Cultural Programme

সুরবাহারে ভরা এক সন্ধ্যা

অনুষ্ঠানের পরবর্তী শিল্পী ছিলেন সরোদিয়া দেবস্মিতা ভট্টাচার্য। তাঁর বাজনায় যেমন ছিল নিখুঁত দক্ষতা, তেমনই গভীর আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ শোনা গেল।

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ১১:০৯
Share:

ওমকার দাদরকর।

সাংস্কৃতিক সংস্থা সুরসঙ্গমের বার্ষিক অনুষ্ঠান সম্প্রতি আয়োজিত হয়েছিল হাওড়ার শরৎ সদনে। উপস্থাপনায় ছিল ভারতীয় বিদ্যা ভবন। প্রখ্যাত সরোদিয়া পণ্ডিত অলোক লাহিড়ীর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা সুরসঙ্গম প্রায় তিন দশক ধরে হাওড়া অঞ্চলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা ধরে রেখেছে। বর্তমানে সংস্থার দায়িত্বভার কিছুটা গ্রহণ করেছেন পণ্ডিতজির পুত্র, সরোদিয়া অভিষেক লাহিড়ী এবং সঙ্গীতচর্চার রেওয়াজকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিচ্ছেন।

এ দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় সংস্থার ছাত্রছাত্রীদের বৃন্দবাদনের মাধ্যমে। বাবা আলাউদ্দীন খাঁ-এর মাইহার ব্যান্ডের ধাঁচে কিছুটা তৈরি করা এই অর্কেস্ট্রাতে শোনা যায় একাধিক যন্ত্রের সমমেল। রাগ দেশের উপর মধ্যলয়ের বন্দিশ বাজিয়ে তান বিস্তার এবং নিখুঁত তেহাইয়ের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা তাদের স্বরবোধ ও কঠোর তালিমের পরিচয় দিলেন। এই সুবৃহৎ যন্ত্রীবৃন্দকে তবলায় যোগ্য সহযোগিতা করলেন অভিজিৎ কুণ্ডু ও অর্পণ ভট্টাচার্য।

অনুষ্ঠানের পরবর্তী শিল্পী ছিলেন সরোদিয়া দেবস্মিতা ভট্টাচার্য। তাঁর বাজনায় যেমন ছিল নিখুঁত দক্ষতা, তেমনই গভীর আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ শোনা গেল। রাগ ঝিঁঝোটীতে বিলম্বিত ত্রিতাল বন্দিশ দিয়ে তিনি এক ধ্যানমগ্ন পরিবেশ সৃষ্টি করেন। গৎ-এর মধ্যে তাঁর বিস্তার রাগটির কোমল ও চঞ্চল স্বভাবকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাবে ফুটিয়ে তোলে। প্রতিটি শব্দবন্ধ নিখুঁত ভাবে নির্মিত, মীড়, গমক এবং মূলত একহারা বাদনের কাজে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল শিল্পীর তালিম। পিতা ও গুরু পণ্ডিত দেবাশিস ভট্টাচার্য ও বড় গুরু পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সান্নিধ্যে সেনিয়া শাহজাহানপুর ঘরানায় তালিমপ্রাপ্ত দেবস্মিতা। মধ্যলয়ে ত্রিতালে প্রবেশ ও গতি বৃদ্ধির সাথে তানের রূপরেখায় ফুটে ওঠে তাঁর ঘরানার স্বভাবসিদ্ধ জটিলতা ও সূক্ষ্মতা। এর পরে দ্রুত ত্রিতালের গৎ-টি বহুশ্রুত, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের জনপ্রিয় করে তোলা গৎ-এর চেয়ে সামান্য লয় বাড়িয়ে তিনি পরিবেশনা করেন। এই অংশে শিল্পীর লয়কারির নিপুণতা ও ছন্দের সঙ্গে তাঁর মেলবন্ধন বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় ছিল। পরিবেশনার শেষে এক নিখুঁত ঝালায় স্পষ্ট চিকারির কাজ থেকে অতিদ্রুত লয়ের তেহাই দিয়ে পরিসমাপ্তিতে শিল্পী তাঁর মুনশিয়ানার ছাপ রেখে যান। দেবস্মিতাকে তবলায় সঙ্গত করেন পণ্ডিত শুভজ্যোতি গুহ। তাঁর সংবেদনশীল সঙ্গত পুরো পরিবেশনাটিকে আরও পরিপূর্ণ করে তোলে। তিনি ছন্দের কাঠামোকে দৃঢ় রাখলেও কখনওই সুরের প্রবাহকে ছাপিয়ে যাননি।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশন করেন গ্বালিয়র ঘরানার বিশিষ্ট শিল্পী পণ্ডিত ওমকার দাদরকর। তিনি রাগ কামোদে বিলম্বিত একতালে নিবদ্ধ বন্দিশ ‘তোরে দরবার’ দিয়ে শুরু করেন। সুকণ্ঠের অধিকারী ও অভিব্যক্তিপূর্ণ এই শিল্পী তাঁর পরিবেশনায় রাগের শুদ্ধতা বজায় রেখে বোল-বাঁটের মাধ্যমে বন্দিশের অর্থ ও রাগের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলেন। বিলম্বিত অংশে ধীর লয়ে রাগের বিস্তার গ্বালিয়র ঘরানার বন্দিশনির্ভর গায়কির বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরে। শিল্পীর স্বরক্ষেপণে তাঁর গুরু পণ্ডিত উল্লাস কশলকরের স্বভাবসিদ্ধ আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা ও রোম্যান্টিকতার ছায়া স্পষ্ট ছিল। এর পরে তিনি পরিবেশন করেন বিখ্যাত মধ্যলয় বন্দিশ ‘ছন্দ দে মোরা আঁচরা’। এই অংশে শিল্পীর তান-সরগমে প্রাণশক্তি ও আবেগের প্রকাশ লক্ষ্যণীয় ছিল। এরপর মধ্যলয় একতালে ‘লাগি মোরি নয়ি লগন’ দিয়ে তিনি রাগ কামোদের পরিবেশনায় সমাপ্তি ঘটান। জটিল তানপ্রয়োগ সত্ত্বেও রাগের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন তিনি। শেষে পরিবেশন করেন কবীরের ভজন ‘সুনো সুনো সাধুজী’। শিল্পীকে তবলায় সঙ্গত করেন পণ্ডিত পরিমল চক্রবর্তী। তাঁর বলিষ্ঠ ঠেকা ও সূক্ষ্ম ইম্প্রোভাইজ়েশন পণ্ডিত ওমকারের কণ্ঠসঙ্গীতকে কখনও সমৃদ্ধ করেছে, আবার কখনও স্বকীয়তায় মুখর হয়ে উঠেছে। হারমোনিয়ামে ছিলেন সারং সম্ভারে, যিনি সংযত ও নিখুঁত সুরসঙ্গত প্রদান করেন।

একেবারে শেষে পরিবেশনা করেন তবলিয়া বিক্রম ঘোষ। তাঁর একক বাদনের মধ্য দিয়েই এই সুরেলা সন্ধ্যার পরিসমাপ্তি ঘটে। সুরসঙ্গম দীর্ঘ দিন যাবৎ অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে পরিণত শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছে। এমন সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন সংস্থার পথচলাকে ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় করে তুলবে, সন্দেহ নেই।

গৌরব দত্ত

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন