ভোট শেষ, নতুন সরকার, রাজ্যে নতুন উদ্দীপনা দৃশ্যমান। যে কোনও পরিবর্তনই সম্ভাবনাময়, বিশেষত দীর্ঘ অসক্রিয়তা ও পশ্চাৎপদতার প্রেক্ষিতে পরিবর্তনের মধ্যে অনেকখানি আশা দেখা স্বাভাবিক। তবে আশার পাশে আশঙ্কার অন্ধকারও ঘনায়মান: নতুন মন্ত্রিসভা কাজ শুরুর আগেই সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ জরুরি। দিল্লি বা উত্তরপ্রদেশের পরে পশ্চিমবঙ্গেও কি এ বার ‘বুলডোজ়ার’ সংস্কৃতির আবির্ভাব হল— এই হল প্রথম আশঙ্কা। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দিনই নিউ মার্কেট এলাকায় বুলডোজ়ার নিয়ে বিজেপি সমর্থকদের বিজয় মিছিল দেখে দোকান বন্ধ করে দেন বহু হকার। বিজেপি কর্মীদের ধমক-চমকের কথাও এসেছে সংবাদে। হয়রানির ভয়ে কয়েক দিন মালপত্র সরিয়ে নিয়েছিলেন হকাররা। রবিবার থেকে তাঁরা ফিরে এসেছেন নিজেদের জায়গায়। বার্ট্রাম স্ট্রিট, হুমায়ুন প্লেস-এর ফুটপাত, রাস্তা দখল করে বিকিকিনি চলছে আগের মতোই। উঠে যাওয়া এবং ফিরে আসার এই পালা কলকাতার রাস্তায় বহু দশক চলছে।
কলকাতার রাস্তা এবং হকার-সমস্যা নতুন নয়, দীর্ঘ ও জটিল তার ইতিহাস। অধিকাংশ হকার অবৈধ, পুরসভা-পুলিশের দাক্ষিণ্যে ব্যবসা চালাচ্ছেন, তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু বুলডোজ়ার দিয়ে উচ্ছেদ তার সমাধান নয়। কারণ, সঙ্কটের উৎস খোদ প্রশাসন। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় হকারদের আধিক্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে হকার নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুরু হয়েছিল কলকাতার হকার সমীক্ষা। বছর ঘুরে গেলেও তা শেষ হয়নি, ভেন্ডিং-এর শংসাপত্র পাননি কোনও হকার। পুর সচিবালয় গত বছর কলকাতায় প্রায় ৫৪ হাজার বৈধ হকারের তালিকা তৈরি করেছিল, যদিও তাঁদের মধ্যে নাকি মাত্র ৮,৭২৭ জন সমস্ত বিধি মেনে ব্যবসা করছেন। বাকি ৪৫ হাজার ‘বৈধ’ হকারদের বিচ্যুতিগুলি সংশোধন হবে কী করে, অবৈধ হকারদের পুনর্বাসন হবে কি না, তার উত্তর মেলেনি। এ বার কি এই চোর-পুলিশ খেলার নতুন পর্ব শুরু হবে, কেবল বদলে যাবে ‘জরিমানা’ আদায়ের হাতগুলো?
সমস্যার শিকড় গভীরে। এ রাজ্যে অসংগঠিত ক্ষেত্র অধিকাংশ মানুষের গ্রাসাচ্ছাদন জোগায়। তাকে ‘অবৈধ’ করে রাখা হয়েছে সরকারি ভাবেই। এর থেকে তোলা আদায় ছাড়াও অন্যান্য সুবিধা পেয়েছেন শাসক। নিজের জীবিকা রক্ষার তাগিদে দলকে সমর্থন করতে বাধ্য হন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বনিযুক্ত এবং শ্রমজীবী মানুষ, এই ছিল তাঁদের হিসাব। দলীয় রাজনীতির এই নিকৃষ্ট কৌশল বার বার হকার-সমস্যার প্রশাসনিক সমাধানের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে। হকারদের অধিকার সুরক্ষায় কেন্দ্র আইন তৈরি করেছিল ২০১৪ সালে। পশ্চিমবঙ্গে সেই অনুসারে হকারদের নথিভুক্তি, তাদের বসার জায়গা নির্ধারণ, ‘টাউন ভেন্ডিং কমিটি’ তৈরি করে হকারদের নিয়ন্ত্রণ করা— সব বিধি-ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল ২০১৮ সালে। হকারদের লাইসেন্স, ফুটপাতে এবং রাস্তার মোড়ে কত জায়গা ছাড়তে হবে, প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, কোনও দোকানের প্রবেশদ্বারের সামনে বসা চলবে না, শহরের কয়েকটি এলাকাকে হকারদের জন্য নিষিদ্ধ করা হবে, এমন নানা নির্দেশ জারি করেছেন পুর-কর্তৃপক্ষ। সে সব বিধি কার্যকর হয়নি, আইনের শাসনের অভাবে এক অনিয়ন্ত্রিত, জটিল পরিস্থিতি গড়ে উঠেছে। অতএব পশ্চিমবঙ্গে জীবিকার ‘অবৈধতা’-র জন্য দরিদ্র, শ্রমজীবী মানুষকে ‘অপরাধী’ বলে ঠাহর করলে এই মানুষগুলির প্রতি যেমন অন্যায় হয়, তেমনই ভুল হয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে। বুলডোজ়ার চালিয়ে কিংবা লাঠির ঘায়ে হকারের দোকান গুঁড়িয়ে দিলে কিছু উত্তেজক দৃশ্য তৈরি হয়, পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে না। নতুন সরকারের সামনে একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে হকার-সম্পর্কিত কেন্দ্রীয় নীতিগুলিকে বাস্তবে রূপায়িত করার। ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সেই কাজ করা হোক।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে