West Bengal Election Result

হারজিতের হিসাবনিকাশ

তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিয়েছেন, এই ভাষ্যটিকে ইভিএম-এর প্রসঙ্গ টেনে এনে বার বার লঘু করে দিলে গণতন্ত্রের অমর্যাদা হবে।

শুভময় মৈত্র

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ০৭:৩১
Share:

২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উপর্যুপরি দ্বিতীয় পরাজয়ের পরে লালকৃষ্ণ আডবাণী প্রশ্ন তুলেছিলেন ইভিএম-এর নিরপেক্ষতা নিয়ে। ইভিএম যে সন্দেহাতীত নয়, ২০১০ সালে বিজেপি নেতা জিভিএল নরসিংহ রাও সে কথা প্রমাণ করতে ডেমোক্র্যাসি অ্যাট রিস্ক: ক্যান উই ট্রাস্ট আওয়ার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনস? নামে একটা গোটা বই লিখে ফেলেছিলেন। কাজেই, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়ে এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাত বিষয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, অথবা অতীতে রাহুল গান্ধীও ইভিএম নিয়ে যে অভিযোগ করেছেন একাধিক বার, ভারতীয় রাজনীতিতে তা নতুন কথা নয়— কোনও বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষের নিজস্ব অভিযোগও নয়। যিনি যখন হারেন, তিনিই তখন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

অভিজ্ঞতা বলছে, নাগরিক সমাজও এই অভিযোগে সুর মেলাতে অভ্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গেও একই ঘটনা চলছে— নাগরিক সমাজের যে অংশটি বিজেপির এই জয়ে উদ্বিগ্ন, তারা ভোটযন্ত্রের নকশা কিংবা ব্যাটারির চার্জ বাড়া-কমা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। এই জল্পনা সারবত্তাহীন, সে কথা মেনে নিয়েও বলা প্রয়োজন, ইভিএম-এর প্রযুক্তিগত নকশা স্বচ্ছ ভাবে আলোচিত হওয়া উচিত— যাতে হেরে যাওয়া দল এই অজুহাত সামনে আনতে না পারে। তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিয়েছেন, এই ভাষ্যটিকে ইভিএম-এর প্রসঙ্গ টেনে এনে বার বার লঘু করে দিলে গণতন্ত্রের অমর্যাদা হবে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, সর্বভারতীয় স্তরে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে বিজেপিকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে; একই সঙ্গে অতিক্রম করতে হয়েছে অন্যান্য সহযোগী দলের মতাদর্শ এবং কর্মসূচি। গণতন্ত্রের নিয়ম মেনেই তার ফাঁক খুঁজে বার করা রাজনীতির ধর্ম। বিভিন্ন রাজ্যে অন্য দলের নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক বা সাংসদকে নিজেদের দলে নিয়েছে বিজেপি। অন্য দলের নেতা— যাঁদের বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে বিজেপি— তাঁদেরই আবার নিজেদের দলে নিয়েছে নির্দ্বিধায়। ‘ওয়াশিং মেশিন’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। অর্থাৎ, মতাদর্শের সঙ্গে বিজেপি বহু বার আপস করেছে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে। অবশ্য বিজেপি পাল্টা বলতেই পারে যে, বিপরীত মতাদর্শকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে প্রণয়ে বা রণে কোনও নীতির বালাই থাকতে পারে না।

সেই সূত্রেই বলতে হয় যে, বাম ফ্রন্ট সরকারকে সরানোর জন্যে দীর্ঘ সময় ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সাহায্য করেছে বিজেপি। আবার, গত পনেরো বছরের তৃণমূল রাজত্বে বার বার উঠে এসেছে তৃণমূল-বিজেপি সেটিং তত্ত্ব। অবশ্য এমন ‘বন্ধুত্ব’, বা সে অভিযোগের উদাহরণও একাধিক। কেন্দ্রে কংগ্রেস আর পশ্চিমবঙ্গে বাম ফ্রন্ট সরকার নিয়েও এই অভিযোগ উঠেছে। প্রথম ইউপিএ সরকারের শেষের দিকে কংগ্রেস আর বাম নেতৃত্বের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গে বাম ফ্রন্ট সরকারের পতনের বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্যতম। এ বারের নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্ব বার বার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, তাঁরা সত্যিই তৃণমূলের পতন চাইছেন— এবং শেষ পর্যন্ত তা প্রমাণ করেই ছেড়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল, কংগ্রেস বা সিপিএম থেকে একাধিক নেতা-নেত্রী বিভিন্ন সময় বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেটি খুব প্রকট হয়ে ওঠে। সে নির্বাচনে বিজেপি যে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি, তার একটা কারণ সম্ভবত এটাও যে, তখন মানুষ এই দলবদলকে ভাল চোখে দেখেনি। কিন্তু, একদা তৃণমূলের অন্যতম নেতা এবং ভোট-সংগঠক শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে হারিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তার পরের পাঁচ বছরে, এই নির্বাচনের প্রচারপর্বেও, শুভেন্দুবাবু বারে বারে এই জয়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। যে-হেতু শুভেন্দুবাবু এক সময় তৃণমূলের ভোটব্যবস্থার অংশ ছিলেন, সুতরাং তিনি নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা। এক দিকে বিজেপি বুঝতে পেরেছিল যে, তাদের ভোট ৪০ শতাংশের কাছাকাছি জায়গায় থিতু হয়েছে; অন্য দিকে তারা এটাও অনুধাবন করেছিল যে, তৃণমূলের পেশিবহুল সংগঠনের দৌরাত্ম্যে সেই শতাংশ আর বাড়ানো সম্ভব নয়।

সেখানেই দু’টি পথে তৃণমূলের সংগঠনকে আটকানোর ব্যবস্থা হল। এক, ভোটার তালিকার সংশোধন। প্রচুর ‘অতিরিক্ত’ ভোট তালিকায় থাকলে সেখান থেকে সংগঠনের জোরে শাসক দল তার একটা বড় অংশ নিজেদের ঝুলিতে ঢোকাতে পারে। গড়ে দু’শতাংশ মতো ভোট এ ভাবে ব্যবস্থা করা পশ্চিমবঙ্গে খুব শক্ত নয়। তালিকা সংশোধনে এই অংশটি বাদ পড়ে গেল। যদিও তারই সঙ্গে বাদ পড়ে গেলেন রক্তমাংসের আরও ২৭ লক্ষ মানুষ। একই সঙ্গে যোগ হল নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি। তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে বিপুল দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে মেরুকৃত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভোট এ রাজ্যে প্রস্তুতই ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গবাসী দেখতে পেলেন যে, এ বারের নির্বাচন ভিন্ন প্রকৃতির, যেখানে শাসক দলের হুঙ্কার অনুপস্থিত। মানুষ দলে দলে এগিয়ে এলেন ভোট দিতে।

নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন বিষয়ে বিজেপি, তৃণমূল এবং তৃতীয় পক্ষের দলগুলি অর্থাৎ মূলত বাম-কংগ্রেসের অবস্থানে পার্থক্য ছিল। বিশেষ ভাবে স্মরণীয় যে, তৃতীয় পক্ষ শুরুতে বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর বিরোধিতা করেনি। সেই সংশোধনীতে শুরুতেই কোনও বিতর্ক ছাড়া বাদ চলে যায় প্রায় চৌষট্টি লক্ষ নাম। ভোটার তালিকায় এই বিপুল কাটছাঁটে তৃণমূল কংগ্রেসের যে বড় ক্ষতি হয়েছে, সে কথা স্পষ্ট। অন্য রাজ্যগুলোর মতোই পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার সংশোধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল— তার বেশিটাই সম্পন্ন হলেও, যে ২৭ লক্ষ মানুষ এখনও বিবেচনাধীন, তাঁদের বিষয়টির সমাধান কোন পথে হয় সেটা দেখতে হবে।

আপাতত একটি বিধানসভা কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচন এবং দু’টিতে উপনির্বাচনের দিকে নজর থাকবে। যদিও নির্বাচনে এত নির্ণায়ক ফলাফলের পরে সেই তিন কেন্দ্রের ফল খানিক প্রত্যাশিতই, তবুও কিছু প্রশ্ন থাকবে। যেমন, ফলতায় গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৫৬ শতাংশের বেশি ভোট, বিজেপি ৩৭ শতাংশের কম। বাম-সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থীর ভাগে পড়েছিল সাড়ে তিন শতাংশ। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রের অধীন এই বিধানসভা ক্ষেত্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ৮৯ শতাংশের বেশি ভোট; বিজেপি প্রার্থী অভিজিৎ দাস সাড়ে সাত শতাংশ। ফলতার পুনর্নির্বাচন থেকে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করলেও ইভিএম-এ তাঁর নামে কত ভোট পড়ে, সেটাই দেখার। সরকারি ভাবে প্রার্থী প্রত্যাহার সম্ভব না হলেও, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিপিআইএম-কংগ্রেস জোটবদ্ধ হয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতেই পারত এই বিধানসভা কেন্দ্রে, যদিও সেই উদ্যোগ এখনও চোখে পড়ছে না।

নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে দেওয়া আসনে কি তৃণমূলের কোনও বড় নেতা লড়ে বিধানসভায় আসার চেষ্টা করবেন? না কি, এই আসন থেকেই বিজেপি জিতিয়ে আনতে চাইবে এমন কাউকে, যাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে কোনও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক? অন্য দিকে, হুমায়ুন কবীর তাঁর ছেড়ে দেওয়া রেজিনগর কেন্দ্রে ভোট পেয়েছিলেন ৫১%; বিজেপি পায় ২৭%; তৃণমূল আরও কম— ১৭%। সেখানে উপনির্বাচনের সমীকরণ বেশ কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দেবে। বাম-কংগ্রেসের প্রসঙ্গ এখানেও উঠলে মনে পড়ে যাবে যে, এ বার কংগ্রেস প্রার্থী এখানে দুই শতাংশ ভোটও পাননি।

সামনের একটি পুনর্নির্বাচন এবং দু’টি উপনির্বাচনে মতদাতারা কোন পক্ষকে কতটা এগিয়ে রাখে সেটাই দেখার। আর একটি বিষয়েও ঔৎসুক্য থাকবে— নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর উপনির্বাচনের আগে এসআইআর-এর বিবেচনাধীন তালিকায় থাকা কত জনের বিষয়ে নিষ্পত্তি হয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন