কোনও একটি ‘পাঠ্য’ বা ‘টেক্সট’-এর নির্দিষ্ট, একমাত্রিক, স্থায়ী অর্থ থাকে না। কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল-কেও তাই চলমান, অনিশ্চিত, বহুমাত্রিক একটি পাঠ্য হিসেবে দেখাই স্বাভাবিক। কিন্তু এমন কথা শুনলেই সনাতনী ‘মার্ক্সবাদী’দের কেউ কেউ আপনাকে ‘পো-ম’ (পোস্টমডার্ন) বলে কটাক্ষ করতে পারেন। তবু যে কতিপয় মানুষ— যাঁরা প্রধানত অর্থনীতির শিক্ষক কিংবা তরুণ গবেষক— একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে একত্রে নিয়মিত ক্যাপিটাল পাঠ করছেন, আলোচনা করছেন, এবং বাংলাভাষায় প্রবন্ধ রচনার তাগিদ অনুভব করছেন, তা যথোচিত গুরুত্বের দাবি পেশ করে। আলোচ্য বইটি এমনই একটি উদ্যোগের ফসল। সম্পাদক অঞ্জন চক্রবর্তী ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে যে ধরনের মার্ক্সীয় পদ্ধতির চর্চায় রত, তা সনাতনী মার্ক্সীয় চর্চার থেকে অনেকটা দূরে। মার্ক্স যে সময়ে দাঁড়িয়ে পুঁজিতন্ত্রকে তাত্ত্বিক ভাবে উন্মোচন করছেন, সে সময়ের পুঁজিতন্ত্র আপাতভাবে এখনকার পুঁজিতন্ত্রের থেকে বিস্তর আলাদা ঠেকবে। যদি শুধু প্রযুক্তি এবং ফাইনান্স পুঁজির অভূতপূর্ব বিস্তারের দিকেই তাকানো যায়, তা হলেও এই পরিবর্তনটা চোখে পড়বে। কিন্তু শুধু ক্যাপিটাল নয়, মার্ক্সের অজস্র অন্য রচনা যা কয়েক দশক আগেও অন্তরালে ছিল, এখন ইংরেজি ভাষায় লভ্য। তা থেকেও আগ্রহীরা অনেক নতুন ভাবনার সন্ধান পাচ্ছেন।
উত্তর-আধুনিকতার প্রধান তাত্ত্বিক ফ্রেডরিক জেমসন চার দশক আগেই বললেন, পুঁজিতন্ত্র শেষ হয়ে যাচ্ছে। অন্যরাও সে সময়ে বলছিলেন ‘শিল্পোত্তর সমাজ’-এর কথা; পুঁজিতন্ত্র পরিপক্ব হয়েছে, এখন পরবর্তী পর্যায়টি নিয়ে ভাবতে হয়। সে পর্যন্ত চিন্তাচর্চা ছিল এক ধরনের উত্তরণের আখ্যানে জারিত। কিন্তু ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মেনে পরের ধাপ তো সাম্যবাদ, অথচ তা কল্পনাতেও আসছে না। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলে, সমাজ এগোবে দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতো এক ধাপ থেকে পরের ধাপে— আদিম সাম্যবাদ, প্রাচীন দাসব্যবস্থা, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র, অন্তিমে সাম্যবাদ। বিজ্ঞানের মতোই ধ্রুব, অতএব এর অন্যথা হতে পারে না। বলা বাহুল্য, মার্ক্সের লেখাপত্র থেকে এই ‘মার্ক্সবাদ’ই যে উঠে আসে তা নয়। মার্ক্সের বহুমাত্রিক ভাবনাকে একমাত্রিক ছাঁচে ভরে দেওয়ার পরিণতিতেই পাই এমন ভাষ্য। আর্থনীতিক ‘ভিত্তি’ আর সাংস্কৃতিক ‘উপরিস্তর’-এর মধ্যে যান্ত্রিক বিভাজন, আর সেখান থেকে আর্থনীতিক নির্ধারণবাদ, যার অর্থ হল সমাজের যাবতীয় দ্বন্দ্বের ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিতেই নিহিত রয়েছে, অর্থাৎ অর্থনীতিই ‘নির্ধারণ’ করছে।
এই সনাতনী মার্ক্সবাদ বিজ্ঞানবাদ (সায়েন্টিজ়ম), সারবাদ (এসেনশিয়ালিজ়ম) কিংবা নির্ধারণবাদ (ডিটারমিনিজ়ম) দোষে দুষ্ট। এখান থেকে সরে এসে অন্য পথের সন্ধান করতে গেলে মার্ক্স প্রদর্শিত সম্ভাবনাসূত্র ধরেই এগিয়ে যেতে হবে এক অ-সারবাদী অ-নির্ধারণবাদী মার্ক্সবাদ নির্মাণে। ও-দিকে পুঁজিতন্ত্র থেকে ‘উত্তরণ’-এর আখ্যানটিও ক্রমশ বদলে যেতে থাকল পণ্ডিতদের ভাষ্যে। উত্তর-আধুনিক কিংবা ‘শিল্পোত্তর সমাজ’-এর চিন্তায় আর যা-ই থাক, আজকের দিনে যাকে বলে ‘ডিসটোপিয়া’, তা ছিল না। পুঁজিতন্ত্র থেকে এগিয়ে যাওয়া কোনও উত্তর-পুঁজিতন্ত্রের কথা এখন আর শোনা যায় না। যা হচ্ছে তা যেন এক রকমের সামন্ততন্ত্রে অবনমন। কেউ কেউ একে বলছেন টেকনো-ফিউডালিজ়ম, যেমন সুপরিচিত গ্রিক অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারুফাকিস। কেউ বা বলেন ডিজিটাল ফিউডালিজ়ম, কেউ বা ইনফরমেশন ফিউডালিজ়ম।
পুঁজির ঐ লৌহকপাট: মার্কসের ক্যাপিটাল ও বিকল্প পথ
সম্পা: অঞ্জন চক্রবর্তী
৬০০.০০
সারস
টেকনো-ফিউডালিজ়মের কেন্দ্রীয় ধারণাটি খাজনা বা ‘রেন্ট’। এই খাজনার সঙ্গে অবশ্য জমির কোনও সম্পর্ক নেই। যে কোনও উৎপাদনের উপকরণেই তা প্রযোজ্য হতে পারে। যে উপকরণটি লভ্য করে তুলতে আর অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে না এর মালিককে, কিন্তু এটি বিক্রি করে তার লাভ হয়েই চলেছে। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এমন কিছু পণ্য আছে যা এ রকম, এবং সেই পণ্যগুলির পরিমাণ ও ব্যাপ্তি এত বিশাল যে অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রকেই তা প্রভাবিত করে। এই পণ্যের মালিকদের এই খাজনা বাবদ (মুনাফা না বলে খাজনা বলাই সঙ্গত) আয় আকাশচুম্বী। এই খাজনা-আয়ের প্রক্রিয়াটির মধ্যেও মার্ক্স-কথিত আদি পুঞ্জীভবনের কিছু মিল যেন দেখতে পাওয়া যায়। এই সূত্র ধরে ডেভিড হারভি-র ‘অধিকারচ্যুতির মধ্যে দিয়ে পুঞ্জীভবন’-এর ধারণাতেও উপনীত হওয়া যায়, বিশেষত এই ধারণাটি যে-হেতু উন্নয়নশীল বিশ্বের আলোচনায় খুবই জনপ্রিয়।
এই চলমান প্রেক্ষাপটে আলোচ্য বইটিকে দেখা যেতে পারে, যা বাংলা ভাষায় মার্ক্সীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি চর্চায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সনাতনী মার্ক্সবাদ সারবাদ এবং নির্ধারণবাদ দোষে দুষ্ট। প্রশ্ন হল, কেমন হবে সেই মার্ক্সীয় বিকল্প পদ্ধতি, যা সারবাদী বা নির্ধারণবাদী নয়? আর এই পদ্ধতি অনুসরণ করে কি এমন পথ খুঁজে পেতে পারি যা আমাদের সমকালীন সমাজ-অর্থনীতি বুঝতে সাহায্য করবে? একটু ভাবলেই বোঝা যায়, এই মুহূর্তে তার রূপরেখাটি স্পষ্ট নয়। স্পষ্ট হতেও পারে না, কারণ বিকল্পের লক্ষ্য আমাদের এনে ফেলে এক বহুমুখী অন্বেষণ প্রকল্পে। অঞ্জন চক্রবর্তী ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের অ-নির্ধারণবাদী এবং শ্রেণি-অবলম্বী মার্ক্সীয় পদ্ধতির চর্চায় রত। এই বইয়ের প্রতিটি রচনাকেই দেখতে হবে সেই অন্বেষণের প্রকাশ হিসেবে, কোনও সমস্যা সমাধানের ‘ব্লু-প্রিন্ট’ হিসেবে নয়।
সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত সতেরোটি প্রবন্ধের প্রতিটি নিয়ে আলাদা ভাবে আলোচনা এই পরিসরে সম্ভব নয়। কিন্তু বিষয়বৈচিত্রের আন্দাজ দিতে কয়েকটির উল্লেখ করা যায়। ফাইনান্স পুঁজির প্রকৃতি, গ্লোবাল ভ্যালু চেন, নতুন শ্রম কোড, দারিদ্র বা কৃষি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি— মার্ক্সীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এদের বিশ্লেষণ স্বতন্ত্র আলোচনার দাবিদার। অন্য দিকে, নাট্য সংগঠনের শ্রেণি-অবলম্বী আলোচনাও বিষয় হিসেবে বেশ ব্যতিক্রমী। কিন্তু পাশাপাশি এসেছে এমনই কিছু বিষয়, যা সঙ্কলনটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। পরিবারের নারী সদস্যের দ্বারা অবৈতনিক গৃহশ্রমের প্রশ্নটি পশ্চিমের নারীবাদী চর্চায় কয়েক দশক ধরেই প্রধান জায়গায় রয়েছে। সে বিষয়ে মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা যেমন অবদান রেখেছেন, অন্যরাও আলোকপাত করেছেন। মার্ক্সীয় তত্ত্ব একটি পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সংগঠনে উদ্বৃত্তমূল্য উৎপাদন ও আহরণের প্রক্রিয়াকেই কেন্দ্রে রাখে। গৃহশ্রমকে সরাসরি সেই বিশ্লেষণ কাঠামোয় কী ভাবে আনা যায় তা নিয়ে মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা ভেবেছেন। কিন্তু প্রশ্নটি মার্ক্সীয় শ্রেণি-অবলম্বী তত্ত্বের আদরায় দেখার চেষ্টা কমই হয়েছে। এই কাজটি করেছেন মেখলা ভৌমিক অত্যন্ত গভীরে গিয়ে। শ্রেণি-অবলম্বী পদ্ধতি যে-হেতু শ্রেণি প্রক্রিয়ার দিক থেকে উৎপাদন আহরণ ও বণ্টনের প্রশ্নটিকে দেখে, গৃহশ্রমের প্রকৃতি বুঝতে এই তাত্ত্বিক পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে, কারণ এখানে পুঁজিপতি-শ্রমিকের দ্বৈততা স্বাভাবিক ভাবেই অনুপস্থিত।
অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বব্যাপী প্রসার ঘিরে। পৃথ্বীরাজ সাহা, শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য এবং আনন্দময় সিংহ চারটি আলাদা প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, শ্রেণি প্রক্রিয়ার দিক থেকে দেখলে শোষণের পরিবর্তিত প্রকৃতির উপরে নতুন আলো ফেলা যায়, যা সরাসরি সামনে আসে না। মনে আছে, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের প্রসারের প্রথম দিকে এক অভিজ্ঞ বাম ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আক্ষেপ করছিলেন, সংগঠন করতে গেলে ওঁরা আমাদের বলেন: ‘আমরা শ্রমিক নই’। শুনে মনে হচ্ছিল যেন জুতো হাঁটছে, পা রয়েছে স্থির। এই সমবায়ী তত্ত্ব-প্রচেষ্টা কি এমন পরিস্থিতিতে খানিক দিশা নিয়ে হাজির হতে পারে? হয়তো পারে, আর তাই এই চর্চা থামানো চলে না।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে