পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা মানেই যেন স্মৃতিমেদুর এক বৈপরীত্যের কাহিনি— একদা দেশের সর্বাগ্রগণ্য অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে ক্রমে পিছিয়ে পড়া এক জনপদ। সত্যিই কতটা পিছিয়ে পড়ল এ রাজ্য? কেন?
১৯৬০ থেকে ২০২৪ এই দীর্ঘ সময়ের রাজ্যভিত্তিক মাথাপিছু আয়ের তুলনাযোগ্য যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই সমগ্র সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু নিট রাজ্য আয়ের (নেট স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা এনএসডিপি) বৃদ্ধির হারের সঙ্গে দেশের গড় বৃদ্ধির হারের খুব একটা ফারাক ছিল না। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গ স্থবির ছিল না। যদি রাজ্যটির অর্থনীতি দীর্ঘ কাল ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকত, তা হলে পতনের কারণ সহজবোধ্য হত।
তা হলে পিছিয়ে পড়া নিয়ে এই যে সর্বজনীন ধারণা, তার একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল যে, এটা আপেক্ষিক অর্থে। ভারত আজ কয়েক দশক আগের তুলনায় সার্বিক ভাবে অনেক সচ্ছল, কিন্তু সেই সচ্ছলতা সব রাজ্যে (এবং সব মানুষের মধ্যে) সমান হারে বাড়েনি। রাজ্যে আদৌ অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হয়েছে কি না, বা বৃদ্ধির হার সারা দেশের গড়ের কাছাকাছি ছিল কি না, তা নয়— আসল প্রশ্ন হল, অর্থনৈতিক ভাবে অগ্রসর এবং পশ্চাৎপদ রাজ্যগুলির তুলনায় রাজ্যের বৃদ্ধির হার কতটা, এবং সেই বৃদ্ধির ক্ষেত্রভিত্তিক (অর্থাৎ, কৃষি, শিল্প, পরিষেবা) গঠন কী রকম। না-হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের বৃদ্ধির হার গড় জাতীয় হারের কাছাকাছি থেকেও এই পিছিয়ে পড়া ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও তনিকা চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার সাম্প্রতিক গবেষণার ভিত্তিতে এ বিষয়ে কিছু কথা বলছি।
পশ্চিমবঙ্গের ‘পতন’-এর ধারণার একটি বড় উৎস হল রাজ্যগুলির মাথাপিছু আয়ের র্যাঙ্কিং বা ক্রমবিন্যাস। র্যাঙ্কিং সূচকটি মূলত আপেক্ষিক— ফলাফলের অবিচ্ছিন্ন পরিমাপ নয়। হিসাবের সামান্য এ দিক-ও দিক হলেই এক রাজ্য আর এক রাজ্যের আগে বা পরে চলে যেতে পারে, যা বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার ফারাকের প্রতিফলন নাও হতে পারে। তার উপরে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ঠিক মতো হিসাব করা হচ্ছে কি না, বা অনুমিত জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের সামান্য তফাত হচ্ছে কি না (২০১১ সালের পরে জনশুমারি হয়নি, আর তাই তার পরের পর্যায়ে রাজ্যগুলির জনসংখ্যা অনুমানভিত্তিক) এগুলোরও প্রভাব আছে।
পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয়কে ভারতের অন্য রাজ্যগুলির গড় মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে তুলনা করে এবং সেই অনুপাত সময়ের সঙ্গে কী ভাবে বদলেছে, দেখলে ছবিটা অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের গোড়া থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরু পর্যন্ত, ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় ধারাবাহিক ভাবে কমেছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০৫ অবধি প্রায় এক দশক জুড়ে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় ভারতের অন্যান্য অংশের গড়ের তুলনায় বেড়েছে, এবং একটি স্বল্প সময় ধরে— বিশেষ করে দু’হাজারের দশকের গোড়ায়— পশ্চিমবঙ্গ কিছু বছর ভারতের গড়কে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ২০০৫-এর পর থেকে আজ পর্যন্ত তার আপেক্ষিক অবস্থানে আবার ক্রমাবনতির প্রবণতা লক্ষণীয়। তবে, টাকার অঙ্কের হিসাবেই হোক বা প্রকৃত মূল্যের হিসাবে, এই পুরো সময় জুড়ে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভারতের বাকি অংশের গড়ের ব্যবধান খুব বড় ছিল না। রাজ্যটি গড়ের উপরে থাকুক বা নীচে— ফারাকটি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এর মানে হল, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের ‘গড়’ অর্থনীতি থেকে খুব বেশি বিচ্যুত হয়নি।
কিন্তু এই গড়ের আড়ালেই লুকিয়ে আছে আসল সমস্যা। ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য গত কয়েক দশকে নাটকীয় ভাবে বেড়েছে। কিছু রাজ্য দ্রুত এগিয়ে গেছে, কিছু রাজ্য পিছিয়েই থেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান বোঝার জন্য আরও ধারালো তুলনা দরকার। এই বৈষম্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন পশ্চিমবঙ্গকে উদারীকরণ-পরবর্তী জমানায় সবচেয়ে উন্নয়নশীল রাজ্যগুলির সঙ্গে তুলনা করা হয়— যেমন গুজরাত, মহারাষ্ট্র বা হরিয়ানা। ষাটের দশক থেকেই এই রাজ্যগুলির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ব্যবধান ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা ত্বরান্বিত হয় নব্বইয়ের দশকের গোড়া থেকে। ২০০৫-এর পর থেকে এই ফারাক আরও তীব্র হয়। বর্তমানে এই রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অন্য দিকে, যদি পশ্চিমবঙ্গকে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলির সঙ্গে তুলনা করা হয়— বিহার, উত্তরপ্রদেশ বা মধ্যপ্রদেশ— তা হলে উল্টো ছবি দেখা যায়। নব্বইয়ের দশকের পর এই রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ অনেক দ্রুত বেড়েছে।
তাই, পশ্চিমবঙ্গ দেশের তলানিতে নেই, কিন্তু শীর্ষেও নেই। মাঝামাঝি কোথাও দীর্ঘ দিন ধরে আটকে— এটাই রাজ্যের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঠিক বর্ণনা। মূল কথাটি হল, নব্বইয়ের দশকের গোড়া থেকে দু’হাজারের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কিছু অল্প সময়ের ব্যতিক্রম ছাড়া, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের বাকি অংশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের আপেক্ষিক অবস্থান দুর্বল হতে থেকেছে।
উদারীকরণের পর সবচেয়ে উন্নয়নশীল রাজ্যগুলিকে পাশাপাশি রাখলে এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দু’হাজারের দশকের মাঝামাঝি থেকে সেই ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থেকেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই প্রবণতা বেড়েছে, কমেনি। তবু সামগ্রিক ভাবে ভারতের সঙ্গে তুলনায় পশ্চিমবঙ্গকে অতটা খারাপ দেখায় না, কারণ দেশের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ রাজ্যগুলি একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের থেকে আরও পিছিয়ে পড়েছে— ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গ নিজে সবচেয়ে উন্নয়নশীল রাজ্যগুলির তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে।
এর গভীরে গিয়ে দেখতে গেলে কৃষি, শিল্প, ও পরিষেবা ক্ষেত্রে বৃদ্ধির ধরন বুঝতে হবে। কৃষিতে পশ্চিমবঙ্গ এক সময় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। আশির দশক থেকে ২০০০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত রাজ্যের কৃষিতে মাথাপিছু উৎপাদন জাতীয় গড়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছিল। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নানা সংস্কার, সেচের বিস্তার, নতুন প্রযুক্তির প্রসারের ফলে কৃষি হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজ্যের একটি শক্ত ভিত। কিন্তু একই সময়ে ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতি কৃষিনির্ভরতা কমিয়ে শিল্প ও পরিষেবার দিকে এগোচ্ছে, যা উন্নয়নের প্রচলিত সোপান। ফলে কৃষিতে আপেক্ষিক সাফল্য থাকলেও, সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থান বেশি বদলায়নি। তার উপরে ২০১১-র পর কৃষিতেও পশ্চিমবঙ্গ আবার জাতীয় গড়ের নীচে চলে যায়।
আসল সমস্যা শিল্পখাতে। সত্তরের দশকের শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের শিল্প উৎপাদন মাথাপিছু হিসাবে জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু আশির দশক থেকে অন্য রাজ্যগুলি দ্রুত শিল্পায়নের পথে এগিয়ে যায়। নব্বইয়ের দশকের পর উদারীকরণ সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে। পশ্চিমবঙ্গ এই দৌড়ে আর ফিরতে পারেনি। এক সময়ের শিল্পভিত্তি ভেঙে পড়ে, নতুন শিল্প বিনিয়োগ আসে না, শহুরে কর্মসংস্থান ধীর হয়ে পড়ে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু শিল্পোৎপাদন সেরা রাজ্যগুলির গড়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মতো।
পরিষেবাক্ষেত্র অনেকের কাছে সম্ভাব্য বিকল্প ছিল। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি, ফাইনান্স বা আধুনিক ব্যবসায়িক পরিষেবার মতো উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে পশ্চিমবঙ্গ কখনও বড় ভূমিকা নিতে পারেনি। বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদের মতো শহর যেখানে নতুন ভারতের পরিষেবা অর্থনীতির মুখ হয়ে উঠেছে, কলকাতা সেখানে পিছিয়েই থেকেছে। ফলে পরিষেবা খাত শিল্পের দুর্বলতা পূরণ করতে পারেনি।
মোট কথা, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি, কিন্তু দেশের দ্রুত বেড়ে ওঠা রাজ্যগুলির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এই ব্যর্থতা কোনও একটি সরকারের বা একটি নির্দিষ্ট নীতির ফল নয়। বিভিন্ন সময়ে রাজ্যে ও কেন্দ্রে ভিন্ন সরকার থাকলেও সামগ্রিক প্রবণতা খুব বদলায়নি। তবু গত দেড় দশকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার আমলেও শিল্প বিনিয়োগ, শহুরে কর্মসংস্থান ও বেসরকারি উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি— এই দায় এড়ানো যায় না।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে