প্রবন্ধ

উপকরণই সব নয়, শিক্ষাটাও চাই বইকী

১৫ জুলাই, ২০১৬। উত্তরপ্রদেশের তরুণ মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব গিয়েছিলেন তাঁর রাজ্যের উত্তরের জেলা শ্রাবস্তীর একটি প্রাথমিক স্কুলে। গত বছরের শেষার্ধে সব বড় রাজনৈতিক দলের সদস্যরাই উত্তরের জেলাগুলোয় বার বার গিয়েছেন।

Advertisement

অভিষেক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০০:০০
Share:

১৫ জুলাই, ২০১৬। উত্তরপ্রদেশের তরুণ মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব গিয়েছিলেন তাঁর রাজ্যের উত্তরের জেলা শ্রাবস্তীর একটি প্রাথমিক স্কুলে। গত বছরের শেষার্ধে সব বড় রাজনৈতিক দলের সদস্যরাই উত্তরের জেলাগুলোয় বার বার গিয়েছেন। কারণ, অবশ্যই, বিধানসভা নির্বাচন। অখিলেশ যাদব শ্রাবস্তীতে গিয়েছিলেন গর্ভবতী মহিলা ও অপুষ্ট বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত নতুন একটি সরকারি প্রকল্প ঘোষণা করতে। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে, তাঁর জমানায় উত্তরপ্রদেশে তথাকথিত উন্নয়নের কথা প্রচার করতে।

Advertisement

কিন্তু ওই অঞ্চলের একটি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর চক্ষু চড়কগাছ! একটি ক্লাসে ঢুকে পড়ুয়াদের কিছু জিজ্ঞেস করায় একটিমাত্র মেয়ে তাদের পড়ার বইয়ের একটি অধ্যায় হিন্দিতে পড়তে পেরেছিল। ‘বাকিরা কেউ একটা শব্দও পড়তে পারেনি’— জানাচ্ছে একটি রিপোর্ট।

এই ঘটনা বুঝিয়ে দেয়, ভারতে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যা চলছে, তার গলদটা কোথায়। অখিলেশ যাদব যে স্কুলটিতে গিয়েছিলেন, আপাতভাবে সেই স্কুলে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিকাঠামো মজুত ছিল: পাকা বাড়ি, পড়ুয়াদের কাছে বই, স্কুলের পোশাক, সঙ্গে এমনকী একটি টাই-ও। কিন্তু আসল লেখাপড়ার নামে লবডঙ্কা। এই দুরবস্থার জন্য অখিলেশ যাদব দায়ী করেছেন শিক্ষকদের। তাঁর মতে, শিক্ষকরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নষ্ট করতে বদ্ধপরিকর। তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে সরকারি আয়ব্যয়ের তত্ত্ব নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতাও দেন, বলেন, ‘সরকারকে একটু অন্তত কৃপা করুন। এদের জন্যই তো আপনারা মাইনে পান, আমাদের জন্য নয়।’ পড়ুয়ারা যদি নিজের মাতৃভাষায় একটি শব্দও পড়তে না পারে, তা হলে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতিতে কেন টাকা খরচ করবে, মুখ্যমন্ত্রী সে প্রশ্নও তোলেন। এবং এই নাটকীয় কাহিনির পরিসমাপ্তি ঘটে একটি প্রত্যাশিত ঘোষণায়— মুখ্যমন্ত্রী জেলার বেসিক এডুকেশন অফিসারকে সাসপেন্ড করে দেন, বোধ হয় আর কী করা যায় ভেবে না পেয়েই।

Advertisement

তবে এই গল্পের একটা ভাল দিকও আছে। সমস্যার সমাধান কী করে হবে, সেটা না জানলেও অখিলেশ যাদব সমস্যাটিকে বুঝতে পেরেছিলেন। তিন দশক আগে উত্তরপ্রদেশের কোনও মুখ্যমন্ত্রী সম্ভবত ক্লাসরুম ভর্তি ছেলেমেয়ে দেখলেই উল্লসিত হতেন। এখন ছবিটা কিছুটা হলেও অন্য রকম। শুধু শিক্ষার উপকরণ থাকলেই চলে না, লেখাপড়াটা হওয়া দরকার— এই ধারণা মানুষের মনে জন্মেছে। এবং এই বোধোদয়ের কাজে অনেকটাই অবদান রয়েছে অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট (এএসইআর)-এর। ২০০৫ সাল থেকে ‘প্রথম’ নামক একটি সংস্থা প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে নানা রকম সমীক্ষা চালিয়ে প্রতি বছর এই ‘অসর’ রিপোর্ট তৈরি করে। ২০১৬ সালের রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এবং তার সারমর্ম দশ বছর আগের রিপোর্টের থেকে বিশেষ কিছু আলাদা নয়। সারা দেশেই শিক্ষার নিম্নমান আজও হতাশা জাগায়। ভারতের গ্রামাঞ্চলে ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের ৯৭ শতাংশ স্কুলে গেলেও, দ্বিতীয় শ্রেণির পড়ুয়াদের মাত্র ১৩ শতাংশ নিজেদের মাতৃভাষায় লেখা বই পড়তে পারে।

এএসইআর আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু হয় ২০০৫ সালে। ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছর পরে। ইউপিএ প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে জোর দেয় এবং তার ব্যয় সংস্থানের জন্য দুই শতাংশ শিক্ষা-সেস বসায়। তত দিনে ভারতের গ্রামে ৯০ শতাংশের বেশি শিশু স্কুলে নাম লিখিয়ে ফেলেছে, তাদের শিক্ষার মান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজলভ্য ছিল না। ২০০৫ সালের শেষ দিকে ‘প্রথম’ একটি অতি কঠিন উদ্যোগ নেয়— ভারতের সাধারণ নাগরিকদের দিয়ে একটি জাতীয় সমীক্ষা করায়। সমীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল, বাচ্চারা বুনিয়াদি স্তরে কতটা পড়তে পারে এবং অঙ্ক কষতে পারে, সেই তথ্য সংগ্রহ করা।

এই ভাবেই নাগরিক সমাজের সঙ্গে সরকারের মতের আদানপ্রদানের নতুন প্রয়াস শুরু করেছিল অসর। দিল্লিতে তো বটেই, অন্যান্য মহানগর ছাড়া ছোট-বড় নানা শহরেও এই উদ্যোগ হয়। ২০০৯-১০ সালে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় অসর-এর পরিসংখ্যান উল্লেখিত হয়। তত দিনে গণমাধ্যম ও সমাজকর্মীরা এই রিপোর্ট ব্যবহার করে সরকারকে শিক্ষা নীতি সংস্কারের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করেছেন। সাফল্যের হাত ধরেই আসে সমালোচনাও। অভিযোগ ওঠে, অসর শিক্ষার ব্যর্থতার জন্য ‘শিশুদেরই দোষ দেয়’। এর জবাবে ‘প্রথম’ বলে, এই রিপোর্টে জনসাধারণের সামনে ‘কেবল একটা আয়না তুলে ধরা হয়েছে’, যাতে তাঁরা সরকারের কাছে উন্নত মানের শিক্ষার দাবি করতে পারেন। ভারতে এবং ভারতের বাইরে জনপ্রিয় হলেও অসর-এর যেটা প্রধান শিক্ষা— আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষার পরিকাঠামো এবং উপকরণের উন্নতি সত্ত্বেও শিশুরা ভাল করে লেখাপড়া শিখতে পারছে না— এই কথাটা এখনও মানুষের মনে গেঁথে যায়নি।

বাচ্চাদের পড়াশোনার মান কী ভাবে উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে আজও কোনও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এ বছর ১৮ জানুয়ারি অসর প্রকাশের সময় দিল্লির উপ-মুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যমও এ বিষয়ে একমত হতে পারেননি। অর্থনীতিবিদ সুব্রহ্মণ্যম বলেন, গ্রামের গরিব মানুষ ষে ভাবে সড়ক বা সেতুর উন্নতির দাবি জানিয়ে এসেছেন, উন্নত মানের শিক্ষার জন্য সে ভাবে দাবি তোলেননি। তাঁর মতে, এটাই বড় বাধা, যতক্ষণ না ‘শিক্ষার দাবি তুলে রাজনৈতিক সাফল্য মিলবে’, তত দিন উৎকৃষ্ট শিক্ষার প্রসার সহজ হবে না। সিসোদিয়া শিক্ষার দাবিতে কাজ করেছেন, এখন দিল্লি সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকও সামলাচ্ছেন। তিনি আবার মনে করেন, রাজনীতিক এবং আমলারা সচরাচর শিক্ষার ব্যাপারে অদূরদর্শী, এবং এই কারণেই শিক্ষাক্ষেত্রে যথাযথ নীতি ও পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। এবং এর ভুক্তভোগী হচ্ছে ছাত্ররা।

প্রথম এবং অন্য নানা সংস্থার গবেষকরা শিক্ষার ব্যাপারে যা বলেন, সিসোদিয়ার মতও খানিকটা তেমনই। এঁদের মতে, শিশুর বয়স কত বা সে কোন ক্লাসে পড়ে, কেবল সেটা দেখলে চলবে না, শিক্ষককে দেখতে হবে একটি শিশু কতটা পড়াশোনা শিখেছে, এবং সেখান থেকে পড়াতে শুরু করে তাকে শিক্ষার ন্যূনতম স্তরে পৌঁছে দিতে হবে। আমাদের এই অদ্ভুত রকমের বিভ্রান্ত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের কেবল পড়াশোনায় ভাল ছাত্রদের দিকেই নজর দিতে বলা হয়। গ্রামের সরকারি স্কুলে সেই নজরটা মূলত পায় উচ্চবর্ণের বা শিক্ষিত অভিভাবকের ছেলেমেয়েরা। অধিকাংশ শিশুর লেখাপড়া শেখার সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু তারাই উপেক্ষিত হয় এবং তাদের শিক্ষার মান অত্যন্ত নিচু থেকে যায়। এই ভাবেই আমরা এমন একটি দেশে পরিণত হয়েছি, অমর্ত্য সেন যাকে বলেছেন ‘ফার্স্ট বয়দের দেশ’।

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলিতে দেখা যাচ্ছে যে, বেসরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তি হওয়ার দিকে ঝোঁকটা ক্রমশ বাড়ছে, তার সঙ্গে বাড়ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার প্রবণতা। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে এটা পরিষ্কার যে, বেসরকারি স্কুলে পড়লেই উন্নত মানের শিক্ষা পাওয়া যাবে, তা নয়। ইংরেজির প্রতি ঝোঁকটা অবশ্য স্বাভাবিক। যে কোনও কাজেই এখন ইংরেজি জানা অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে গ্রাম বা মফস্সলের ছেলেমেয়েদের কাছে সামাজিক উত্তরণের কার্যত একমাত্র পথ হল পরিষেবা ক্ষেত্রে কাজ করা, এবং এই ক্ষেত্রে কাজ করতে হলে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অপরিহার্য।

আর একটা বড় ব্যাপার হল অভিভাবকদের চাহিদা আর সরকারি শিক্ষানীতির মধ্যে বিরাট ফারাক। এ বছরের অসর-এ প্রথম-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাধব চহ্বান এই বিষয়ে খুবই জোর দিয়েছেন। খেয়াল করা দরকার, ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইনে প্রধানত শিক্ষার উপকরণগুলির উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেমন স্কুলবাড়ি, শিক্ষকের সংখ্যা, বইখাতা ইত্যাদি। সেগুলো প্রয়োজনীয় ঠিকই, কিন্তু অভিভাবকরা এখন আর উপকরণে সন্তুষ্ট নন, তাঁরা চান ছেলেমেয়ে সত্যিই লেখাপড়াটা শিখুক। অন্য দিকে, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের বিপুল প্রসারের ফলে শিক্ষার উপকরণের ধারণাটাও দ্রুত পালটে যাচ্ছে। তাই ওই আইনটি আজ আর আগের মতো সময়োপযোগী নয়।

ভারতে অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বিপুল, উৎপাদন শিল্পও প্রায় স্থবির। জনসংখ্যায় তরুণের অনুপাত বিরাট। সুতরাং আমরা একটা বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলেছি, এমন একটা ভয় খুব বাড়ছে। উন্নত মানের প্রাথমিক শিক্ষা হয়তো সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সব সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু সাধারণ নাগরিককে সমান অধিকার দেওয়ার পথে সেটা অবশ্যই একটা জরুরি পদক্ষেপ। তিন দশক পরে সরকার নতুন জাতীয় শিক্ষা নীতি তৈরি করতে চলেছে। এই নীতি ‘উচ্চমানের শিক্ষা, উদ্ভাবন ও গবেষণা’র ওপর জোর দিয়েই ভারতকে ‘জ্ঞানের ভুবনে মহাশক্তি’ করে তুলতে চাইছে। আশা করি, জাতীয় শিক্ষা নীতি যে সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তার কয়েকটি অন্তত কার্যকর হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement