Indian Education System

কৃত্রিমমেধা ও মুচিরাম গুড়

সমস্যা কি শ্রমের জোগানে, না চাহিদায়? জোগানের দিক থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম অত্যন্ত তাত্ত্বিক, সেখানে ছাত্রছাত্রীরা বাজার-উপযোগী দক্ষতা শিখছেন না। ফলে শ্রমের বাজারে নিজেদের ঠিক ভাবে তুলে ধরতেও পারছেন না।

পরন্তপ বসু

শেষ আপডেট: ১২ মে ২০২৬ ০৫:০২
Share:

বঙ্কিমচন্দ্রের মুচিরাম গুড় কালেক্টরির চাকরির জন্য কপাল ঠুকে দরখাস্ত পাঠিয়েছিলেন। বহু পণ্ডিত বাঙালিকে টপকে শেষ অবধি চাকরিটি পান মুচিরামই, কারণ এজলাসে প্রজাদের থেকে দরখাস্ত নেওয়া বা খাজনা আদায়ের কাজের জন্য পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন ছিল না। বর্তমান ভারতের শ্রম বাজারের দিকে তাকালে মুচিরাম গুড়ের সেই গল্পটির তাৎপর্য বোঝা সম্ভব। ২০২৪-২৫ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, মাত্র ৮.২৫% ক্ষেত্রে গ্র্যাজুয়েটদের ডিগ্রি এবং তাঁদের কাজের মধ্যে সাযুজ্য রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা হয় কাজের তুলনায় অতিশিক্ষিত, নয়তো চাকরি পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখা বিদ্যার বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ নেই।

সমস্যা কি শ্রমের জোগানে, না চাহিদায়? জোগানের দিক থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম অত্যন্ত তাত্ত্বিক, সেখানে ছাত্রছাত্রীরা বাজার-উপযোগী দক্ষতা শিখছেন না। ফলে শ্রমের বাজারে নিজেদের ঠিক ভাবে তুলে ধরতেও পারছেন না। সেই যুক্তি থেকে পাঠ্যক্রম বদলের দাবি উঠছে। দাবিটি যে ভুল, তা নয়— তবে, এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় সমস্যা আছে। এক বার সিলেবাস পুরোপুরি বাজারমুখী হতে শুরু করলে সেই প্রবাহ থামানো কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু বাজারের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানো নয়; চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং বৌদ্ধিক পরিসর তৈরি করাও তার দায়িত্ব।

মুচিরাম গুড়ের নিয়োগকর্তা বুঝেছিলেন, কালেক্টরির কাজে চৌখস ইংরেজি নয়, অন্য ধরনের দক্ষতা দরকার। অর্থাৎ শ্রমের বাজারে চাহিদা কোথা থেকে আসছে, নিয়োগকর্তার সেই ভূমিকাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এক জন বিচক্ষণ নিয়োগকর্তা বোঝেন, কোনও কর্মপ্রার্থীর প্রতিভা কোন কাজে লাগানো সম্ভব। দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক কোনও ছাত্রের যদি নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, তবে তাঁকে জুনিয়র ম্যানেজারের কাজ শেখানো যেতে পারে। সে কাজের জন্য এমবিএ ডিগ্রিধারীই চাই, তা তো নয়।

অন্য দিকে, কর্মপ্রার্থীরও দায়িত্ব আছে। বাজারে কোন কাজের চাহিদা বেশি, কোন ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন— তা মাথায় রেখেই নিজের বায়োডেটা সাজাতে হয়। এক জন ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক যদি সাংবাদিকতার চাকরি খুঁজতে চান, তবে শেক্সপিয়র নিয়ে ক’টি প্রবন্ধ লিখেছেন তা না লিখে, ক’টি ফিচার লিখেছেন, তা উল্লেখ করলে বেশি কার্যকর হতে পারে। মুচিরাম গুড়ের এই বাস্তব বুদ্ধি ছিল। তিনি প্রায় নিরক্ষর হলেও, যিনি তাঁর দরখাস্ত লিখে দিয়েছিলেন, তাঁকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন খুব শুদ্ধ ইংরেজি না লেখা হয়। তিনি জানতেন, চাকরির বাজারে কোন পরিচয়টি কাজে লাগবে।

ইদানীং বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা বাড়ানোর জন্য কর্তৃপক্ষের উপরে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে দেশ-বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ই এই প্রবণতার শিকার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্রেড ইনফ্লেশন বা বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা। ছাত্রদের মান যত কমবে, শ্রমের বাজারে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মূল্য তত কমবে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

শ্রমের বাজারে দীর্ঘ দিন ধরেই চাহিদা আর জোগানের মধ্যে মিল নেই। শিল্পক্ষেত্র যে ধরনের দক্ষ কর্মী চায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনো বহু ছাত্রের সেই দক্ষতা নেই। তা হলে তাঁরা সেই দক্ষতা অর্জনের পথে এগোচ্ছেন না কেন? কেন এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির পিছনে এত সময় ব্যয় করছেন? অনুরাগ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এলিসা কেলারের সঙ্গে লেখা একটি গবেষণাপত্রে আমরা দেখিয়েছি, বাজার-উপযোগী দক্ষতা অর্জনের জন্য যে বিনিয়োগ দরকার, তা ব্যয়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। বহু পরিশ্রম করে একটি দক্ষতা অর্জনের পরেও দেখা যেতে পারে, বাজারে আর তার চাহিদা নেই।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের পরে এই সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এখন ১,৩০০-র বেশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ ও মান নিরীক্ষার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কোন বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার পীঠস্থান হবে, কোথায় ব্যবহারিক শিক্ষা জোর পাবে— এই বিভাজন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেই স্থির করা দরকার। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস-এর মতো দেশে দক্ষতার ঘাটতি তুলনামূলক ভাবে কম। সেখানে ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন। সরকার আর্থিক বরাদ্দ ও নীতিগত নির্দেশিকার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতের ক্ষেত্রেও হয়তো তেমন কাঠামোগত ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। কর্মপ্রার্থীদের জন্য নতুন প্রযুক্তি শেখার কেন্দ্রও গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে কোনও অবস্থাতেই দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে মৌলিক বিজ্ঞান ও তাত্ত্বিক শিক্ষাকে দুর্বল করে পুরো সিলেবাস বাজারমুখী করা উচিত নয়।

প্রযুক্তি বদলাবে, কাজের ধরন বদলাবে, বাজারের চাহিদাও বদলাবে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেখার ক্ষমতা এবং নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করার মানসিকতাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। শুধু ডিগ্রি নয়, বাস্তব বুদ্ধি এবং অভিযোজন ক্ষমতাও শ্রমের বাজারে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতি বিভাগ, ডারহ্যাম ইউনিভার্সিটি

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন