রামপুরহাটের কাছে একটি জায়গার নাম ভদ্রপুর। লোকমুখে সেটাই ভাদুর। এই ভাদুরের নন্দকুমার মুর্শিদাবাদের নবাবি সেরেস্তায় বড় চাকরি পেলেন। কালে-দিনে উন্নতি করে খেতাব পেয়ে হলেন মহারাজ নন্দকুমার। নতুন বড়মানুষ হয়ে বাড়ির দুর্গাপুজোর সময় সব জিনিস স্থানীয় উৎপাদকদের থেকে না কিনে মুর্শিদাবাদ থেকে নিয়ে এলেন তিনি। তার মধ্যে ছিল স্থানীয় তাঁতিদের তৈরি কাপড়ের পরিবর্তে মুর্শিদাবাদের বালুচরি। অন্যরা চুপ করে থাকলেও, ভাদুরের তন্তুবায়রা সোজা নন্দকুমারের কাছে তাঁদের কাপড়ও কেনার আর্জি জানালেন। কিন্তু নন্দকুমার সে কথা কানে তুললেন না।
এ বার তন্তুবায়রা নন্দকুমারের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের পথ নিলেন। সমগ্র রাঢ়ের তাঁতিরা ঠিক করলেন যে, তাঁকে আর কাপড় বেচবেন না। ক্রমে ধোপা, নাপিত, মুটে— সকলেই এই ধর্মঘটে শামিল হলেন। সামাজিক অবরোধের মুখে শেষে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলেন নন্দকুমার। সকলকে পঙ্ক্তিভোজন করিয়ে, নিজেই প্রায়শ্চিত্ত করে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে এলেন তিনি। অবশ্য সেই পঙ্ক্তিভোজনেও ভেদবুদ্ধি প্রযুক্ত হল, আর তার থেকেই জন্ম নিল একটি আঞ্চলিক প্রবাদ— ‘ভাদুরের নন্দকুমার/ লক্ষ বামুন করলে শুমার/ কেউ পেলে মাছের মুড়ো/ কেউ খেলে বন্দুকের কুড়ো’।
এই ধরনের অবরোধের মুখে পড়েছিলেন সে কালের চন্দননগরের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীও। কিন্তু জাতপাত ও ছোঁয়াছুঁয়ির সমস্যা ছাড়াও সমস্যা পাকিয়ে তোলার পিছনে বড় ভূমিকা ছিল সে কালের উঁচু জাতের প্রতিনিধি যাঁরা, সমাজের সেই মাথা আর মাতব্বরদের।
অন্য দিকে, নন্দকুমারের বিরুদ্ধে অবরোধ করেন কিন্তু তাঁর প্রজাদেরই একটি অংশ, এবং সেই বিরোধের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক। আন্দোলনের নেতৃত্বও এসেছিল তন্তুবায় সমাজের মধ্য থেকেই। সেই অর্থে সমাজপতি বা বাইরের কোনও খুঁটি ধরার প্রয়োজন হয়নি সে দিনের প্রতিবাদী জনতার। আরও লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য বৃত্তিজীবী মানুষও কিন্তু তন্তুবায়দের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতিরোধকে সামগ্রিক ও সম্পূর্ণ রূপ দিয়েছিলেন। না হলে হয়তো প্রবল পরাক্রান্ত নন্দকুমার সহজে হার মানতেন না। হয়তো ওই মানুষেরা বুঝেছিলেন যে, আজ তন্তুবায়দের রুজি-রুটি যে ভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ছে, কাল সেই একই সমস্যা তাঁদেরও হতে পারে। সুতরাং সকলে মিলে জোট বাঁধার প্রয়োজনীয়তা তাঁদের প্রবলপ্রতাপ নন্দকুমারের চোখে চোখ রেখে দর কষাকষি করতে সাহস জুগিয়েছিল।
এখানে আরও একটা বিষয় খেয়াল করার মতো। অষ্টাদশ শতকের এই সময়ে বিদেশে রফতানি করার পণ্য হিসাবে বাংলার কাপড়ের একেবারে আলাদা রকম এক চাহিদা ছিল। সেই কাপড় তৈরি করার কারিগর হিসাবে তন্তুবায়দেরও আলাদা সামাজিক প্রতিপত্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এই বৃত্তিজীবীদের তৈরি করা বাংলার বেশ কিছু বড় মন্দির সেই সামর্থ্যেরই সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু এই ‘প্রভাব’ই এটাও দেখিয়ে দেয় যে, কেবল জাতিগত উৎস নয়, বৃত্তিগত উৎস থেকেও ‘প্রজা’রা শাসনব্যবস্থার অন্যায় অবিচার অসঙ্গতির প্রতিরোধ করার সাহস দেখিয়েছিলেন।
শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রজাদের নিজস্ব দাবিদাওয়ার পক্ষে আওয়াজ তোলার এমন ঐতিহাসিক উদাহরণের অভাব নেই। কখনও সেই প্রতিবাদ সফল হয়েছে, আবার কখনও বা শাসক অগ্রাহ্য করেছে প্রজার স্বর। কিন্তু রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে শাসনপ্রক্রিয়ায় শাসকের সঙ্গে শাসিতের আদানপ্রদান কখনও থামেনি। তবে শাসকের কোনও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রজার অসন্তোষ থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার ঘটনাও ইতিহাসে বিরল নয়। যেমন, ১৬৮৮ সালে ঔরঙ্গজেবের কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে জাঠদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খলার রূপ নেয়। রাজারাম জাঠের নেতৃত্বে এক বিশাল ও উত্তেজিত জনতা সম্রাট আকবরের সমাধিস্থলের উপর চড়াও হয়েছিল। তারা সমাধির ভিতর থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার পর, কবর থেকে আকবরের দেহাবশেষ বার করে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেয়, এমন ঘটনাও জানা যায়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির মিলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত সেই স্মৃতিসৌধটি এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এই চরম অরাজকতায় মানুষের সম্মিলিত ক্ষোভ সব রকমের শ্রদ্ধা ও নিয়মনীতিকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল।
এই ধরনের ‘মবোক্রেসি’ থেকে সমাজকে রক্ষা করে সার্থক ‘প্রজাতন্ত্র’— যেখানে সংবিধান দেশ শাসনের ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রজাতন্ত্র এবং সাধারণ গণতন্ত্র— এই দু’টি ব্যবস্থা ক্ষমতার ব্যবহার এবং মানুষের ইচ্ছাকে সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে দেখে। সাধারণ বা সরাসরি গণতন্ত্রে কেবল সংখ্যাগুরুদের মতামতের উপর ভিত্তি করে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে অনেক সময় তা উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন বা ‘মবোক্রেসি’তে পরিণত হতে পারে। অন্য দিকে, প্রজাতন্ত্রে সংবিধান একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই সাংবিধানিক কাঠামোর মূল লক্ষ্য হল এটা নিশ্চিত করা যে, কোনও ব্যক্তি কিংবা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অধিকার যেন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের সাময়িক আবেগ বা সিদ্ধান্তের মুখাপেক্ষী না-হয়।
সংবিধান এই সুরক্ষা নিশ্চিত করে ক্ষমতার সুষম বণ্টনের মাধ্যমে। অর্থাৎ, শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগকে আলাদা রাখে যাতে কোনও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা তাদের পিছনের উত্তেজিত জনতা সব ক্ষমতা দখল করতে না পারে। সংবিধান নাগরিকদের এমন কিছু মৌলিক অধিকার দেয়, যা কোনও ভোটের মাধ্যমেই বাতিল করা সম্ভব নয়। এবং সব শেষে, আইনের শাসন নিশ্চিত করে যে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থির বিচার-বুদ্ধির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র মূলত জনতার আবেগকে একটি সুশৃঙ্খল আইনি প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করে। ফলে সমাজ কোনও হুজুগের বশবর্তী না হয়ে স্থায়ী এবং ন্যায়সঙ্গত আইনি নীতির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
আজ পদে পদে যখন সংখ্যার বিচারে গরিষ্ঠতা তার পেশিশক্তি প্রদর্শন করছে, তখন আমাদের সংবিধানের রক্ষাকবচগুলো সম্পর্কে নিজেদের সচেতন হওয়া এবং অন্যদের সচেতন করার কাজটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। গরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছা মানেই যে সেটি সর্বদা ন্যায়সঙ্গত হবে, তেমনটা সব সময় না-ও হতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সাময়িক আবেগ কোনও ধরনের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা ছাড়া সমাজ পরিচালনা করতে শুরু করলে তা ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে পারে। শুধু সুদূর অতীত নয়, বর্তমান সময়েও আমরা তেমন উদাহরণ দেখেছি বিস্তর।
এই অবস্থা প্রতিরোধ করে সংবিধান একটি বিবেকবান ও ন্যায়সঙ্গত বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। প্রকৃতপক্ষে, একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র জনমানসের উত্তাল আবেগকে একটি বিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করে। তার ফলে সমাজ কোনও রকম হুজুগের বশবর্তী না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং ন্যায়সঙ্গত নীতির দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা পায় এবং পরিচালিত হয়।
ভারতীয় সংবিধান আমাদের এই মূল্যবান পাঠ দেয় যে, জনমতের চাপে পড়ে তড়িঘড়ি কোনও ব্যবস্থার বদল অথবা বিচারের দাবি সব সময় সঠিক হয় না। বরং সংবিধানের সমস্ত শর্ত মেনে আইনের শাসন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করাই একটি সার্থক গণতন্ত্রের পরিচয়। ভারতীয় সংবিধান কেবল সংখ্যাগুরুর স্বার্থ রক্ষা করে না, বরং এই রক্ষাকবচ নিশ্চিত করে যে— কোনও জাতিগত, ভাষাগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠী যেন কেবল গরিষ্ঠের চাপে নিজেদের স্বকীয়তা ও সত্তা হারিয়ে না ফেলে। সংবিধানের বিভিন্ন বিধান সংখ্যালঘুদের নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং স্বাধীন ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিশেষ অধিকারও প্রদান করে।
এই সুরক্ষা সংখ্যাগুরুবাদের সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিহত করে এবং প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক মর্যাদা রক্ষা করে। স্বাধীনতা-উত্তর কালে এ ভাবেই সংবিধান ভারতকে একটি বৈচিত্রময় ও সহনশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার পাঠ দিয়েছে, যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকারই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আজ চারিদিকে ক্ষমতাধরদের আস্ফালনের আবহেও এই কথাটি নিজেরা বার বার মনে করার, এবং তর্জনের মুখেও মনে করিয়ে দেওয়ার কোনও বিকল্প নেই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে