বার্তা:ভূমি দফতরের সামনে জনজাতিভুক্ত কুর্মি সমাজের ধর্না, ২১ এপ্রিল, ২০২৫।
১৯৭৯-৮০ সালে মণ্ডল কমিশনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নানা অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন সংগঠন একযোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছিল। তারা বলেছিল, বাংলার উচ্চবর্ণের সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের কারণে এখানকার হিন্দু অনগ্রসর শ্রেণিগুলি তাদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও ‘নীরব সংখ্যাগুরু’ জনসমষ্টিতে পরিণত হয়েছে।
তৎকালীন রাজ্য সরকার এই বক্তব্য স্বীকার করেনি। তবে মণ্ডল কমিশনের ঘোষণার পর জ্যোতি বসুর বাংলায় ‘ওবিসি’ না থাকার চিরাচরিত অবস্থান থেকে বাম ফ্রন্ট সরেছিল ২০১০ সালে; মূলত বিধানসভা ভোটের প্রাক্-মুহূর্তে গ্রামবাংলার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আটকাতে। তৎকালীন অনগ্রসর সম্প্রদায় কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী যোগেশ বর্মণ জাতিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের তথা সংরক্ষণের হার বৃদ্ধির কথা বলেছিলেন। আবার একই সময়ে ওবিসি মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা ১০ শতাংশ সংরক্ষণের কথাও ঘোষিত হয়েছিল।
তবুও, বাম সরকারের ঘোরতর দুর্দিনেও মাহিষ্য, সদ্গোপ-সহ বৃহত্তর কৃষিভিত্তিক অনগ্রসর অংশকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা নেতারা ভাবেননি। এই ‘না-ভাবা’র কিছু নীতিগত দিক ছিল: যে ভূমিসংস্কারের উপর ভিত্তি করে বাম ফ্রন্ট সরকার, ভূমিহীন অন্ত্যজ শ্রেণি ও মুসলমান সমাজের সমর্থন পেয়েছিল, তার বিপরীতে ছিল এই সকল মধ্যমবর্গীয় কৃষক সমাজ। তাঁদের সঙ্গে দূরত্ব না রাখলে দলীয় সমর্থনের ভিত্তি টলে যেতে পারত। এই বিশেষ কিছু ‘তত্ত্বাবধায়ক’ কৃষিভিত্তিক জাতির প্রাধান্য ছিল তৎকালীন বাংলা কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে, ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এই সকল জাতিগোষ্ঠীর গ্রামসমাজে ক্ষমতাশালী হওয়া বা সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে সরকার ও আমলাতন্ত্রের নীতিনির্ধারক পরিসরগুলিতে উঠে আসা বাম ফ্রন্টের ‘পার্টি সোসাইটি’ গঠনের পথে অন্তরায় হত। তাই ১৯৯০-এর দশকে ভক্তিপ্রসাদ মণ্ডলের মতো জেলার বাম নেতৃত্ব মণ্ডল কমিশন বিতর্কের কারণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে দলত্যাগ করলেও, বামপন্থী নেতৃত্ব নীতি বদলাননি। তাঁরা ভেবেছিলেন, ভূমিহীন খেতমজুর ও তাঁদের নিয়োগকর্তা মধ্যচাষির সম্পর্কটা বৈর হতে বাধ্য। কিন্তু, বাস্তবে তা ঘটেনি। শ্রমসম্পর্কের নানা জটিলতার কারণে মধ্য বাংলার খেতমজুর (‘নিচু জাত’ও বটে) ও মধ্যচাষির মধ্যে এমন একটা পরস্পর নির্ভরতা গড়ে ওঠে যাতে স্বাভাবিক ভাবেই তুলনায় উচ্চস্তরে থাকা মধ্যচাষি (হিন্দু মধ্য জাতি) নেতৃত্বের অবস্থান পেয়ে যায়।
এ বারে, ভূমিসংস্কারের সঙ্গে, অনগ্রসর জাতি সংরক্ষণের বিষয়টিকে মান্যতা দিলে এই সকল সম্প্রদায় থেকে বেতনগ্রাহী মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, যা না হওয়ায় নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে থাকা একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী ঘোর বামবিরোধী হিসেবে রয়ে যায়। আসলে উচ্চবর্ণ অধ্যুষিত বামপন্থী রাজনৈতিক দলের জাতিগত চরিত্রই তাদের বেতনগ্রাহী আর্থ-সামাজিক পরিসরটির উপর থেকে নিজেদের আধিপত্য খর্ব করতে চায়নি। যে ক’টি সামান্য গ্রামভিত্তিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তাতে দক্ষিণপন্থী এই কৃষিভিত্তিক জাতিসমূহ, বাম ফ্রন্টের মধ্য দিনে বাম শিবিরে এলেও এদের সমর্থনের পাল্লা মূলত কংগ্রেস বা এমনকি বিজেপির দিকেই গিয়েছে।
২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠনের সময়, এই সকল জাতিগোষ্ঠী দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ভোটক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব বজায় রেখেছিল। যদিও এই ক্ষমতায়ন সীমাবদ্ধ ছিল গ্রামসমাজের নির্বাচনী পরিসরেই; মূলত জেলা ও পঞ্চায়েত স্তরে। তবে এই ঘটনার সমান্তরালেই ঘটছিল আর একটি পরিবর্তন; ২০০৬-এর সাচার কমিটির রিপোর্ট বেরোনোর পরে মুসলমান ভোট ক্রমে বাম ফ্রন্টের দিক থেকে সরে গিয়েছিল তৃণমূলে। মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো কংগ্রেসের নির্বাচনী দুর্গ থেকেও মুসলমান ভোট তৃণমূলের দিকে সরে যায়।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি উত্থানের অন্যতম কারণ হল গ্রামসমাজের পরিসরে এই দুই উদীয়মান অংশের লড়াই, যা প্রথমে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও পরে দুই প্রধান শাসক ও বিরোধী দলের বিভাজনরেখায় বদলে যায়। গত দশ বছরের প্রায় সকল নির্বাচনে সম্প্রদায়গত ভোটের বিচারে হিন্দু অনগ্রসর ও তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্তদের ‘হিন্দুত্ব’-এর দিকে যেমন ঢলতে দেখা গেছে, তেমনই মুসলমান ভোটের গতিমুখ বজায় রয়েছে তৃণমূলের দিকে। ভারতীয় জনতা পার্টির মূল লক্ষ্য যে বাংলার হিন্দু অনগ্রসর ও তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্তদের ভোট, তা গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার প্রমাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে যখন স্বপন দাশগুপ্তকে বলতে শোনা যায় যে জাতিগত ভাবে ভারতীয় জনতা পার্টি একটি ‘ওবিসি পার্টি হয়ে গেছে’, তখন ভোটের অঙ্কে এঁদের গুরুত্ব ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে কতখানি তা বলা বাহুল্য। ২০১১-র জনসংখ্যার বিচারে তৎকালীন ঘোষিত হিন্দু অনগ্রসর শ্রেণির সংখ্যা ১০ শতাংশের উপর। কিন্তু এই ঘোষিত হিন্দু অনগ্রসর শ্রেণির বাইরে থাকা বৃহত্তর অংশ, অর্থাৎ মাহিষ্য, সদ্গোপ-সহ বৃহত্তর কৃষিভিত্তিক অনগ্রসর জনসংখ্যা যথাক্রমে আনুমানিক দেড় কোটি ও পঞ্চাশ লক্ষ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৯৫ সালের বিধানসভার অধিবেশনে মণ্ডল কমিশন নিয়ে তীব্র বাদানুবাদ চলার সময় তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব মানস ভুঁইয়া বলেন, মাহিষ্যরা একাই মোট বাংলার ওবিসি জনসংখ্যার ৫৫% এবং কুর্মি, মাহাতো, সদ্গোপ এবং মাহিষ্য মিলে মোট ওবিসি জনসংখ্যার ৭১%। এদের অন্তর্ভুক্ত না করে এবং কমিশনের দোহাই দিয়ে বাম ফ্রন্ট সরকার বৃহত্তর ওবিসি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। অর্থাৎ দক্ষিণপন্থী নেতৃত্ব এই সংখ্যার হিসাবটি সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই ওয়াকিবহাল।
দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের দুই মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান-সহ জেলাগুলির প্রায় সত্তরটি বিধানসভা আসনে এই বৃহত্তর কৃষিভিত্তিক অনগ্রসর অংশ ভাল প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব আবার শুধুমাত্র সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং দীর্ঘদিনের গ্রামসমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র তার কৃষিভিত্তিক সম্পর্কগুলির কারণে, এই মধ্য জাতিগুলি অন্যান্য সম্পর্কিত গোষ্ঠী যেমন বাগদি ও বাউরি-সহ তফসিলি জাতিগোষ্ঠীগুলির ভোটের উপরেও প্রভাব ফেলে। কৃষিভূমির শ্রমসম্পর্কের সঙ্গে গড়ে ওঠা এই পারস্পরিক নৈকট্য যে ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলে তা আগেও বহু বার প্রমাণিত হয়েছে। সমাজচরিত্রের বদলের সঙ্গে সঙ্গে, বা বলা ভাল ‘ভদ্রলোক রাজনীতি’র পতনের সঙ্গে সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ‘নীরব সংখ্যাগুরু’ তার হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতার অনেকখানি ফেরত পেয়েছে। কৃষিজাত উদ্বৃত্তকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা গ্রামসমাজের নতুন অর্থনৈতিক পরিসরে এই পুরনো শ্রমসম্পর্ক আবার সুদৃঢ় হয়েছে। অন্য দিকে, গত দশ বছরে এই সব জেলায় ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থান প্রমাণ করে যে আসলে এই সকল জাতিগোষ্ঠীগুলির মধ্যে সাংগঠনিক বিস্তারের ভিতর দিয়ে এই পূর্বতন গ্রামসমাজের সম্পর্কের নেটওয়ার্কটিকে কাজে লাগাতে বিজেপি অনেকখানি সক্ষম হয়েছে। গ্রামসমাজে বাড়তে থাকা সাম্প্রদায়িকতার বাতাবরণের কারণ এখান থেকেই কিছুটা বোঝা যায়। তবে এই অবিচ্ছেদ্য বিস্তারের পথে বাধা তৈরি হয়েছে সম্প্রতি।
সাম্প্রতিক বিশেষ নিবিড় সংশোধনের অছিলায় তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটে কোপ বসাতে যেমন উঠেপড়ে লেগেছে ভারতীয় জনতা পার্টির ভোটিং মেশিনারি, তেমনই রাজ্য সরকারের তরফেও এত দিন ধরে অস্বীকৃত হিন্দু অনগ্রসর শ্রেণির উন্নয়নকল্পে বেশ কিছু পদক্ষেপ করা হয়েছে, এই জনগোষ্ঠীগুলিকে কাছে টানার প্রয়োজনেই। সাম্প্রতিক কালে সদ্গোপ সম্প্রদায়কে দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর অনগ্রসর শ্রেণির স্বীকৃতি প্রদান এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে অন্যান্য অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সদ্গোপ উন্নয়ন পর্ষদ গঠনও নির্বাচনী প্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে করা অন্যতম সময়োচিত সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তগুলির রূপায়ণ তথা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের ফলাফল কী হবে তা ভবিষ্যৎ বলবে, কিন্তু এই পদক্ষেপ যে সম্প্রদায়ের জনমতের উপর প্রভাব ফেলবে তা অনেকটাই পরিষ্কার।
আসলে দাবিদাওয়ার থেকেও, এই সমাজের কাছে এই স্বীকৃতির গুরুত্ব অনেকখানি সামাজিক মান্যতার। জেলাস্তরের একদা বিজেপির প্রথম সারির নেতৃত্বে থাকা এই জাতিগোষ্ঠীর অনেকেই যে ভাবে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন, তথা জেলা ও ব্লক স্তরে প্রচারে প্রত্যক্ষ সমর্থন জানাচ্ছেন, তাতে এটি মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, দীর্ঘদিনের ‘নীরব সংখ্যাগুরু’ জনসংখ্যার অন্তত একটি বড় অংশের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস তার গ্রহণযোগ্যতার কিছুটা ফেরত পেয়েছে। তবে শেষ বিচারে কী হবে না হবে তার অনেক কিছুই নির্ভর করবে এই জাতি ও শ্রেণিগোষ্ঠীগুলি নিজেদের কোন অবস্থান বেছে নেয় তার উপরে।
রাজ্য সম্পাদক, পশ্চিমবঙ্গ সদ্গোপ সমাজ
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে