অতীত: অন্ধ্রপ্রদেশে উদ্ধার হওয়া অশোকের ভাস্কর্য, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আবহে ধর্ম স্পষ্টতই এক বলিষ্ঠ রাজনৈতিক হাতিয়ার। জনপরিসরেও এমন ধারণা প্রবল যে, এ বছরের মতো মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গে অতীতে খুব কমই দেখা গিয়েছে। আজকের ভারতে ধর্ম আর রাজনীতি এমন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে, কোনওটাকেই আর আলাদা করে চেনা মুশকিল হয়। পশ্চিমবঙ্গেও তেমনটাই ঘটছে।
ঔপনিবেশিক আমলে নিজেদের শাসনতান্ত্রিক সুবিধার্থে ভারতে ধর্ম-জাতপাতের বিভেদ বজায় রাখা ছিল ব্রিটিশের সুপরিচিত রাজনীতি। কিন্তু বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার এক অন্য সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়। ধর্মীয় সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘুর ভোট জয়ের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গকে রাজনৈতিক ভাবে মেরুকৃত রাজ্যের তকমা দিয়েছে। কোনও বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে হয় তোষণ, নয় নির্মূল করার নীতি পশ্চিমবঙ্গকে এই ধর্মীয় মেরুবিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অথচ সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিভিন্ন কারণ নির্দেশ করে দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতার পরবর্তী কালে, বিশেষ করে ষাটের দশকের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক অশান্তির অস্তিত্ব বিশেষ ছিল না। দেশভাগের প্রত্যক্ষদর্শীরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দগদগে স্মৃতি মনে লালন করলেও স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গে তার পুনরাবৃত্তি বড় আকারে অন্তত ঘটেনি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে কোনও রাজনৈতিক দল বলছে, ধর্মের জিগির তুলে অপর রাজনৈতিক দল ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালির মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেবে। এর বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয়রা বার বার তাঁদের মৎস্যপ্রীতির কথা জাহির করছেন। আবার কোনও রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচারের ভিডিয়োতে দেখাচ্ছে, একটি দলকে বোতাম টিপে ভোট দেওয়া মাত্র শাড়ি-পরা মহিলা বোরখা-পরা মহিলায় রূপান্তরিত হচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের হাজার একটা সমস্যার মাঝে ধর্ম একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে নির্বাচনে।
রাজনীতি এবং ধর্মের যোগসাজশ সমাজের প্রগতিশীলদের ন্যায্য ভাবেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁরা দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। কিন্তু এ কথাও মোটামুটি অনস্বীকার্য যে, এ দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মকে পুরোপুরি বাদ দেওয়াও বাস্তবোচিত নয়। শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুর সমর্থন পাওয়ার তাগিদে বা সংখ্যাগরিষ্ঠের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, সাধারণ মানুষের ঐতিহ্যিক মানসিকতার কারণেই ধর্ম ও রাজনীতিকে দু’টি পৃথক পরিসরে রাখার আদর্শগত তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ অনেক সময় দিবাস্বপ্নের শামিল। আশিস নন্দীর মতো পণ্ডিতরা বিদ্যায়তনিক স্তরে সে কথা বহু দিন ধরেই বলে আসছেন। সুতরাং এই অবস্থায় একটি তৃতীয় বিকল্পের উপায় ভাবা খুব দরকার।
প্রাচীন ভারতের দিকে তাকানো যাক। প্রিয়দর্শী অশোকও ধর্ম এবং রাজনীতিকে একত্রে জড়িয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও শান্তিকামী সুশাসক হিসাবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয়। প্রাচীন যুগে রাজার একচ্ছত্র অধিকার বা ধর্মরাষ্ট্রের ধরন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তর্ক থাকতে পারে অশোকের ‘ধম্ম’-প্রয়োগের প্রেক্ষাপট নিয়েও। অশোকের ‘ধম্ম’ সমাজের সব অংশকে খুশি করতে পেরেছিল কি না, তাও বিতর্কিত। কিন্তু এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, অশোক ধর্ম এবং রাজনীতির বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে কী ভাবে শাসনতান্ত্রিক কাঠামো কার্যশীল রাখা যেতে পারে, তা নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষানিরীক্ষার সাহস দেখিয়েছিলেন।
তিনি নিজে বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাঁর ধম্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের মিলও ছিল, তবু বৌদ্ধধর্মকে অবিকল তিনি প্রজাদের উপরে চাপিয়ে দেননি। বিভিন্ন গিরিশাসন থেকে আমরা জানতে পারি, অশোক রাজা হিসাবে প্রজাকুলের ইহলোক এবং পরলোকের উন্নতি সাধনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ধর্মের নামে গুরুত্ব দিয়েছিলেন প্রজাদের নৈতিক আচরণ ও সামাজিক কর্তব্যবোধের উন্নতিসাধনে। অশোক পশুবলির উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। কিন্তু গা-জোয়ারি করে নয়, তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন অহিংসা আদর্শের দার্শনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। অশোক তাঁর ধম্ম বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, সে বিষয়ে খোলসা করে কিছু বলেননি। কিন্তু সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যেখানে অ্যারামাইক বা গ্রিক ভাষায় গিরিশাসনগুলি রচিত হয়েছে, সেখান থেকে আমরা খানিক ধারণা পেতে পারি। গ্রিক ভাষায় রচিত গিরিশাসনগুলিতে তিনি ধম্মের পরিবর্তে ‘ইউসেবিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যার অর্থ করুণা। অন্য দিকে, অ্যারামাইক গিরিশাসনগুলিতে তিনি ব্যবহার করেছেন ‘কাসইত’ এবং ‘দাতা’ শব্দদ্বয়, যাদের অর্থ যথাক্রমে জ্ঞান এবং আইন। এখান থেকে একটি বিষয় অন্তত পরিষ্কার— অশোক রাজনীতি ও ধর্মের মধ্যে সাযুজ্য রেখে কী ভাবে জনহিতকারী শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা যেতে পারে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন।
মোগলশাসিত ভারতবর্ষে প্রথম জীবনের আচারপরায়ণ, রক্ষণশীল, ধর্মপ্রাণ আকবর সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন, ভারতের মতো বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও ধর্মের দেশে শাসকের ধর্ম শাসিতের উপরে আরোপ করলে তার ফল সুমধুর হবে না। অন্য দিকে, তিনি এ-ও মনে করতেন যে, ঈশ্বর তাঁকে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করে শাসন করার জন্য নির্বাচন করেছেন। মধ্যযুগীয় ধর্মরাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে থেকে ভারতের বাস্তব পরিস্থিতির কথা ভেবে আকবর নতুন করে রাজনীতি ও ধর্মের গাঁটছড়া মজবুত ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চিন্তাভাবনা করেন। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ইবাদতখানায় প্রথম দিকে শুধু উলেমা, সুফি, ইসলামি শাস্ত্রে জ্ঞানী ব্যক্তি এবং রাজার প্রিয়সঙ্গীদের প্রবেশাধিকার থাকলেও পরে এর দরজা তিনি ইহুদি, খ্রিস্টান এবং হিন্দু পণ্ডিতদের জন্যও খুলে দেন। এই পণ্ডিতদের সঙ্গে নিজে যোগ দেন দার্শনিক ধর্মালোচনায়। প্রতিষ্ঠা করেন সুলহ-ই-কুল’এর ধর্মীয় সহনশীলতার আদর্শ। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই সুলহ-ই-কুল’এর আদর্শ কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, বা ইবাদতখানা প্রকল্পে আকবরের কোনও সঠিক দিশা ছিল কি না। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, ভারতের মতো বহুধর্মীয় দেশ শাসন করতে গেলে ধর্মের রাজনৈতিক রূপ কী হতে পারে, তা নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করেছিলেন।
আধুনিক ভারতের ধর্মবিষয়ক চিন্তার ক্ষেত্রে নেহরুর ধর্মবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রচালনার আদর্শকে যদি অ-বাস্তবোচিত মনে হয়, ধর্মকে একেবারে বাদ না দিয়েও সমন্বয়বাদ ও সহাবস্থানের মূল্যবোধ এবং পন্থার সন্ধান কিন্তু সহজেই মিলবে বহু উৎস থেকে। গান্ধী— যিনি রাষ্ট্রচালক না হয়েও জাতির জনক বলে স্বীকৃত— তাঁর সর্বহিতার্থক রামরাজ্য স্মরণীয়। আর সমাজ-দর্শনের স্তরে বাঙালির তো লালন ফকির থেকে রবীন্দ্রনাথ, অনেকেই আছেন। এ ধরনের দর্শনের রাজনৈতিক প্রসারণ অসম্ভব বলেও মনে হয় না।
ধর্মকে রাজনীতির থেকে সম্পূর্ণ পৃথকীকরণের কোনও চটজলদি, কার্যকর সমাধান যে আপাতত সম্ভব নয়, তা ক্রমশ স্পষ্ট। তাই কে কতটা কোন ধর্মকে তোষণ বা নির্মূল করার দাবি জানাচ্ছেন, বা কোন ধর্ম কতটা ভাল— সেই অ-ফলপ্রসূ বিবাদে না গিয়ে কী ধরনের তৃতীয় বিকল্পের কথা ভাবলে ভারতীয় পরিস্থিতিতে ধর্ম এবং রাজনীতির বিবাদ বাধবে না, সে বিষয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে। ধর্ম ও রাজনীতির মিশ্রণের এমন সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করেও আমরা যদি আজ তার জন্য কোনও সুষ্ঠু পথ খুঁজে না পাই, সে হবে আমাদের চরম ব্যর্থতা। ভারতীয় গণতন্ত্রে ধর্ম এবং রাজনীতির সহাবস্থানের কী ধরনের সমীকরণ হতে পারে, তা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক চিন্তার দার্শনিক জনভিত্তি প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। বিকশিত ভারতে তা কত দূর সম্ভব, সে প্রশ্ন আছে। আশা ছেড়ে তবু আশা রেখে দিই, হৃদয়রতন-আশে।
ইতিহাস বিভাগ, লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে