতে পারে, তা এই উপন্যাস পাঠেই স্পষ্ট।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে