Iran-Israel War

চিনের নজরে ইরান যুদ্ধ

অনেকে মনে করেন যে, ইরানে একটা স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধে হয়তো চিনের কিছুটা কৌশলগত সুবিধাই হবে।

প্রণয় শর্মা

শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ ০৪:১৬
Share:

তেহরানকে যদি আমেরিকা আর ইজ়রায়েল আক্রমণ করে, তা হলে সেই যুদ্ধবাজদের শায়েস্তা করতে চিন আর রাশিয়া কি ইরানকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র জোগান দেবে? যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রশ্নে তোলপাড় হয়েছে সমাজমাধ্যম। অন্য কোনও দেশ থেকে গোপনে ইরানে অস্ত্রের জোগান আসছে কি না তা নিশ্চিত করা কঠিন, তবে প্রকাশ্যে তেহরান কোনও সামরিক সহায়তা পায়নি। চিন আর রাশিয়া, দু’দেশই ইরানের উপর আক্রমণ, এবং আয়াতোল্লা আলি হোসেনি খামেনেইকে হত্যার নিন্দা করেছে। বলেছে, আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল ইরানের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করেছে, আন্তর্জাতিক নিয়মবিধিকে নস্যাৎ করেছে। কিন্তু চিন বা রাশিয়া কেউ-ই ইরানকে সামরিক সাহায্য পাঠিয়েছে বলে জানা যায়নি। বাণিজ্যিক স্বার্থেই চিন চায় না যে এই যুদ্ধ আরও ছড়াক, কারণ পশ্চিম এশিয়ায় চিনের প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে ইজ়রায়েলও রয়েছে, যার দু’টি বন্দরের আধুনিকীকরণে যুক্ত আছে চিন। উচ্চপ্রযুক্তির নানা স্টার্ট আপ-এও চিন বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের পেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্প, তেল শোধনাগারে চিনের প্রচুর বিনিয়োগ আছে। এই দেশগুলি থেকে অনেক তেলও দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির স্বার্থে তেল এবং গ্যাসের জোগানে কোনও ব্যাঘাত ঘটতে দিতে চায় না চিন।

অনেকে মনে করেন যে, ইরানে একটা স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধে হয়তো চিনের কিছুটা কৌশলগত সুবিধাই হবে। ইরানের নরমপন্থীরা চাইতেন যে আমেরিকার সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে আর্থিক নিষেধাজ্ঞাগুলি উঠে যাক। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ভাবে আলোচনা থেকে সরে গিয়ে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন, তাতে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ওয়াশিংটন থেকে ইরান যত দূরে সরবে, তত কাছে আসবে চিনের। চিন চায় না যে ইরানে শাসন ব্যবস্থা বদলাক, কারণ তাতে আমেরিকার সুবিধা। বরং ইরান দুর্বল হলে তার চিনের উপর নির্ভরতা বাড়বে, তাতে আরব দেশগুলিতে চিনের বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে।

চিন যদি এই যুদ্ধে রাশ টানতে পারে, তা হলে আসন্ন ট্রাম্প-শি জিনপিং বৈঠকে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, কিংবা তাইওয়ান প্রশ্নে, চিন আরও সুবিধাজনক শর্ত আদায় করতে পারবে। দু’দেশের শীর্ষ নেতার এই বৈঠক চিনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার আগে এমন কিছু চিন করবে না, যাতে বৈঠক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব যদি যুদ্ধের পরেও টিকে থাকেন, তা হলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাতে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার সামরিক ব্যয় বাড়বে, ভারত মহাসাগর-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল থেকে তার নজর অনেকটাই সরবে, বেজিং-এর কাছে যা স্বস্তিকর।

চিন আর ইরান ২০২১ সালে এক দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে— পরবর্তী পঁচিশ বছর সার্বিক সহায়তা এবং কৌশলগত অংশীদারির অঙ্গীকার করে। ইরানের পরিকাঠামো, জ্বালানি, ব্যাঙ্কিং প্রভৃতি ক্ষেত্রে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চিন। এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার দেশগুলিকে স্থলপথ এবং জলপথে সংযুক্ত করার জন্য যে বিশাল প্রকল্প (‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, ২০১৩) নিয়েছে চিন, ইরানকে তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করেছে এই চুক্তি। তবে ইরানে বিনিয়োগের ব্যাপারে চিন খানিকটা রাশ টেনে রেখেছে। এখনও অবধি চিন বিনিয়োগ করেছে প্রধানত জ্বালানির ক্ষেত্রে, স্বল্পমূল্যে ইরানের তেল এবং গ্যাস কেনায়। ইরানের উপর দীর্ঘ দিন আন্তর্জাতিক নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়ে রয়েছে, তাই চিনের এই টাকা ইরানের অর্থনীতির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে ইরান জাহাজে যত তেল রফতানি করেছে, তার ৮০ শতাংশই কিনেছে চিন,তেলের দামে ছাড় আদায় করেছে অনেকখানি। সমুদ্রপথে চিন যত তেল আমদানি করে, তার ১৩.৫ শতাংশ আসে ইরান থেকে। প্রতিদানে ইরানের আন্তর্জাতিক কোণঠাসা অবস্থা কাটাতে অনেকটাই সাহায্য করেছে চিন। ব্রাজ়িল, রাশিয়া, ভারত, চিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ব্রিকস’ জোট এবং ‘শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজ়েশন’ জোটে শামিল করেছে ইরানকে।

তা বলে ইরান আণবিক অস্ত্র তৈরি করুক, তা চায় না চিনও। তাতে পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যাহত হবে। ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত আরও তীব্র হবে, কারণ এই দু’টি দেশেরই কেবল আণবিক অস্ত্র রয়েছে। আণবিক অস্ত্রের জোরে পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের আধিপত্য বৃদ্ধি পাক, চিন তা চায় না। পশ্চিম এশিয়ার অন্য দেশগুলি ইরানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আণবিক অস্ত্র তৈরির দৌড়ে নামতে পারে, যার জেরে চিনের প্রতিবেশী দেশগুলি— দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান প্রভৃতি আণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে ঝুঁকতে পারে। তাতে ভারত মহাসাগর-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় চিনের আধিপত্য প্রশ্নের মুখে পড়বে।

তবে যুদ্ধ যদি বেশি দিন গড়ায়, তা হলে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলি তার নিরসনে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে চিন, রাশিয়া, ব্রাজ়িল প্রভৃতি যে দেশগুলি যুদ্ধের সমালোচনা করে বক্তব্য প্রকাশ করেছে, সেগুলির কোনওটাই এই যুদ্ধে সামরিক ভাবে যোগ দেবে, তার সম্ভাবনা কম। গত কয়েক মাসে ট্রাম্পের নীতি, আচরণের জন্য এই দেশগুলির সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কোনও দেশ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে চায় না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সব সময়েই সর্বাধিক গুরুত্ব পায় জাতীয় স্বার্থ। ইরান-যুদ্ধ সম্ভবত সেটাই আরও এক বার প্রমাণ করবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন