WB Election 2026 Result

পরিবর্তনের রূপরেখা

পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তন? সোমবার ভোটগণনার আগে পর্যন্ত এই প্রশ্ন নিয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সমগ্র দেশে কত জল্পনা-কল্পনা! গতকাল ভোটগণনার পর সেই অনিশ্চয়তার অবসান হল।

অশোক কুমার লাহিড়ী

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৯:০১
Share:

পশ্চিমবঙ্গে সুষ্ঠু ভাবে, হিংসামুক্ত পরিস্থিতিতে বিধানসভা নির্বাচন আয়োজিত হয়েছে। এর কৃতিত্ব নিশ্চিত ভাবে নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্য। এই নির্বাচন ২০০৬ সালের নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০০৫ সালে, বাম আমলে, তৎকালীন সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ করেন। সে বার নির্বাচন পরিচালনায় রাজ্য সরকারের তথাকথিত পক্ষপাতমূলক ভূমিকার কারণে নির্বাচন কমিশন রাজ্য সরকারকে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে পাশ কাটিয়ে নির্বাচনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এমন ঘটনা সেই প্রথম বার ঘটল। তালিকা পরিশোধন অভিযানের সময় নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকরা ভোটার তালিকায় তেরো লক্ষ ভুয়ো নাম শনাক্ত করেন, এবং সেগুলি বাদ দেন। ২০০৬ সালের নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে। কমিশন রাজ্যের বাইরে থেকে পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী চায়, কারণ রাজ্য পুলিশের উপরে পূর্ণ আস্থা ছিল না। নির্বাচনটি প্রায় সম্পূর্ণ হিংসামুক্ত ভাবে হয়েছিল। ভোটাররা কোনও ভয়ভীতি ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছিলেন। ২০২৬-এও তাই হয়েছে।

পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তন? সোমবার ভোটগণনার আগে পর্যন্ত এই প্রশ্ন নিয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সমগ্র দেশে কত জল্পনা-কল্পনা! গতকাল ভোটগণনার পর সেই অনিশ্চয়তার অবসান হল। ২৯ এপ্রিল, দ্বিতীয় দফায় ভোটদানের পর এক্সিট পোল বা বুথ-ফেরত সমীক্ষাগুলিতেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। সমীক্ষাগুলির ফল ছিল কোনও বড় হোটেলের বুফের মতো! বুফেতে ভাত, ডাল, রুটি, তরকারি, মাছ, মাংস, পাঁপড়, চাটনি, দই-মিষ্টি সবই পাবেন। তেমনই, মন দিয়ে দেখলে প্রত্যেকেই কোনও না কোনও সমীক্ষায় নিজস্ব বিশ্বাসের অনুবর্তী ভবিষ্যদ্বাণী পেয়েছেন। কিছু বিচক্ষণ মানুষ সাবধানতার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথাও বলেছিলেন। খুব কম লোকই সম্ভাব্য কালবৈশাখী বা সুনামির কথা বলেছিলেন। এই নির্বাচনে সুনামি হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করতে চলেছে। ফল ঘোষণা হওয়া ২৯৩টি আসনের মধ্যে দুশোরও বেশি আসনে বিজেপি প্রার্থীরা জয়ী। অর্থাৎ, বিজেপি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে ‘সুপার-মেজরিটি’ অর্জন করেছে। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল ২১৫টি আসনে— এ বার তিন অঙ্কের ঘরেও পৌঁছোয়নি তাদের আসনসংখ্যা। এ রাজ্যে যখনই সরকার পাল্টেছে, রাজ্যের মানুষ ক্ষমতাসীন দলকে কার্যত মূল থেকে উৎখাত করেছেন। ১৯৭৭ সালে যখন কংগ্রেসকে হারিয়ে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছিল, তখন বামফ্রন্ট জিতেছিল ২৩১টি আসনে, কংগ্রেস জিতেছিল মাত্র ২০টিতে। ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্টকে হারিয়ে তৃণমূল সরকারে আসে, তখন বামফ্রন্ট জিতেছিল ৪০টি আসনে, আর তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছিল ১৮৪টিতে। ২০২৬-এও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকল। এ বারও শাসনক্ষমতা বদলের সময় এক দলের বিপুল বিজয় হয়েছে, আর বিদায়ী দলের করুণ পরাজয়। রাজনীতিতে আবেগপ্রবণ বাঙালি এক বার কোনও দলের থেকে প্রেম প্রত্যাহার করলে সব সম্পর্কচ্ছেদ করে ছাড়ে! এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

শাসকের প্রতি বাঙালির সম্পূর্ণ মোহভঙ্গ অভিনব না হলেও, এত তাড়াতাড়ি মোহভঙ্গে একটু নতুনত্ব আছে। দেড় দশকব্যাপী শাসন খুব কম সময়ের নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের প্রায় তিন দশকের (১৯৪৭-১৯৭৭), আর তার পর বামেদের প্রায় সাড়ে তিন দশকের (১৯৭৭-২০১১) শাসনের তুলনায় তৃণমূলের শাসনকাল নাতিদীর্ঘ। কোনও দল ক্ষমতায় আসার পর কয়েক বছর জনগণের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমা বা হনিমুন চলে। নতুন সরকার হিসাবে জনগণ তার হাজার অপরাধ মাফ করে দেয়। কিন্তু, তার পর বিচার শুরু হয়ে যায়। এখন টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটের যুগে সংবাদ অনেক তাড়াতাড়ি প্রচার হচ্ছে— কোনও মন্ত্রীর বান্ধবীর বাড়িতে কয়েক কোটি টাকা ও সম্পত্তির হদিস মিললে সে খবর দাবাগ্নির মতো ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জনগণের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারের মধুচন্দ্রিমার সময় ক্রমশ স্বল্প হচ্ছে। অনেক তাড়াতাড়ি বিচার শুরু হয়ে যাচ্ছে।

তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অনেকে বলেন যে, দুর্নীতি আর কোনও ব্যাপার নয়, বাঙালি দুর্নীতিকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিয়েছে। বিবেকানন্দ এবং বিদ্যাসাগরের উত্তরপুরুষ বাঙালির এ রকম চারিত্রিক পরিবর্তন মেনে নেওয়া দুষ্কর। যাই হোক, দুর্নীতির মামলাগুলি এখনও তদন্ত এবং বিচারসাপেক্ষ— কাজেই, সে বিষয়ে কিছু বলা সঙ্গত নয়। তবে তৃণমূলের আমলে যে দুর্নীতি হয়েছে, জনমানসে এ রকম ধারণা স্পষ্টতই সুদৃঢ়।

প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ‘কী পেয়েছি’র হিসাব হচ্ছে— সবুরে মেওয়া ফলবার প্রত্যাশায় বাংলার মানুষ আর দীর্ঘ অপেক্ষায় রাজি নয়। এই নির্বাচনে একটা আশার আলোর প্রতিফলন আছে— বাঙালি শুধু বাঁচতে চায় না, দেশের অন্য প্রগতিশীল রাজ্যগুলির প্রতিযোগী হতে চায়। বাঙালির আকাঙ্ক্ষার অবসান হয়নি। বাঙালি দুর্গতির থেকে খালি সাময়িক ত্রাণ চায় না, দীর্ঘমেয়াদি পরিত্রাণ চায়।

বাঙালির কাছে রাজ্য সরকার শুধু ত্রাণসংস্থা নয়। সরকারের কাজ ‘বন্দ্যোপাধ্যায় চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর মতো খালি দুর্ভিক্ষে ভান্ডারা মারফত কয়েক দিন খেতে দেওয়া, বন্যায় বাড়িঘর ভেসে গেলে ত্রিপল আর চাল ডাল দেওয়া নয়। সরকারের কাছে বেকার ভাতা প্রত্যাশিত নয়— দাবি যে, সরকার চাকরি দেবে, ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করবে; বাৎসরিক বন্যার পর ত্রাণশিবির গঠন করলেই সরকারের দায়িত্ব ফুরিয়ে যায় না— তার কাজ বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। সরকারের প্রকৃত কাজগুলি সাময়িক ত্রাণের থেকে অনেক বেশি সদর্থক ও গুরুত্বপূর্ণ, এবং কঠিনতর। তৃণমূল সরকার ত্রাণের সরকারে পরিণত হয়েছিল, পরিত্রাণের কোনও নামগন্ধই প্রায় তার কর্মসূচিতে ছিল না। সুষ্ঠু ভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো পরিষেবা দেওয়া, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চালানোর সরকারি প্রাথমিক কর্তব্যের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র মনোযোগ ছিল না। তৃণমূল শুধু লক্ষ্মীর ভান্ডার ও যুবসাথীর মতো শ’খানেক অনুদান প্রকল্প তৈরি করে তার মাধ্যমে বাঙালির রাজনৈতিক আনুগত্য জয় করবে বলে ভেবেছিল। সে আশা পূর্ণ হয়নি, এবং তা না-হওয়াটা বাঙালির পক্ষে একটা আশার কারণ। বাঙালির আকাঙ্ক্ষার অবসান হয়নি।

তৃণমূল আমলে উন্নয়ন হয়নি তা নয়— কিন্তু উন্নয়ন হয়েছে অতি শ্লথগতিতে, দেশের অন্যান্য প্রগতিশীল প্রদেশের তুলনায় অনেক ধীরে। মাথাপিছু আয়ের নিরিখে গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু এমনকি ওড়িশা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। আর এর প্রতিফলন ঘটেছে কর্মসংস্থানের সঙ্কটে। রাজ্যের লাখে লাখে মানুষ জীবিকার সন্ধানে ভিন্‌ প্রদেশে ছুটছেন। নির্বাচনের সময় এই পরিযায়ী শ্রমিকের ভিড় উপচে পড়েছিল হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে। উন্নয়নের অভাব এবং সেই কারণে কর্মসংস্থানের সঙ্কটে বাঙালি পর্যুদস্ত হয়েছে।

শিক্ষার বেহাল অবস্থা। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির বহু শিশু বই পড়তে, নিজের নাম লিখতে পারে না, ছোট যোগ-বিয়োগও করতে পারে না। দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ ছেলেমেয়েদের অনেক পয়সা খরচ করে বেসরকারি স্কুলে পাঠাচ্ছেন, প্রাইভেট টিউশনের ব্যবস্থা করছেন। স্বাস্থ্য পরিষেবারও নিদারুণ অবস্থা। অনেক প্রাথমিক চিকিৎসালয় ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে না, যথেষ্টসংখ্যক চিকিৎসক নেই।

শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার পুনর্বাসন নতুন সরকারের কর্তব্য। পরিকাঠামোর উন্নয়ন আর একটি প্রয়োজন। সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণস্বরূপ বিজেপির সঙ্কল্পপত্রে প্রতিশ্রুত গভীর সমুদ্র বন্দর এবং রাজ্যের উত্তর এবং দক্ষিণ প্রান্তের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে সুন্দরবন থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত একটি জাতীয় সড়ক দ্রুত নির্মাণ করা হবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং আইনের শাসন মানুষ আশা করছেন। নতুন সরকারের মনে রাখতে হবে যে, জনগণের সঙ্গে তাদের মধুচন্দ্রিমা ক্ষণস্থায়ী— কাজ না করলে পরিণাম ভাল হয় না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন