হারিয়ে গিয়েছে নববর্ষের গন্ধমাখা সেই চিঠি

১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’-এর আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু করে হাল আমলে আইন বদল করে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ থেকে রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ করা— অনেক কিছুই আবর্তিত হয়েছে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে। লিখছেন অশোক সেনগুপ্ত

Advertisement

অশোক সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০১৬ ০০:০০
Share:

“নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন

Advertisement

বর্ষ হয় গত!

আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন

Advertisement

করিলাম নত ।

বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও,

ক্ষমা করো আজিকার মতো

পুরাতন বরষের সাথে

পুরাতন অপরাধ যত।”

এ তো কেবল রবীন্দ্রনাথের একটা কথা নয়, বাংলা নববর্ষকে স্মরণ করে তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। লিখেছেন অন্য অনেকে। ওই বিশেষ দিনটি একসময় দিনপঞ্জিকায় অনেকের কাছে লাল কালির ছিল অন্য কারণে। চিঠি লিখতে হবে। বড়দের প্রণাম, ছোটদের শুভেচ্ছা জানাতে হবে। অনেকে প্রতীক্ষায় থাকতাম অন্যদের কাছ থেকে নববর্ষের চিঠি পাওয়ার জন্যও।

১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’-এর আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু করে হাল আমলে আইন বদল করে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ থেকে রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ করা— অনেক কিছুই আবর্তিত হয়েছে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে। হালখাতা, নতুন বইয়ের আবির্ভাব, লেখক-প্রকাশক মিলন— এ সবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বাংলা নববর্ষের সঙ্গে। নববর্ষের চিঠির আবেগের গভীরতা বুঝি অনেকের কাছেই অতলান্ত!

চিঠি আজ অনেকটাই অতীত। তাই নববর্ষের প্রণাম বলুন বা শুভেচ্ছা, স্নেহ-ভালবাসার আদানপ্রদান— সব কিছুরই ঘরানা বদলে গিয়েছে। ফোনে ভাব বিনিময়ের পাশাপাশি এসে গিয়েছে ফেসবুক, এসএমএস, টুইটার। সহজ হয়েছে ভাব বিনিময়, কিন্তু কমেছে তার আবেগ।

‘‘ছেলেবেলায় নববর্ষের চিঠির জন্য রীতিমতো মুখিয়ে থাকতাম!’’ স্মৃতিমেদুরতায় ভেসে গেলেন হৈমন্তী শুক্ল। সপরিবার লখনউ থেকে প্রথমে ওপার বাংলার পাবনা, তার পর কলকাতা। বাবা হরিহর শুক্ল ছিলেন নামী শিল্পী। ‘‘ছেলেবেলা থেকেই দেখতাম বাবা বাংলা নববর্ষে চিঠি দিতেন। লেখাপড়া শেখার পর আমরাও ধরে নিয়েছিলাম, এটা, মানে নববর্ষের চিঠি আমাদের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ!’’ কাকে বেশি লিখতেন? ‘‘প্রথমে তো মনে পড়ছে জ্যাঠামশাইয়ের কথা! আমরা লখনউ থেকে চলে এলেও উনি ওখানে থেকে গিয়েছিলেন। ওঁকে প্রণাম জানাতাম। পরের দিকে তো এ দিনটায় অনেকের সঙ্গে প্রণাম জানাতাম হেমন্তদাকে (মুখোপাধ্যায়)। মনে পড়ছে ১৯৭৪-’৭৫ সালে লন্ডন থেকেও শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন আমাকে।’’


অলঙ্করণ: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

গোড়াতেই রবিঠাকুরের কথা লিখেছি। প্রায় শতবর্ষ আগে ১৩২৫ সালে ‘কল্যাণীয়াসু রাণু’-কে লিখলেন, ‘‘আজ আর বেশি লেখবার সময় নেই- কেননা আজ তিনটের গাড়িতেই রওনা হতে হবে। গাড়ি ফেল্ করবার আশ্চর্য্য ক্ষমতা আমার আছে- কিন্তু সে ক্ষমতাটা আজকে আমার পক্ষে সুবিধার হবে না অতএব তোমাকে নববর্ষের আশীর্বাদ জানিয়ে আমি টিকিট কিনতে দৌড়লুম।’’ ইতি-
শুভাকাঙ্খী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৮-র ১৫ এপ্রিল শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা আসার মুখে লেখা শুভেচ্ছাপত্র। বলা বাহুল্য, সে দিনের সেই বালিকা রাণু, পরবর্তীকালের লেডি রাণু।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন যাদবপুর নিবাসী কবি অরুণাচল বসু। প্রচুর চিঠি পেতেন, লিখতেনও। তাঁর চিঠির ঝাঁপিতে দেখা যাচ্ছে পিকচার পোস্টকার্ড— ‘দাদাবাবুকে ছোট শ্যালিকা সোমার (ডলি ঘোষ) শুভেচ্ছাপত্র’। তারিখটা ছিল ১ বৈশাখ, ১৩৭১, ইংরেজি ১৪ এপ্রিল, ১৯৬৪। পোস্টকার্ডের অর্ধেকটায় রঙিন ছবি— জলভরা কলস মাথায় রমণী।

নববর্ষে চিঠির স্মৃতি এখন অনেকটাই ধূসর লেখিকা বাণী বসুর কাছে। ‘‘যখন ছোট ছিলাম, এমনকী, একটু বড় বয়সেও চিঠি লিখতাম। এ দিক থেকে ১ বৈশাখের তাৎপর্য অবশ্যই ছিল অন্য রকম। কিন্তু আজ আমি তো সে সব থেকে অনেক দূরে! শুভেচ্ছা পাওয়া ও জানানো— দুয়ের সংখ্যাই কমে এসেছে!’’

নববর্ষের চিঠির গুরুত্ব কমেছে প্রাক্তন উপাচার্য পবিত্র সরকারের কাছেও। কিন্তু তাৎপর্য কমেনি একটুও— ‘‘জানেন তো! এখনও এ দিনের একটা চিঠি পেলে একটু অন্যরকম লাগে! স্মৃতির ঝাঁপি খুলতে বসে বললেন, ‘‘আমরা এ পারে চলে এলেও বাবা ১৯৪৭ থেকে বছর পাঁচ থেকে গেলেন দেশের বাড়িতে (বাংলাদেশে)। প্রথমে খড়্গপুরে থাকতাম। সেখান থেকে বাবা ছাড়াও, ছোটবেলার গৃহশিক্ষক অমূল্য আচার্য-সহ গুরুজনদের চিঠির মাধ্যমে বড়দিনের প্রণাম জানাতাম। যখন ১৯ বছর বয়স, সেই ১৯৫৬-তে চলে এলাম কলকাতায়। বাগবাজারের বাড়ি থেকে কিন্তু নিরলস ভাবে চলত আমার চিঠির মাধ্যমে শুভেচ্ছা আর প্রণাম জানানো। নব্বইয়ের দশক থেকে আস্তে আস্তে কমে গেল!’’ আশি ছুঁই ছুঁই শিক্ষাবিদ এখনও নববর্ষের চিঠি পান প্রকাশক, ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে।

নববর্ষের চিঠির কথা শুনে আনন্দে উচ্ছ্বল হয়ে উঠলেন নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়। বললেন, ‘‘ছোটবেলায় দিল্লিতে মামার বাড়িতে থাকতাম। কলকাতায় প্রতি বছর এ দিনটায় দাদু-দিদাকে আর আসানসোলে জ্যাঠামণিকে প্রণাম জানিয়ে চিঠি লিখতাম। জেঠিমা জবাব দেওয়ার সময়ে আমার লেখা ভুল বানান শুধরে দিতেন! এ সবের পরশ কি আর এখনকার ছেলেমেয়েরা পাবে?’’

ষাটের দশকে দিনের পর দিন ময়দান কাঁপিয়েছেন সুকুমার সমাজপতি। এখন প্রায় ৭৬। নববর্ষের চিঠির কথা জানাতে গিয়ে বললেন, ‘‘প্রতি বছর প্রায় ৫০-৬০টা করে ফ্যানের শুভেচ্ছাবার্তা পেতাম। কিন্তু বিশেষ একটা চিঠির কথা এখনও মনে আছে। বছর পাঁচ পর পর একটা পোস্টকার্ড পেতাম। তাতে থাকত কেবল শুভেচ্ছা আর আমার উন্নতি কামনা। প্রেরক হিসাবে কারও নাম-ঠিকানা থাকত না। নামের জায়গায় লেখা থাকত জনৈক শুভাকাঙ্খী। হস্তলেখা কোনও মহিলার। অনুমান করতাম কে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু কোনওদিন তিনি আমাকে বুঝতে দেননি, আমিও প্রকাশ করিনি আমার অনুমানের কথা। এর পর ১৯৬৪-র পয়লা বৈশাখের ক’দিন বাদে কালীঘাট থেকে আমরা চলে এলাম গড়িয়ার বাড়িতে। সেই সূত্রটা কেটে গেল। কিন্তু নববর্ষের চিঠির অমলিন স্মৃতি রয়ে গেল চিরকালের মতো।

আধুনিকতা আর প্রযুক্তি কি তা হলে মুছে দিচ্ছে নববর্ষের চিঠির আবেগকে? অলকানন্দার কথায়, ‘‘অবশ্যই! হাতে লেখার একটা আলাদা উষ্ণতা আছে। কেবল চিঠি নয়, আমার নাচের স্কুলের শংসাপত্র দিকে গেলে ছাপিয়ে বা কম্পিউটারে লিখে নয়, সেটা হাতে লিখেই দিই। কারণ ওই পার্সোনাল টাচ!’’ পবিত্রবাবু অবশ্য বলেন, ‘‘সত্যি কথা কি জানেন? ডাকঘরে গিয়ে পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটার বা ডাকটিকিট কেনো, চিঠি লেখো, ফের ডাকবাক্সে ফেলো— এই প্রক্রিয়াটাও তো অনেকের কাছে সমস্যার হয়ে উঠেছে! এ দিক থেকে প্রযুক্তির সুফল কেউ নিলে ক্ষতি তো নেই!’’

বাংলা নতুন বছরের কবিতা দিয়ে শুরু করা চিঠির এই লেখার সমাপ্তির রাশ যদি টানি সেই কবিতার মধ্যে দিয়েই? ‘‘নতুন বছরে সেই অনাগত নতুনের প্রত্যাশা বন্ধু, তোমাকে নববর্ষের সাদর সম্ভাষণ!’’

(মহাদেব সাহা /‘নববর্ষের চিঠি’)।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন